শনিবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১   আশ্বিন ২ ১৪২৮

উন্নয়নে নারী অপরাধেও তারা

মো. মোমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১  

# আট মাসে ৭১৩টি মামলা, উদ্ধার হয়েছে দেড় কোটি টাকার মাদক


# নারীর মাদক সংশ্লিষ্টয় ৫৮টি মামলা, গ্রেপ্তার ৬৫ জন


# নারীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিশ্চিয়তা নেই- রফিউর রাব্বি


# পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তি কিংবা মিডিয়ার পক্ষে মাদক বন্ধ করা সম্ভব নয়- শাহ্ নিজাম


# সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে নারীদের মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে- পুলিশ সুপার


 
দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এখন নারীদের অংশগ্রহণ বিশ্বস্বীকৃত বাংলাদেশ। নারীর ক্ষমতায়নে পুরুষের চেয়ে কোন অংশেই পিছিয়ে নেই নারীরা। তবে ইতিপূর্বে সমাজের বিভিন্ন অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে নারীদের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হত্যা, ছিনতাই, অপহরণ ও মাদক কারবারীতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমশই বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জের মাদক ব্যবসায়ও পিছিয়ে নেই নারীরা। অবৈধ এই ব্যবসায় পুরুষদের অংশগ্রহণ উল্লেখ্য যোগ্য হলেও বর্তমানে পুলিশি চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে নারীরাই মাদক সরবরাহ করে থাকে জেলার সর্বত্র জুড়ে।

 

পুলিশ বলছে, অপরাধীরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। সেই পরিবর্তনে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা নারীদের সম্পৃক্ত করছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বলছেন, শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যেখানে ৫০০ টাকা উপার্জন করা যায়, সেখানে ২০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করে ৫ হাজার টাকা মিলে। অর্থের প্রলোভনেই নারীরা অধিকমাত্রায় মাদক ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবছর জানুয়ারী মাস থেকে আগষ্ট পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাদক বিরোধী অভিযানে ৭১৩টি মামলা হয়েছে।

 

মামলাগুলোর পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, এ সময় মাদক সংশ্লিষ্টতা এবং মাদক সরবরাহ ও মাদক বহনের অভিযোগে একাধিক নারীর বিরুদ্ধে ৫৮টি মামলা হয়েছে। সদর থানায় ৬টি, ফতুল্লা মডেল থানায় ৩২টি, ৭টি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায়, বন্দর থানায় ৬টি, সোনারগাঁ থানায় ৩টি, আড়াইহাজার থানায় ১টি এবং রূপগঞ্জ থানায় ৩টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে অভিযানের সময় ১১৬ কেজি ৯৮৫ গ্রাম গাঁজা, ১২ বোতল ফেন্সিডিল, ৪৫ হাজার ৪’শ ৭৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩’শ ৯৮ দশমিক ৩ গ্রাম হেরোইন, ২’শ ১৫ লিটার ১’শ ৩৮ গ্রাম দেশীয় মদ উদ্ধার হয়েছে।


 
পুলিশ বলছে, গত ৮ মাসে র‌্যাব-১, ১০ ও ১১ এর সদস্যরা জেলাজুড়ে মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে একাধিক নারীকে মাদকসহ আটক করে ২৫টি মামলা করেছেন। নারায়ণগঞ্জের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে নারী মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ২টি মামলা করেছেন। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ২টি মামলা হয়েছে এবং থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে একাধিক নারী মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা করেছে।


 
থানা থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত যাচাই করে জানা গেছে, পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এর সদস্যরা জেলার বিভিন্ন থানা এলাকাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করে ৬৫ জন নারী মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় আটক হওয়া নারীদের কাছ থেকে ১১০ কেজি ৯৮০ গ্রাম গাঁজা, ১০ বোতল ফেন্সিডিল, ৩২ হাজার ৩৭৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ২০ ক্যান বিয়ার, ৩১৭.৩ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ বলছে উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্যের অবৈধ বাজর মূল্য ১ কোটি ৫১ লক্ষ ৩১ হাজার ৭’শ টাকার মতো।


 
নারীদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির উপদেষ্ট রফিউর রাব্বি যুগের চিন্তাকে জানান, বিভিন্ন অপরাধ নারীদের অবশ্যই ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা বিভিন্ন ভাবেই হচ্ছে। নারীদের যেভাবে দেশের বাহীরে পাচার করা হচ্ছে এবং ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক কাজে। নারীরা মাদক ব্যবসায় থাকলে সেটা মনে করা হয় নিরাপদ। মাদকের বিষয়ে নারীদের অধিক সংশ্লিষ্টতার পিছনে রয়েছে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও রাজনৈতিক দূরাবস্থা। যে সমাজে নারীদের নিরাপত্তা থাকেনা, যথাযথ মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিশ্চিয়তা থাকেনা, সেখানে নারীরা এ সমস্ত ঘটনার সাথে জড়িত হবে, পাচার হবে দেশের বাহীরে এবং যুক্ত হবে বিভিন্ন অসামাজিক কাজের সাথে। রফিউর রাব্বি বলছেন এটা আসালে স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। যদি আইনশৃঙ্খলা বাহীনি খুব কঠোর অবস্থায় থাকে তাহলে এটা হতে পারেনা। আইনশৃঙ্খলা বাহীনিও এদেরকে বিভিন্ন পশ্রয় দেয় এবং তারাও বিভিন্নভাবে এসমস্ত কাজে জড়িয়ে পরে।


