মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২   আষাঢ় ২১ ১৪২৯

অগ্নিনির্বাপনে কতটা প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জ

সায়মন ইসলাম

প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০২২  

 

#গত এক বছরে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ৬৯৪ টি
#১২ টি ফায়ার স্টেশন সম্বলিত জেলা হতে যাচ্ছে : সহকারী পরিচালক


বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। অন্যন্য উন্নয়নশীল দেশের মতো এ দেশও প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় সমস্যার যাতাকলে পিষ্ট। এদেশে প্রাকৃতিক দূর্যোগের পাশাপাশি নানারকম দূষণ, যানজট ও দূর্নীতি জাতীয় সমস্যা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোর আগুনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে। অগ্নিকাণ্ড মূলত শিল্প এলাকায় সবচেয়ে বেশি ঘটে। সে হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিল্পাঞ্চল হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জ। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে চলতি মাসে সিদ্ধিরগঞ্জে ইপিজেড আগুন, রূপগঞ্জের হাসেম ফুড এন্ড ভেবারেজ কারখানায় আগুন, বন্দর এর রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় আগুন, সোনারগাওঁয়ে আগুন, ফলপট্টি এলাকায় আগুন, নিতাইগঞ্জে আগুন এর ঘটনা অন্যতম। এর প্রেক্ষিতে সচেতন মহলের মনে প্রশ্ন অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থাপনায়  কতটা প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জ।

 


শহরের বাসিন্দা সফিক মিয়া এ ব্যাপারে যুগের চিন্তাকে জানান, নারায়ণগঞ্জ একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পনগরী। এখানে বড় বড় রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা,হোসিয়ারী, ক্যামিকেল গোডাউন, নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজার ও বিভিন্ন কারখানা রয়েছে। এসব জায়গাগুলোতেই অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এজন্য সব সময় একটি উৎকন্ঠা কাজ করে তার মধ্যে। কখন কোথায় আগুন লাগবে, কে বা কারা ক্ষতিগ্রস্থ হয় তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন শহরের সবাই। তারা এক অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন পার করছেন। শহরে দুটি ফায়ার ষ্টেশন আছে, মন্ডলপাড়া ও হাজীগঞ্জ ফায়ার ষ্টেশন। এছাড়াও পুরো নারায়ণগঞ্জে সর্বমোট ৯টি ফায়ার ষ্টেশন আছে। বড় ধরনের কোনো অগ্নিকাণ্ড হলে তারা কতটা দ্রুত কার্যকরীভাবে অগ্নি নির্বাপনে সক্ষম তা নিয়ে সাধারণ মানুষ সন্দিহান।

 

শহরের মন্ডলপাড়া ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, ১ জানুয়ারি ২০২১ সাল থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ সাল পর্যন্ত গত এক বছরে নারায়ণগঞ্জে সর্বমোট অগ্নিকান্ডের সংখ্যা ছিলো মোট ৬৯৪ টি। এর মধ্যো ২৫৩ টি অগ্নিকান্ডের ঘটনায়  অগ্নিনির্বাপনে তাদের কোনো কাজ করতে হয়নি। অর্থাৎ বিগত ১ বছর ফায়ার সার্ভিস ৪৪১ টি অগ্নিকান্ডে অগ্নিনির্বাপনে অংশ নিয়েছিলো।

 

পরিসংখ্যান থেকে আরোও জানা যায় যে, এসব অগ্নিকান্ডের সিংহভাগই বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে সৃষ্ট। যার পরিমান ১৮৬ টি। এরপরেই রয়েছে অজ্ঞাত কারণ  যার পরিমান ১৬৫ টি।  বিড়ি সিগারেট এর জ্বলন্ত টুকরা থেকে আগুন লেগেছে ১২৪টি, গ্যাস লাইনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে ৯৮টি, চুলা থেকে আগুনের ঘটনা ৫৩টি এবং, বিস্ফোরনে আগুনের ঘটনা ১৫ টি।

 

এসব দূর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও নেহাত কম নয়। ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভির ডিফেন্সের তথ্যমতে, বিগত এক বছরে সৃষ্ট অগ্নিকান্ডে সর্বমোট ক্ষতির পরিমাণ ১৭ কোটি ৪৯ লক্ষ ৪ হাজার ২৪০ টাকা। যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিলো বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে সৃষ্ট অগ্নিকান্ডে।

 

তবে ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় অগ্নিকান্ড থেকে বিপুল পরিমান সম্পদ উদ্ধার করতে সক্ষম  হয়েছে এমন সম্পদের পরিমান ৫৮ কোটি ৬৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯৮০ টাকা। এ পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যায় নারায়ণগঞ্জে অগ্নিকান্ডের ঘটনার ব্যাপকতা কতটা। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন জেলার মানুষ। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে অগ্নিকান্ডে ঝুকিঁপূর্ণ এই জেলার অগ্নি নির্বাপনে কতটা প্রস্তুত এই অঞ্চল তথা এই অঞ্চলের ফায়ার সার্ভিস?

