বৃহস্পতিবার   ২৪ জুন ২০২১   আষাঢ় ১০ ১৪২৮

দশে দশ মেয়র আইভী

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশিত: ৩১ মে ২০২১  

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দশ বছর পার করেছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এই দশ বছরে শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যাপক কাজ করেছেন তিনি। আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী গড়তে তাঁর ভূমিকা অতুলনীয়। মেয়র পদে নিজের দশ বছর পার করার পাশাপাশি তাঁর গৃহীত নারী-শিশু ও পরিবেশ বান্ধব ১০ প্রকল্পে বদলে যাচ্ছে নগরের চিত্র। প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ১০ প্রকল্পে জনকল্যাণ ও উন্নয়নমুখী নগরীর স্বপ্ন দেখছে নগরবাসী।

 

এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে নারায়ণগঞ্জ নগরীর চেনা রূপ, এজন্য নগরবাসীর প্রশংসাও কুড়াচ্ছেন সিটি মেয়র আইভী। কদমরসুল সেতু: নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর উপজেলাকে বিভক্ত করে শীতলক্ষ্যা নদী। সদর ও বন্দরে দৈনিক লাখো মানুষ খেয়া পারপার করেন।  শীতলক্ষ্যা নদীর উপর একটি সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে মদনগঞ্জ-সৈয়দপুরে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুটির নির্মাণ প্রকল্প শুরু হলেও তা এক দশকেও শেষ হয়নি। তবে মূল দাবি ছিল বন্দরের সাথে নারায়ণগঞ্জ শহরকে সংযোগ করে এমন একটি সেতু নির্মাণের।

 

মেয়র আইভীর প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর শীতলক্ষ্যা নদীর ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় কদমরসুল সেতু নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। ৫৯০ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় সেতুটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত¡বধানে বাস্তবায়িত হবে। পাঁচ নম্বর ঘাট থেকে বন্দরের একরামপুর হয়ে ১৩৮৫ মিটার সেতুর বিশেষত্ব হবে এ সেতুর একটি থেকে আরেকটি স্প্যানের দূরত্ব ২২০ মিটার। সিদ্ধিরগঞ্জে কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ ব্যবস্থাপনা: নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে দৈনিক ৬০০ মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নাসিকের তিন অঞ্চলে একাধিক পরিকল্পনা রয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে ডাম্পিং গ্রাউন্ড স্থাপনের কাজ করছে নাসিক।

 

এ লক্ষ্যে জালকুড়ি মৌজায় ২৩ দশমিক ২৯ একর জমি অধিগ্রহণে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হলে ২০১৮ সালে একনেক সভায় তা অনুমোদন পায়। ৩৪৫ কোটি ৯১ লাখ ৩১ হাজার টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। বন্দরে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সিটি কর্পোরেশনের কদমরসুল অঞ্চলের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে ধামগড় ও লক্ষণখোলা মৌজায় ৬৯ দশমিক ৮৭ একর জমির উপর স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণ প্রকল্প চলছে। ২০২০ সালে ৩০১ কোটি ৩৫ লাখ ২১ হাজার টাকার প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে কদমরসুল অঞ্চলসহ নগরীর স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত হবে। বাবুরাইল খাল: নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে বাবুরাইল খাল পুনরুদ্ধার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের দিকে। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পটি নগরীর চেহারা বদলে দিয়েছে।

 

এই প্রকল্পের আওতায় রাস্তা, আরসিসি ড্রেন, ফুটপাত, ১০টি আরসিসি গার্ডার ও ব্রিজ, ৫টি মেটাল ফুট ব্রিজ, ৩টি ভিউইং ডেক, ১টি ঘাটলা এবং ফুটপাতে স্ট্রিট লাইট অন্তর্ভূক্ত আছে। বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় চলমান প্রকল্পটি ইউএন হ্যাভিটেট কর্তৃক ‘এশিয়ান টাউনস্কেপ জুরি অ্যাওয়ার্ড-২০১৬’ এবং ইউএনডিপি কর্তৃক আয়োজিত ‘স্মার্ট সিটি ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৭’ অর্জন করেছে। সিদ্ধিরগঞ্জ খাল পুনঃখনন ও সৌন্দর্যবর্ধন: বাবুরাইল খালই নয় নাসিকের উদ্যোগে দূষণ ও দখলের কারণে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হওয়া সিদ্ধিরগঞ্জ খাল পুনঃখনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সিটি গভার্নেন্স প্রকল্পের আওতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সিদ্ধিরগঞ্জ লেক (শিমরাইল হতে ভাঙ্গারপুল পর্যন্ত) পুনঃখনন ও সৌন্দর্য্যবর্ধন শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করেন। এই প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে। প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে খালটি অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য সংরক্ষিত জলাধার (রিটেনশন পুকুর) হিসেবে কাজ করবে।

 

