শনিবার   ৩১ জুলাই ২০২১   শ্রাবণ ১৬ ১৪২৮

দুর্ঘটনায় মালিকের নির্দেশে বন্ধ হয় গেট, শ্রমিকের হয় সর্বনাশ

লতিফ রানা

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২১  

আমাদের দেশে যতগুলো অগ্নিকাণ্ডসহ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের বাহিরে বের হতে দেয়া হয় না। এমনিতেই বেশীরভাগ কারখানায়ই থাকে না পর্যাপ্ত পরিমান কিংবা পর্যাপ্ত পরিমাপের বহিরগমনের ফটক (গেট)। তার পরও যেগুলো থাকে সেসব ফটকগুলো থাকে তালাবদ্ধ।

 

এমনকি প্রায় ঘটনায়ই শোনা যায় যে, গেটের নিরাপত্তাকর্মীরা বলেন, মালিকের নির্দেশ তাই তালা খোলা যাবে না। আর এই গেট বন্ধ থাকার কারণে হতাহতের সংখ্যা প্রায় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাতে কার কি লাভ জানি না, তবে যারা এ ধরণের ঘটনার শিকার হন, তাদের পরিবার ও স্বজনরা বুঝতে পারেন, তাদের কি পরিমান ক্ষতি হলো। হয়তো তারা শ্রমিক কিংবা দিনমজুর, তাদের নুন আনতে পানতা ফুরোয়, মালিক পক্ষ বা বিত্তবানদের কাছে হয়তো তাদের জীবনের কোন মূল্য নেই, কিন্তু তাদের স্বজনদের কাছে তারা মহামূল্যবান।

 

এই বিষয়টির উপর প্রশাসন কিংবা মালিকপক্ষ নজর না দেয়ায় হতভাগ্য শ্রমিকদের মৃত্যুর তালিকা হচ্ছে কয়েকগুণ বেশী। অথচ যেকোন দুর্ঘটনায় কর্তৃপক্ষের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের নিরাপদে বাহিরে বের করা বা বের হতে দেয়া। কীসের যুক্তিতে বা কি কারণে তাদের তালাবদ্ধ করে রাখা হয় তা শুধু কর্তৃপক্ষ নামের লোকগুলোই বলতে পারবে। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সাভার উপজেলার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল এলাকার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীণ ফ্যাশনে যখন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তখন ১১৭ জন নিহত হয় এবং আহত হয় প্রায় ২০০জনের অধিক। তখনও শ্রমিক ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ ছিল যে, অগ্নিকাণ্ডের সময় ফ্লোরের গেটে তালাবদ্ধ ছিল, এবং শ্রমিকদের বাহিরে বের হতে দেয়া হয়নি।

 

অনেক স্বজন জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সময় তাদের স্বজনদের সাথে মোবাইলে কথা বলার সময়ও শ্রমিকরা জানিয়েছিলেন যে, গেট তালাবদ্ধ থাকায় শ্রমিকরা বাহিরে বের হতে পারছেন না। অথচ ঐ মুহুর্তে শ্রমিকদের বাহিরে বের হতে দেয়া ছিল কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তারও আগে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার গোদনাইল জেলেপাড়া এলাকার শান নিটিং মিলস লিমিটেড এর অগ্নিকাণ্ডে ঘটনায় ২২ জন শ্রমিক নিহত হয়। সে সময়ও শ্রমিক ও স্বজনসহ বিভিন্ন বিভাগ থেকেও তালাবদ্ধ গেটের অভিযোগ তুলেছিল। এবং তখন একাধিক উদ্ধারকর্মী জানিয়েছিলেন যে গেট তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল।

 