 

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর উপ-সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আরেফীন যুগের চিন্তাকে জানান, নারায়ণগঞ্জে ২ টি নদী স্টেশন সহ মোট ৯ টি ফায়ার স্টেশন রয়েছে। এছাড়াও শিল্প, কলকারখানা সমৃদ্ধ এরিয়া হওয়ায় এর গুরুত্ব বুঝে বর্তমান সরকার আরোও ৩ টি স্টেশন এখানে নির্মাণ করছেন। যেগুলো শিবু মার্কেট, কাঁচপুর ও পাগলার ইদ্রাকপুরে  নির্মিত হবে। এর মধ্যো ২ টি অত্যাধুনিক। যেগুলো ১ থেকে ২ মাসের মধ্যো চালু হবে। অথ্যৎ সর্বমোট ১২ টি ফায়ার স্টেশন সম্বলিত জেলা হতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ। বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক উপজেলায় ১ টি করে ফায়ারস্টেশন থাকবে। নারায়ণগঞ্জে ৫ টি উপজেলা কিন্তু এখানের গুরুত্ব অনূভব করে এখানে উপজেলার চেয়েও বেশি  ফায়ারস্টেশন অর্থ্যাৎ  ১২ টি ফায়ার  স্টেশন ।

 

নারায়ণগঞ্জ অগ্নিনির্বাপনে কতটা প্রস্তুত এর থেকেই অনেকটা আঁচ করা যায়। তিরি আরোও বলেন, অগ্নিনির্বাপনে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট গাড়ি, পাম্প যা যা লাগে তা এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। যেনো যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা আমরা সহজেই মোকাবেলা করতে পারি। তবে জনগণেরও আরোও সচেতন  হতে হবে। অনেক সময় ক্যামিকেল মালামাল গোপন গোডাউনে মানুষ লুকিয়ে রাখে। এখন হঠাৎ করে আমরা জানলাম সেখানে বিস্ফোরণ হলো। কিন্তু কেউ সঠিক তথ্য দিলো না যে এখানে ক্যামিকেল আছে। যার ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণে অনেক বেগ পেতে হয়।

 

সাধারণ আগুনের জন্য আমরা পানি ব্যবহার করি আর ক্যামিকেল এর আগুন এর জন্য আমরা ফোম ব্যবহার করি। সুতরাং সঠিক তথ্য পেলে আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি খুবই সহজে। তিনি অভয় দিয়ে বলেন, আমি এখানে এসেছি প্রায় সাড়ে তিন বছর হবে। এর মধ্যে এখানে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। আমাদের যথেষ্ঠ প্রস্তুতি আছে। তবে শিল্প কারখানা, বহুতল ভবন এর নিজস্ব প্রাথমিক অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং তার প্রয়োগ জানতে হবে যেনো তারা ফায়ার সার্ভিস আসার আগ পর্যন্ত আগুন টা যেনো বেশি না বাড়ে সেই ব্যবস্থা করতে পারে। এছাড়াও শহরের নিতাইগঞ্জে, টানবাজারের ক্যামিকেল গোডাউনগুলো যদি বিক্ষিপ্তভাবে না থেকে নির্দিষ্ট একটা জায়গায় থাকতো তাহলে আমরা জানতাম এখানে ক্যামিকেল আছে। আমরা এখানে ফোম ব্যবহার করে সেখানে অগ্নিকান্ড ঘটলে সহজেই তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি।

 

তিনি বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ফোম আছে। রিমোর্ট সিস্টেম রোবটিক্স গাড়ি আছে, ফোম কামান আছে, নদীপথে অগ্নিকাণ্ড রোধে জাহাজ আছে। জল এবং স্থল উভয় পথে  আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীকে সেবা দিতে মোটামুটি প্রস্তুত। এছাড়াও ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স আগুন ছাড়াও যেকোনো দুর্যোগ ও সমস্যায় সবার আগে সেবা দিয়ে থাকে। শহরের হাজীগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের দায়িত্বরত এক কমকর্তা  জানান, আমরা দুর্ঘটনার  খবর পাওয়ার ৩০ থেকে ৬০  সেকেন্ডের মধ্যো স্টেশনের গেট ক্রস করি এবং সেইভাবে আমরা সবসময় প্রস্তুত থাকি।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টান বাজার এর এক ব্যাবসায়ী জানান, টানবাজার, মিনাবাজার, সাহাপাড়া, নিতাইগঞ্জ, এলাকায়  ক্যামিকেল গোডাউন রয়েছে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এখানে রয়েছে আবাসিক ভবনও। আবাসিক  এলাকায় ক্যামিকেল গোডাউন থাকা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা তিনি ব্যাক্ত করেন। তিনি আরোও বলেন, এখানে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে তা মারাত্মক আকার ধারণ করবে। জান ও মাল নিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে ব্যাপক। এ নিয়ে তার দুশ্চিন্তার  শেষ নেই।

 

এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশন এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল আমিন জানান, ‘এ বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। আপনারা আমাদের তথ্য দিতে পারলে বা কেউ আমাদের এই ব্যাপারে অভিযোগ দিলে আমরা এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিব।এমই/জেসি
 

এই বিভাগের আরো খবর