মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০২৪   আষাঢ় ১১ ১৪৩১

আধা কিলোমিটারের মধ্যে ১১ বেসরকারি ক্লিনিক

আশরাফুল আলম

প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩  

 

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লাগামহীন চিকিৎসা বানিজ্য। উপজেলার মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় আধা কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে অন্তত ১১ টি বেসরকারি ক্লিনিক।

 

সোনারগাঁ সেন্ট্রাল হাসপাতাল, ডক্টরস হেলথ কেয়ার লিমিটেড, ইনসাফ ল্যাব এন্ড হসপিটাল, সোনারগাঁ ইবনে সিনা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সেবা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সোনারগাঁ সেবা জেনারেল হাসপাতাল, ইসলামিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, সোনারগাঁও জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডি-কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল ও রয়েল স্পেশালাইজড হসপিটাল নামে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠা এসব ক্লিনিক গুলোতে চিকিৎসা সেবার নামে চলছে রোগীদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা।

 

চটকদার নামের এসব ক্লিনিকে আকর্ষনীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে প্রতারনার শিকার হচ্ছে অসংখ্য রোগী ও সাধারণ মানুষ। প্রতিটি ক্লিনিকে কমিশনের ভিত্তিতে নিয়োগ করা নিজেস্ব কিছু দালাল প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী ধরে আনে বেসরকারি এসব ক্লিনিকে। যে কোন গর্ভবতী নারী বেসরকারি এসব ক্লিনিকে প্রবেশ করলেই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ নানাবিধ ভয় ভীতি প্রদর্শন করে রোগীকে বাধ্য করেন সিজার অপারেশন করার জন্য।  

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিটি ক্লিনিকেই মালিক পক্ষ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা শহর থেকে চুক্তি ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনেন সিজার অপারেশন করার জন্য। গর্ভবতী মায়েদের প্রতিটি সিজার অপারেশন করতে এসব বেসরকারি ক্লিনিক মালিকরা হাতিয়ে নিচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি বেসরকারি এসব ক্লিনিক গুলোতে নিয়োগকৃত নার্স, আয়া ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কর্মীরা বাচ্চা প্রসবের পর রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে বকশিস বাবৎ নিচ্ছে আরো কমপক্ষে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা।

 

এছাড়া প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার ও শনিবার দুদিন ছুটি থাকায় সকাল বিকাল এসব ক্লিনিক গুলোতে নিয়মিত রোগী দেখেন বিশেষজ্ঞ সব চিকিৎসকরা। প্রচার পত্রে, বিলবোর্ডে এবং ভিজিটিং কার্ডে ওইসব চিকিৎসকদের নামের আগে পরে নানা পদবি উল্লেখ্য থাকলে ও তাদের অনেকের ব্যাপারে রয়েছে জনমনে নানান প্রশ্ন। বেসরকারি এসব ক্লিনিকে গিয়ে প্রতারণার শিকার একাধিক রোগীর কাছ থেকে জানা গেছে ৩০০-৫০০ টাকা ফি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের।

 

তাছাড়া চিকিৎসকরা প্রয়োজন হোক আর নাই হোক প্রথমেই রোগীকে দেওয়া হয় ৭-৮ টি পরীক্ষা। পরে ভয় আতঙ্কে বাধ্য হয়েই পরীক্ষা গুলো করতে হয় রোগীদের। এসব পরীক্ষার ক্ষেত্রে ও আবার বাধ্য বাধকতা থাকে। সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক ছাড়া অন্য কোথাও পরীক্ষা করানো যাবেনা। এখানকার অনেক চিকিৎসকই এখন অর্থ বানিজ্যে লিপ্ত। এছাড়া অদক্ষ টেকনিশিয়ান দ্বারা এক্স-রে, ইসিজি, আলট্রাস্নো, অপরিচ্ছন্ন কেবিন ও নানা অনিয়মের কারনে ভুল চিকিৎসায় নারী ও শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

 

বেসরকারি এসব ক্লিনিকে নাকের অপারেশন করতে গিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরনে রোগী মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় বেসরকারি এসব ক্লিনিকে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগী দেখার সময় দেশের বিভিন্ন কোম্পানীর প্রতিনিধিদের স্যাম্পল ঔষধ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যে কোম্পানী বেশি স্যাম্পল দেয় চিকিৎসকরা ব্যবস্থা পত্রে সেই কোম্পানীর ঔষধের নামই লিখেন। স্যাম্পলের ওই সব ঔষধ দিয়েই চলে নিজস্ব ক্লিনিক।

 

সরকারি নিয়মনীতি ও আইন অমান্য করে সোনারগাঁয়ে অনেক চিকিৎসক তাদের সাইনবোর্ড, ভিজিটিং কার্ড, প্রেসক্রিপশন প্যাডে যথার্থ নয়, এমন সব পদবি, পরিচয় ও যোগ্যতা প্রদর্শন করে আসছেন। বিশেষ করে বিএমডিসির সংশোধিত আইন অনুযায়ী মেডিক্যাল অ্যাসিসটেন্টরা তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবে না। সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া চৌরাস্তায়, উদ্ধবগঞ্জ, মদনপুর, কাঁচপুর, স্থানীয় হাট-বাজারে, রাস্তার মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে অনেক অ্যাসিসটেন্ট চিকিৎসক পদবি ব্যবহার করে সাইন বোর্ড ঝুঁলিয়ে রোগী দেখে প্রতিদিন বিপুল পরিমান অর্থ উপার্জন করছেন।

 

এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক কোন রকম সনদ ছাড়াও অনেকে নামের আগে চিকিৎসক পদবি ব্যবহার করছেন। উপজেলা সদর ছাড়াও গ্রামে এসব চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। অনেক এমবি বি এস ডাক্তার বিএমডিসির নির্দেশ অমান্য করে এফ সিপি এস পার্ট-১,২ থিসিসপর্ব, ইনকোর্সসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি লিখে রোগীদের সাথে প্রতারনা করছেন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ নিজেদের গাইনি বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ, অর্থ পেডিক বিশেষজ্ঞ লিখে আসছেন।

 

এছাড়া প্রেসক্রিপশনে তারা এমন কিছু ঔষধ লিখছেন যা সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ, ফার্মেসিতে খুঁজেও পাওয়া যায়না। বিএমডিসি আইনের ২৯(২) ধারা অনুযায়ী ভূয়া পদবি ও অতিরিক্ত যোগ্যতা ব্যবহার নিষিদ্ধ, এ আইনে অপরাধের দন্ড তিন বছর কারাদন্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড।

 

গরীব সাধারণ রোগীদের হয়রানী ও প্রতারণা থেকে রক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিকট তদরকি ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সোনারগাঁ এলাকার ভূক্তভোগি রোগী সাধারণ। নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ এ এফ এম মুশিউর রহমান জানান, সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে বেসরকারি এসব ক্লিনিক গুলোর বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করবো। এস.এ/জেসি

এই বিভাগের আরো খবর