বুধবার   ১৯ মে ২০২১   জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৮

জৌলুশ ফিরে পেতে মরিয়া ‘থানকাপড়’ ব্যবসায়ীরা

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশিত: ২৭ এপ্রিল ২০২১  

নারায়ণগঞ্জ শহরের দুইনং রেলগেট থেকে উকিলপাড়া পর্যন্ত প্রায় হাজার খানের দোকান নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘রেলওয়ে থানকাপড়ের মার্কেট’। বছরের পর বছর ধরে এখান থেকেই দেশ ও দেশের বাহিরের পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা থানকাপড় ক্রয় করে আসছে। তাই নারায়ণগঞ্জ শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত এই ব্যবসায়ীক এলাকাটি সবার মাঝে আন্তর্জাতিক বাজার হিসেবেও পরিচিত।

 

সেই সঙ্গে এখানে কাপড়ের ব্যবসা করে অনেকেই ইতিমধ্যে সাফল্যের মুখ দেখেছেন। তবে ২০১৯ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্পের জন্যে এই মার্কেটের শতাধিক থানকাপড়ের দোকান ভেঙে ফেলা ও গত বছর থেকে শুরু হওয়া সারাদেশে করোনা পরিস্থিতির ফলে এখানকার শতশত ব্যবসায়ী ও শ্রমিক কর্মচারীরা এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে।


 
ব্যবসায়ীরা জানান, দু বছর আগে থানকাপড়ের এই মার্কেটের বহু দোকান ভেঙে ফেলায় সৃষ্ট অর্থনৈতীক মন্দা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা। তবে এরমধ্যে আবার সারাদেশে লকডাউন ও করোনার প্রভাব শুরু হওয়ায়, রীতিমতো থমকে গেছে এখানকার ব্যবসা বানিজ্য। পাশাপাশি মার্কেটটিতে ব্যবসায়ীর সংখ্যা এবং বেচাকেনা ধীরে ধীরে কমতে থাকায় অনেক ক্রেতারাই এখন আর এখানে কাপড় ক্রয় করতে আসছেনা। ফলে পুরনো ক্রেতাদের কাছ থেকে অনেক ব্যবসায়ী পাওনা টাকা বুঝে পাচ্ছেনা। তবে এখন দ্রুতই এসব সংকট কাটিয়ে পুরনো জৌলুশ ফিরে পেতে মরিয়া এখানকার ব্যবসায়ীরা।


এবিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল হালিম নামে রেলওয়ে থানকাপড় মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, লকডাউনে কারনে সারাদেশেই পোশাকের চাহিদা এবং বেচাকেনা কমে গেছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের থানকাপড়ের চাহিদাও কম। এতে আমাদের দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ বহন করাটাই এখন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর এই মার্কেটটি দুই বছর আগে ভেঙে দেওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী এখন অন্য জায়গায় চলে গেছে। এতে আমাদের ক্রেতার সংখ্যাও তুলনামুলক ভাবে কমে গেছে। পার্টিদের (ক্রেতা) কাছ থেকে পাওনা টাকাও ঠিকমতো বুঝে পাচ্ছিনা। তাই সামনে কিভাবে এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখবো তা নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তার মধ্যে আছি। তবে আমরা চাই দ্রæতই এই সংকট থেকে উঠে আসতে।  


মোক্তার হোসেন নামে অন্য এক থানকাপড় বিক্রেতা বলেন, প্রথমে আমি বিভিন্ন ব্যাংক টাকা নিয়ে এই মার্কেটে ব্যবসায় শুরু করেছিলাম তবে রেলওয়ের উচ্ছেদে আমার একমাত্র দোকানটি ভেঙে দেওয়া হয়। এতে আমি অনেকটাই নিঃস্ব হয়ে যাই। তবে পরে আবার আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার হিসেবে টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করি, ভেবেছি সবকিছু ঠিক থাকলে সেই টাকা দ্রæতই ফিরত দিয়ে দেবো। কিন্তু করোনার জন্যে বেচাকেনার যেই অবস্থা, মনে হচ্ছে এবারও হোচট খেতে হবে। কিন্তু লকডাউন ভালো ভাবে উঠে গেলে চেষ্টা করবো আবারো নতুন করে ব্যবসা বানিজ্য শুরু করতে।  

 

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এই মার্কেটে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা বহু শ্রমিক কর্মচারীদেরও এখন আয় রোজগার আগের মতো নেই। আনোয়ার নামে এক মার্কেটের এক লেবার বলেন, আগে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাল লোড-আনলোড করলে প্রতিদিন ৫’শ থেকে ৬’শ টাকা রোজগার করতে পারতার। কিন্তু এখন মার্কেটে বেচাকেনা আগের মতো নেই, তাই আমাদের আয় রোজাগারও কম। এতে আমার মতো অনেকেই এখন এখান থেকে চলে গেছে।   


উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জের দুইনং রেলগেট থেকে উকিলপাড়া পর্যন্ত রেললাইনের দু’পাশে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিশাল জায়গার মধ্যে গড়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের বৃহত্তম এই থান কাপড়ের মার্কেট। এর আগে ১৯৯০’র সনের দিকে একটি জলাশয় বালুদিয়ে ভরাট করে এখানে ছোট পরিসরে থান কাপড়ের ব্যবসার সূচনা হলেও এরপর বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জমির লিজ নিয়ে পরবর্তীতে সেই জায়গায় দোকান তৈরী করে পুরো দমে থান কাপড়ের ব্যবসায় নামে প্রায় ৫০০‘শ ব্যবসায়ী। আর ২০১৯ সাল নাগাদ, মার্কেটটিতে নিবন্ধিত ব্যবসায়ীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজারের বেশি এবং ব্যবসায়ী ও কর্মচারী নিয়ে সর্বমোট ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয় এখানে। ত্রিশ বছরের পথচলায় ধীরে ধীরে স্থানীয় মার্কেট থেকে এটি পরিণত হয় আন্তর্জাতিক বাজারে।

 

কাতার, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফিলিপাইন, ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশের ব্যবসায়ীরা কাপড় ক্রয় করতো এখান থেকে। এদিকে পুরনো ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অনেক নতুন ব্যবসায়ীরাও পা রেখেছিল এই থান কাপড়ের ব্যবসায়। ভেবেছিলো বদলে ফেলবে নিজেদের ও পরিবারের ভাগ্য। তবে সেই ভাগ্যেরই কি নির্মম পরিহাস! ঢাকা টু নারায়ণগঞ্জ রেললাইন ডাবললেন করার জন্য গত ১৭ ই অক্টোবর সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়; থান কাপড়ের এই পুরনো মার্কেটটি। এতে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়, বহু ব্যবসায়ী সেইসঙ্গে কর্মসংস্থান হারায় হাজারো কর্মচারী।
 

এই বিভাগের আরো খবর