বৃহস্পতিবার   ২৪ জুন ২০২১   আষাঢ় ১১ ১৪২৮

দায়ী আইয়ুব, ইউএনও সেফ 

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশিত: ৫ জুন ২০২১  

অবশেষে ফরিদউদ্দিন কান্ডের সব দোষ বর্তালো ইউপি মেম্বার আইয়ুব আলীর ঘাড়ে। জাতীয় হটলাইন ‘৩৩৩’এ খাদ্য সহায়তা চেয়ে শাস্তির মুখোমুখি হওয়া অসহায় ফরিদ উদ্দিনের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ইউএনও আরিফা জহুরাকে বাচিয়ে একতরফাভাবে ওয়ার্ড মেম্বার আইয়ুব আলীকে দোষী করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।

 

বৃহস্পতিবার রাত রাড়ে ৯টায় তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শামীম বেপারী জেলা প্রশাসকের ডাক বাংলোতে গিয়ে তার কাছে প্রতিবেদনটি দাখিল করেন। পাঁচ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকশ ডকুমেন্ট ও ভিডিও ফুটেজ জমা দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।


 
প্রতিবেদনে ইউএনও আরিফা জহুরাকে সরাসরি দোষী করা না হলেও ভবিষ্যতে ‘৩৩৩’ এর ফোনের ক্ষেত্রে সেবা গ্রহীতা সম্পর্কে  ঝোঁজ খবর নিতে শুধু মাত্র স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উপর নির্ভর না করে এলাকার মুক্তিযোদ্ধা, মসজিদের ইমাম এবং প্রয়োজন বোধে গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ঘটনার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধির যথাযথ ভাবে তথ্য দিতে না পারাকেই দায়ি করা হয়েছে। যেহেতু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সেবা গ্রহীতার আর্থিক সঙ্গতির বিষয়ে যথাযথ ভাবে তথ্য দিতে পারেননি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাকে আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাই ভবিষ্যতে ‘৩৩৩’ এর ফোনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আরও সতর্ক হওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

 

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, প্রতিবেদনটি তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত ১৮ মে জাতীয় হটলাইন ‘৩৩৩’ এ ফোন করে খাদ্য সহায়তা চেয়ে বিপাকে পড়েন অসহায় ফরিদ উদ্দিন। সরকারি খাদ্য সহায়তাতো জোটেইনি বরং, স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারে দেওয়া ভুল তথ্যে সদর  উপজেলার ইউএনও  তাকে উল্টো একশ জনকে খাদ্য সহায়তা করার শাস্তি দেন। তা না করা হলে তাকে ৩ মাসের কারাদন্ডের ভয় দেখানো হয়।


 
ইউএনও’র দেওয়া এমন নির্দেশে স্ত্রী ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর গহণা বন্ধক রেখে ও উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে একশ জনের জন্য খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করেন তিনি।গত ২ মে বিকেলে ফরিদ উদ্দিনের নগরের নাগবাড়ি এলাকার বাড়ির সামনে ফরিদ উদ্দিনের উপস্থিতিতে সেই খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন ইউএনও আরিফা জহুরা। ওই সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ফরিদ উদ্দিন। তখনই ভিয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে ভাইরাল হয় যে, অসহায় ফরিদ উদ্দিন ‘৩৩৩’ এ খাদ্য সহায়তা চেয়ে এই বিপাকে পড়েছেন।

 

কারণ স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার আইয়ুব আলী ফরিদ উদ্দিন সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছিল। আইয়ুব আলী ইউএনওকে জানিয়েছিলেন যে, ফরিদ উদ্দিন ৪ তলা বাড়ির মালিক এবং ব্যবসায়ী। মেম্বারের দেওয়া ভুল তথ্যে গত ২০ মে ইউএনও ফরিদ উদ্দিনের বাড়ির সামনে গিয়ে অযথা ‘৩৩৩’ এ ফোন করে সরকারি কাজে বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগে ফরিদ উদ্দিনকে একশ জন অসহায়কে খাদ্য সহায়তা করার সাজা দেন।


