শনিবার   ২৮ মে ২০২২   জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪২৯

ট্যাক্সের ভয় না আইভীর ভয়

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশিত: ১২ মে ২০২২  

# উন্নয়নে সিদ্ধিরগঞ্জ ফতুল্লার ঈর্ষা
# জরিপ কিংবা মতামত ছাড়া এমপির এমন চিঠিতে অবাক জনগণ

 

সিটি নির্বাচনের বছর দেড়েক আগে থেকেই শামীম ওসমান ও তার অনুগতরা প্রকাশ্যে ও পরোক্ষভাব আইভী সমালোচনায় বিভোর ছিলেন। কিন্তু শত বাধা আর প্রতিকূলতা কাটিয়ে আইভীই বিজয়ী হয়েছেন। এর মূলে ছিলে আইভীর দৃষ্টিনন্দন ও নগরবান্ধব উন্নয়ন। বর্তমানে আইভীর সিটি করপোরেশন আর শামীম ওসমানের অধিভুক্ত নারায়ণগঞ্জ-৪ এর নির্বাচনী এলাকা ঘুরলে আর কেউ শামীম ওসমানের কথা কানে লাগাবেননা।

 

এরমধ্যে আবার শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলকার অর্ধেক সিদ্ধিরগঞ্জকে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছেন আইভী। উন্নয়নে সিদ্ধিগরঞ্জ এখন ফতুল্লার জন্য রোলমডেল। ফতুল্লাবাসীর দীর্ঘদিনে চাওয়া ছিল তারাও সিটির অধিভুক্ত হয়ে উন্নয়নে জীবনযাত্রার মান বদলে যাবে। কিন্তু শামীম ওসমানের বাগড়ায় সেটি কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নয়, বরং এর বাইরে বসবাসকারীরাই শান্তিতে আছেন বলে দাবী করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের

 

সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান।  গত ২৫ এপ্রিল পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ে দেয়া এক চিঠিতে এই অভিযোগ করেন এমপি শামীম ওসমান। ফতুল্লা এলাকাকে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে এমন অভিযোগ করে পল্লী উন্নয়ন ওসমবায় মন্ত্রনালয়ে এই চিঠি দেন শামীম ওসমান। যদিও এই চিঠির ব্যাপারে ফতুল্লাবাসীর কোন মতামত কিংবা জরিপের আয়োজন করেননি তিনি।

 

একক ক্ষমতাবলে তিনি এটি করেছেন বলে অভিযোগ ফতুল্লাবাসীর।তারা শামীম ওসমানের চিঠির ব্যাপারটি গভীরে গিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তির প্রতি আহবান জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, অভিযোগের চিঠিতে শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দাদের চেয়ে এর বাইরের লোকজনই বেশি শান্তিতে রয়েছে।

 

যার কারন হিসেবে তিনি সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত ট্যাক্স আদায় করাকে চিহ্নিত করেন। চিঠিতে তিনি আরও জানান, আমার নির্বাচনী এলাকার ৩১ ভাগ সিটি করপোরেশনে রয়েছে। শেখ হাসিনার আন্তরিক সদিচ্ছায় আমার নির্বাচনী এলাকায় বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কাজগুলো শেষ হলে নারায়ণগঞ্জ আবারও প্রাচ্যের ড্যান্ডি হিসেবে রূপ নেবে।

 

আমার এলাকার মানুষ সিটি করপোরেশন হলে এত উন্নয়ন পেত কীনা তা সে বিষয়ে আমি সন্দিহান। কারণ আমার এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অধীনস্থ হলেও চাহিদার তুলনায় উন্নয়ন বঞ্চিত বলে তাদের মাঝে বেশ ক্ষোভ বিরাজ করছে।

 

তিনি জানান, আপনার সাথে মৌখিক আলোচনায় আপনি জানিয়েছিলেন যে, আমার নির্বাচনী এলাকার অংশ সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করে সিটি করপোরেশন সম্প্রসারনের কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছেনা কিংবা হবে না। সেখানে নারায়ণগঞ্জ-৪ ও ৫ আসনের সংসদ সদস্যদের অবগত না করেই তাদের এলাকাগুলোকে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে এই দুই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হয় এটি তারই একটা পরিকল্পনা বলে আমার মনে হচ্ছে।’

 