একই সাথে বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হবে খালের দুই পাড়। এই প্রকল্পে থাকবে ১টি এম্ফিথিয়েটার, নৌকা চালনার ৯ টি ঘাট, ৩ টি ভাসমান মঞ্চ, ৩ টি ওয়াটার গার্ডেন, ৩ টি ঝুলন্ত বাগান, ২ টি ফোয়ারা, ৬ টি দোলনা, ১৩২ টি সিটিং বেঞ্চ ও ৩ টি ফুট ওভার ব্রিজসহ আরও অনেক কিছু।  শেখ রাসেল পার্ক: নগরীর মধ্যে বিনোদন কেন্দ্র নেই। এমন অভিযোগ ছিল নগরবাসীর। সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে নগরীর দেওভোগে পরিত্যক্ত জলাশয়ে শেখ রাসের নগর পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। তবে ইতিমধ্যে পার্কটি নগরীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পার্কের মধ্যে হাতিরঝিলের আদলে নির্মিত লেকটির দৈর্ঘ্য ৬৭০ মিটার ও প্রস্থ ৭৫ মিটার।

 

শেখ রাসেল পার্কটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। পার্কের ভেতরে শিল্প সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশে বিদ্যমাণ চারুকলা ভবনটির স্থলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি পরিবেশ বান্ধব চারুকলা ভবনও নির্মাণ করা হচ্ছে। লেকের চারপাশে ওয়াকওয়ে, স্ট্রিট লাইট, সিটিং প্যাভেলিয়নসহ পরিবেশবান্ধব গাছপালা লাগানো হয়েছে। এছাড়া দর্শনার্থীদের অবসর কাটানোর জন্য ৪ টি ভিউং ডেক ও ৬ টি ঘাটলা নির্মাণ করা হয়েছে। আছে শেখ রাসেলের ম্যুরাল, খেলাধুলার জন্য মাঠ, লেকের দুইপাশে পারাপারের জন্য নয়নাভিরম ব্রিজ। পার্কে থাকবে বোট ক্লাব, সুইমিং পুল, ওয়াটার গার্ডেন, জিমন্যাস্টিক ক্লাব, ওয়াটার বডি, ড্রাই ফাউনটেইন, স্কেটিং জোন, সাইকেল লেন।পরিচ্ছন্ন কর্মী নিবাস নির্মাণ: নগরীর পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত কর্মীদের (সুইপার) জন্য ভবন নির্মাণ করে দিচ্ছে নাসিক। ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে পরিচ্ছন্ন কর্মী নিবাস নির্মাণ’ প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়।

 

এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫৪০টি পরিবারের জন্যে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭টি ১০তলা বিশিষ্ট ভবনে ৫৪৯টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ৫৬০ বর্গফুট। এতে ৫৪৯ পরিবারের ৯৫১ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী পুনর্বাসনের আওতায় আসবে। নগর ভবন নির্মাণ: জনসাধারণকে কাঙ্খিত নাগরিক সেবা প্রদানের জন্য লক্ষ্যে নিজস্ব ও সরকারি অর্থায়নে ১০ তলা বিশিষ্ট নগর ভবন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। যার প্রায় ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। ভবনটি নির্মাণে খরচ হবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এই নগর ভবনে মেয়রের কার্যালয় ছাড়াও থাকবে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস সমৃদ্ধ যাদুঘর, ৩ টি মাল্টি পারপাস হল, ক্যাফেটেরিয়া, ঝুলন্ত চাল বাগান, নামাজের স্থান, সভাকক্ষ সহ অনেক কিছু।

 


এলইডি স্ট্রীট লাইট স্থাপন: নগরবাসীর রাতে চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বাধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তির বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এলইডি সড়ক বাতি স্থাপনের জন্য প্রায় ৪৩ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই কাজেরও প্রায় ৯৫ শতাংশ অগ্রগতি রয়েছে বলে জানাচ্ছে নাসিক।আলী আহম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তন: ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পৌর পাঠাগারটি নগরবাসীর জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ গঠন ও দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

 

সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগারটি প্রথম তলা থেকে দ্বিতীয় তলায় উন্নীত করেন। ভবনটির প্রথম তলায় লাইব্রেরি এবং দ্বিতীয় তলায় ছিল মিলনায়তন। যেখানে নিয়মিত নাটক, কবিতা আবৃত্তি, নাচ-গানসহ সংস্কৃতি চর্চা করা হতো। নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতি কর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মতামত নিয়ে নির্মিত এই পাঠাগারটি নির্মাণে প্রায় ২৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ৬ তলা বিশিষ্ট পাঠাগারটির লেভেল-১ থেকে লেভেল-৪ পর্যন্ত আছে ২৮০ আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়ামের সঙ্গে আছে সেমিনার কক্ষ, উন্মুক্ত গ্যালারি ও আর্ট গ্যালারি। লেভেল ৫ থেকে লেভেল-৬ এ আছে পাবলিক পাঠাগার, স্টুডিও থিয়েটারসহ খোলা আকাশ দেখার ব্যবস্থা। এছাড়াও নগরবাসীর বিনোদনের জন্য ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে স্থাপিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জের প্রথম ৩৫ আসনবিশিষ্ট মিনিপ্লেক্স ‘সিনেস্কোপ’।
 

এই বিভাগের আরো খবর