 
এদিকে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে তা গণমাধ্যম কর্মীদের দৃষ্টিতে আসে। গণমাধ্যম কর্মীরা বিয়টি সম্পর্কে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লার কাছে জানতে চাইলে তিনি গত ২ মে ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক  (সার্বিক) মো. শামীম বেপারীকে প্রধান করে ৩সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন এবং সেদিনই ইউএনওকে ফরিদ উদ্দিন যে টাকা খরচ করেছেন তা ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ইউএনও’র অনুরোধে স্থানীয় ব্যবসায়ি ও পঞ্চায়েত কমিটির উপদেষ্টা শাহীনুর আলম ফরিদ উদ্দিরনকে ৬০ হাজার টাকা সহায়তা দেন।


 
এদিকে গত বুধবার তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শামীম বেপারীর নেতৃত্বে মোট ৪ জন ঘটানর শিকার ফরিদ উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে তার বক্তব্য গ্রহণ করেন। তদন্ত কমিটির পক্ষে শামীম পোরী ফরিদ উদ্দিনের কাছে জানতে চান যে, তার দেওয়া ভুল তথ্যেই কী এমন ঘটনা ঘটেছে কিনা ? ওই সময় ফরিদ উদ্দিন তদন্ত দলকে বলেন যে, তিনি হটলাইনে ফোন দিয়ে খাদ্য সহায়তা চাওয়ার পরদিন আমার প্রতিবেশি স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার আইয়ুব আলী তাকে ডেকে নিয়ে কেন আমি ‘৩৩৩’ তে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছি তা জানতে চান। পরে জানতে পেরেছি তিনিই ইউএনওকে ভুল তথ্য দিয়েছেন যে আমার ৪তলা বাড়ি এবং ব্যবসা আছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে বাড়িটি আমার পৈত্রিক সম্পত্তি। এর মালিক আমরা ৬ ভাই এক বোন। আমি চতুর্থ তলায় দুইটি কক্ষের মালিক। আমি একটি হোসিয়ারীতে কাজ করি। কিন্তু তিনবার ব্রেন স্ট্রোক করায় এখন আমি চোখে কম দেখতে পাই।

 

এখন হোসিয়ারির কর্মচারীদের দেখভাল করার দায়িত্বে থেকে মাসে ৮হাজার টাকা বেতন পাই। ঘরে আমার বিবাহযোগ্য এক মেয়ে এবং প্রতিবন্ধী এক ছেলে রয়েছে। মেয়ে নিজে টিউশনি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ চালায়। আমি মোটেও স্বচ্ছল নই। এফএম রেডিওতে শুনেছি যাদের খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন তারা জাতীয় হটলাইন ‘৩৩৩’এ ফোন করে খাদ্য সহায়তা চাইলে খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়। একারণে আমি ফোন করেছিলাম। ইউএনও যখন আমার বাসার সামনে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে এই বাড়ির মালিক আমি কিনা, তখন আমি বলেছিলাম এটি আমাদের বাড়ি। আমি বাড়িটির বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে চাইলেও তিনি আমাকে কথা বলার সুযোগ না দেয়ায় আমি কিছু বলতে পারিনি। মোট কথা আমাকে কথা বলতে দেয়া হয়নি। কথা না শুনেই আমাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।


 
এদিকে ঘটনা সম্পর্কে ইউএনও আরিফা জহুরা বলেন, তদন্ত কমিটির কাছে আমি ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছি। প্রকৃত পক্ষে স্থানীয় মেম্বার আইয়ুব আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি ফরিদ উদ্দিন সম্পর্কে আমাকে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। পরে আমি ফরিদ উদ্দিনের বাসার সামনে গিয়ে তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেও তিনিও আমাকে প্রকৃত তথ্য দেননি। যে কারণে আমি তাকে প্রকৃত অসহায় একশ জনকে খাদ্য সহায়তা করার নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু  পরে তার প্রকৃত অবস্থা জানার পর তার খরচ করা ৬০ হাজার টাকা ফেরৎ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। 

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য কাশীপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড মেম্বার আইয়ুব আলীর বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে ফোন করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়ায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। 

এই বিভাগের আরো খবর