তবে আদতে বাস্তব চিত্র বলছে উল্টো কথা। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রচেষ্ঠায় ফতুল্লা থানার কাশীপুর, এনায়েতনগর, ফতুল্লা, কুতুবপুর এবং গোগনগর ইউনিয়ন এলাকাকে যখন সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত তখন শামীম ওসমান এই বিষয়টি জানতে পেরে গত ২৪ এপ্রিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে একটি বিভ্রান্তিকর চিঠির মাধ্যমে এসব ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের আওতায় না নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

 

শুধু তাই নয় শামীম ওসমান দাবি করেন এসব ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের আওতায় নিলে নাকি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি ঘটবে এমন কথা বলেন। শামীম ওসমান তার চিঠিতে আরো দাবি করেন, তিনি নাকি ফতুল্লার ইউনিয়নগুলিতে সিটি করপোরেশনের তুলনায় বেশি উন্নয়ন করেছেন।

 

এমনকি তার নির্বাচনী এলাকার সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকাকে সিটি করপোরেশনে নেয়ার কারনে নাকি সেখানে তেমন কোনো উন্নয়ন হয় নাই। তাই সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষ ক্ষুব্দ। যদিও সিটি করপোরেশনের নেয়ার কারনে সিদ্ধিরগঞ্জে বিগত তিনটি নির্বাচনে মেয়র আইভী বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন এবং তিনি বিগত দুটি নির্বাচনে নৌকা প্রতিক নিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।

 

শুধু তাই নয় দিনে দিনে সিদ্ধিরগঞ্জে আওয়ামী লীগের মেয়র আইভীর জনপ্রিয়তা আরো বাড়ছে। তাই শামীম ওসমান যে দাবি করেছেন তা বাস্তবতার সাথে কোনোই মিল নেই সেটা নিশ্চয়ই জানেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ সকারের প্রধানমন্ত্রী নিজেও।  বাস্তবতা হলো শামীম ওসমানের এই চিঠি পূরোটাই নিরেট মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ থাকায় আর গোগনগর সিটি করপোরেশন হওয়ায় উন্নয়নের যে কি পার্থক্য হয়েছে সেটা স্থানীয় সরকার মন্ত্রী একবার সরেজমিন পরিদর্শন করলেই দেখতে পাবেন। সিদ্ধিরগঞ্জের তুলনায় ফতুল্লায় আসলে কোনো উন্নয়নই হয়নি। আইভী মেয়র হওয়ার পর সিদ্ধিরগঞ্জে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।

 

সিদ্ধিরগঞ্জে তিনি এতো ব্যাপক উন্নয়ন করেন যে ওই এলাকায় সব ড্রেনই পরিকিল্পিতভাবে আরসিসি ঢালাই করা হয়েছে। বিপরিতে ফতুল্লায় আরসিসি ড্রেন করাতো দূরের কথা কোনো ড্রেনেজ ব্যাবস্থাই গড়ে তোলেননি শামীম ওসমান। তাই বছর প্রায় ছয় মাস গোটা ফতুল্লা থানা এলাকা বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকে।

 

ফতুল্লার এনায়েতনগর, ফতুল্লা এবং কুতুবপুর ইউনিয়নের অনেক এলাকায় প্রায় সারা বছরই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। যা কিনা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কোনো এলাকায় দেখা যায় না। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন তার তিন থানা এলাকায় অন্তত দশটি মেঘা প্রকল্প বাস্তাবায়ন করেছেন এবং করে চলেছেন।

 

এমন একটি মেঘা প্রকল্পও ফতুল্লায় দেখা যাবে না। বরং ফতুল্লার মানুষ মনে করেন উন্নয়নের নামে তাদের এলাকায় লুটপাট হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফতুল্লার রাস্তাঘাটগুলির পরিকল্পিত কোনো উন্নয়ন করা হয়নি এবং প্রশস্ত করা হয়নি। এছাড়া ফতুল্লায় কোনো বর্জ্য ব্যাবস্থাপনা নেই এবং নেই কোনো মশক নিধন কর্মসূচি।

 

যার ফলে বিপুল জনবসতিপূর্ণ ফতুল্লা থানা এলাকার মানুষ চরম দূর্ভোগের মাঝে বসবাস করছেন। তাই ফতুল্লাবাসী আশা করেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন এবং সমবায় মন্ত্রী যতো তারাতারি সম্ভব শামীম ওসমানের এই মিথ্যা চিঠিকে আমলে না নিয়ে ফতুল্লার চারটি ইউনিয়ন এবং গোগনগরকে সিটি করপোরেশনের আওতায় নেবেন।

 

এই বিভাগের আরো খবর