 
তিনি আরো বলেন, নারী পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়েই নারী অপরাধীদের মোকাবেলা করা উচিৎ এবং প্রত্যেকটা বাহীনির মধ্যেই নারীদের সংখ্যাটা বৃদ্ধি করা উচিত। তিনি বলেন, যারা মাদক ব্যবসায়ী তাদের যদি ধরাছোঁয়ার বাহিরে রেখে শুধু মাত্র বহনকারী যারা তাদেরকেই শাস্তির আউতায় আনা হয় তাহলে এটা কোন ভাবেই বন্ধ হওয়ার কারণ নেই। মাদক ব্যবসায়ী যারা এদের অধিকাংশই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় থাকে। বিভিন্ন গডফাদার, রাজনৈতিক বড় ভাইদের ছত্রছাঁয়ায় এই মাদক ব্যবসাগুলো হয় এবং এটা পুলিশেরও জানা রয়েছে।


 
জনমত তৈরী করতে না পারলে শুধু মাত্র পুলিশ, রাজনৈতিক কিংবা মিডিয়ার পক্ষে মাদক বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন মহনাগর আওয়াম লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ্ নিজাম। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিট পুলিশিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজাম যুগের চিন্তাকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে অনেকগুলো প্রোগ্রাম করেছি। সে অনুষ্ঠানে ফতুল্লা মডেল থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের অফিসারস ইনচার্জও উপস্থিত ছিল। মাদক বিক্রেতার সংখ্যা খুবই সীমিত। আমরা যারা মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলি কংবা যারা মাদক পছন্দ করিনা তাদের সংখ্যা অনেক বেশি। অল্প সময়ে অনেক টাকা উপার্জনের যে প্রবণতা এটাই নারীদের উৎসাহিত করে। যার কারণে নারীদের সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই কারণগুলোই বন্ধ করতে হবে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে।


 
নারায়নগঞ্জ জেলার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সামছুল আলম জানান, আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে মাদক পাচারের ক্ষেত্রে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে, ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদেরও। সমাজের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা এক স্থান থেকে অন্যস্থানে মাদক পাচারের জন্য নারীদের ব্যবহার করছে। নারী শিশুদের অপরাধ থেকে বিরোত রাখতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। অনেকেই না বুঝেই এ ধরণের কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি উধারণ হিসেবে বলেন, এক সময় গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে খোলা পায়খানা ছিল। কিন্তু বর্তমানে এগুলো বন্ধ হয়েছে। তার কারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেছে বলেই হয়েছে। ওইটাকে অনুকরন করে আমরা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করছি। এতে করে মাদকও একদিন বন্ধ হয়ে যাবে।
 


এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম জানান, আসলে নারীদের মাধ্যমে মাদক বহন করাটা খুবই সহজ। এটা সারা বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীতেই মাদকের বাহক হিসেবে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। চিহ্নিত মাদক কারবারীরা তাদের স্ত্রী অথবা নিকট প্রতিবেশীদের তাদের অবৈধ কাজে সম্পৃক্ত করছে। সুতরাং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে নারীদেরকে মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে।


 
র‌্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব মোবাইল ফোনে যুগের চিন্তাকে জানিয়েছেন, মাদকের সাথে নারীদের সংশ্লিষ্ট বৃদ্ধি পাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে বিভিন্ন অপরাধে নারীদের ধরা পরার প্রবনতা কম। কারন হচ্ছে, অভিযানের সময় আমাদের সাথে যদি নারী পুলিশ কিংবা নারী র‌্যাব সদস্য না থাকে তাহলে সন্দেহজনক নারীকে তল্লাশী করা যায় না এবং এই সুযোগটিই অপরাধীরা গ্রহণ করে থাকে। থানা এলাকাগুলোতে, হাইওয়ে কিংবা বিভিন্ন চেক পোষ্টে নারী পুলিশ সদস্য সব সময় সংশ্লিষ্টরা দিতে পারেন না, এটাও একটা কারণ হতে পারে। সামাজিত সচেতনার কোন বিকল্প নেই বলে আরো মন্তব্য করেছেন র‌্যাব-১১ এর এই কর্মকর্তা। তিনি বলছেন যতই অভিযান কিংবা শাস্তি প্রদান করেন। সেকানে সামাজিক সচেতনতাই সবচেয়ে বড় বিষয়। ইউনিয়ন পরিষদ, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, বাজার-হাট এবং সমাজের পঞ্চায়েত কমিটিগুলো সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।

 

এই বিভাগের আরো খবর