আরো একাধিক দুর্ঘটনার একই অভিযোগ ওঠে। সদ্য সংঘটিত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ফুডস ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগার ঘটনায়ও ওঠেছে একই রকমের অভিযোগ। সেখানে একাধিক শ্রমিক ও নিহতদের স্বজনরা জানান, তাদের সাথে শ্রমিকদের সর্বশেষ মোবাইলে যোগাযোগ করার সময় তারা আর্তনাদ করে জানান, গেটে তালা দেয়া তাই তারা বাহিরে বের হতে পারছেন না। শ্রমিকরা যখন চিৎকার করে গেট খুলতে বলেন তখন গেটে থাকা নিরাপত্তা কর্মী উত্তর দিয়েছেন, ‘গেট খোলা যাবে না মালিকের নির্দেশ’। এই ঘটনায়ও ঝড়ে যায় ৫২জন শ্রমিকের প্রাণ। একই সাথে হাজারো স্বজনের জন্য রেখে যান দুঃস্বপ্ন, নিরাশা আর একবুক আর্তনাদ। এ সময় বিভিন্ন উদ্ধার কর্মীরাও জানান, কলাপসিবল গেটে তালা দিয়ে রাখায় শ্রমিকরা বের হতে পারেনি। ফলে দগ্ধ হয়ে ভবনের ফ্লোরেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধনও এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।


 
অগ্নিকাণ্ডের পরেরদিন শুক্রবার মেয়ে মিতুর সন্ধানে আসা বিল্লাল হোসেন জানান, আগুন বেশ কিছুক্ষণ পর তার মেয়ে তাকে মোবাইলে ফোন করে বাঁচানোর আকুতি জানায়। মিতু বলে, এখানে ধোঁয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছেনা। বেশ কয়েকজন মিলে গেটের সামনে চলে এসেছে কিন্তু গেটে তালা লাগানো তাই বের হতে পারছেন না। এ সময় সে বারবার তার বাবাকে আকুতি জানায় গেটের তালা খুলে দেয়ার জন্য। সেখান থেকে ফিরে আসা শ্রমিকসহ উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তারা জানান, কারখানায় আগুন লাগার পর নিয়োজিত কর্মীরা ভবনের ৪র্থ তলার কলাপসিবল গেটে তালা বদ্ধ করে রাখে। আগুন সহজেই নিয়ন্ত্রণে আসবে মনে করে শ্রমিকদের বের হতে দেওয়া হয়নি। ভবন থেকে বের হওয়ার বিকল্প সিঁড়ি কিংবা দরজা ছিল না।

 

এবিষয়ে কথা বললে বিকেএমইএ এর সহসভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল জানান, এটা কোন রকমেই আমাদের রুলস-এ আসে না। এটা অবশ্যই উচিৎ না। আমরা গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে নিয়মিত তদারকি করাতে বর্তমানে আমাদের কম্প্লায়েন্স ইস্যুতে এখন বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ে চলে আসছি। গার্মেন্টস কারখানার যারা আমরা আমাদের শর্ত না মানে না আমরা তাদের সার্টিফিকেট দেইনা বা মেম্বার বানাই না। কলাপসো গেটকেই আমরা গার্মেন্টসে অনুমোদন করি না। কলকারখানা অধিদপ্তরের এই বিষয়চি নিয়ে পুরোপুরি তদারকি করা উচিৎ। শুধুমাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই একটি কারখানা তৈরী করে ফেলে, এটা আটকাতে হবে।

 

তিনি আরো বলেন, এই অধিদপ্তরের কাছে লিস্ট থাকে আমাদের কলকারখানা কয়টি। এগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। এখানে ফায়ার সার্ভিসেরও বিরাট ভ‚মিকা আছে। তাদেরও এসব বিষয়ে তদারকি এবং রিনিউ এর বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিৎ। তারমতে কারখানা অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস যদি এ বিষয়ে ঠিকমতো নজরদারি রাখে তাহলে এধরণের ঘটনাগুলো অনেকাংশে কমে যাবে।

 

এ বিষয়ে অগ্নিকাণ্ডে পরেরদিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী জানান, দুর্ঘটনার সময় গেট বন্ধ রাখার কোন সুযোগ নেই। তবুও যেহেতু অভিযোগটি ওঠেছে, তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার ব্যবস্থা নেয়া হবে।
 

এই বিভাগের আরো খবর