বৃহস্পতিবার   ২৪ জুন ২০২১   আষাঢ় ১১ ১৪২৮

প্রদীপ গ্রেফতার-পলাতক রেহানা, ভোল পাল্টেছেন জহিরুল

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২১  

প্রতারণার বহুমুখী সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতা ‘সমাজের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার’ প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান  প্রদীপ চন্দ্র বর্মণকে এক সহযোগীসহ গ্রেফতার হয় র‌্যাব-১১।  মামলা দায়েরের পর তারা দুজনই কারাগারে। এঘটনার আগেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা দায়েরের পর গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন প্রতারক সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌসী আক্তার রেহেনা। এই প্রতারণা সংগঠনটির আরেক কুশীলব মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম গ্রেফতার এড়াতে এখন নানা ছলাকলার আশ্রয় নিয়েছে।

 

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, এই প্রতারক চক্রের মাস্টার মাইন্ড হিসেবে পরিচিত জহিরুল ইসলাম। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং কয়েকজনের মাধ্যমে এখন তার পক্ষে সাফাই গাইতে সংযুক্ত করেছেন। জহিরুল ইসলাম নিজেই এই প্রতারক চক্রকে সহযোগিতার কথা তুলে ধরেছেন।  তিনি এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, আমি মো. জহিরুল ইসলাম অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত।ফেসবুকে প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ দেখে নিজ উদ্যোগে আমাদের সাথে যোগাযোগ করে এবং তার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের জেলা ভিত্তিক অঙ্গসংগঠন খোলার প্রস্তাব দেয়। এবং আমরা তার সব সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দেখে (শর্ত দেই) অঙ্গসংগঠন খোলার সম্মতি দেই, কিছু টাকাও প্রদান করি। কিন্তু অদ্যবধি প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ কোন কাগজ উপস্থাপন করতে না পারায় কোন ধরণের কাজে সম্পৃক্ত হইনি।

 

তিনি দাবি করেন, তার অনুুমতি ছাড়াই প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ তার ফেসবুকে আমাদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করেছে। আমাদের কোন সম্মতি কিংবা স্বাক্ষর নেননি।যার কোন প্রমাণ কেউ দিতে পারবেনা। এদিকে সূত্র জানিয়েছে, প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ ও ফেরদৌসী আক্তার রেহানা মূলত নানা কায়দায় মানবাধিকার ও সাংবাদিক পরিচয়ে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিল নারায়ণগঞ্জে। রেহানা মুসকান এবং জহিরুল হক দুজনই এক প্রতারণা চক্রের সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত।  

 

এছাড়া নানা চক্রের হয়ে তারা বিভিন্ন ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে সম্মানহানির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করতো। ফেরদৌসা আক্তার রেহানার বিরুদ্ধে এক নারী আইসিটি মামলা দায়েরের পর গত ২০ মে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে নানা সংগঠনের বরাত দিয়ে মানববন্ধনে নামে এই প্রতারক চক্রটি। গ্রেফতারের পর র‌্যাবের অনুসন্ধানেও বেরিয়ে এসেছে এই প্রতারক চক্রটির অপকর্মের বিষয়টি।  নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের সাথে ব্যবসায়ী এক নারী সায়েদা শিউলীর সম্পর্ক ও বিবাহের ঘটনা জানাজানির পর খোরশেদের পক্ষে সায়েদা শিউলীর চরিত্রহননের মূল দায়িত্ব পালন করে আসছিল ফেরদৌসী আক্তার রেহানা ওরফে রেহানা মুসকান।

 

অভিযোগ রয়েছে, এই ঘটনার স্ক্রিপ্ট রাইটার জহিরুল হক, যিনি সায়েদা শিউলীর সাবেক স্বামী। নানা অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ ও চরিত্র হননের জেরে মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও ফেরদৌসী আক্তার রেহানার বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা দায়ের করেন সায়েদা শিউলী।এরপর  থেকে পলাতক হন রেহানা মুসকান ও  কাউন্সিলর খোরশেদ। তবে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে রেহেনা আক্তার ফেরদৌসী তার নিয়ন্ত্রানাধীন প্রতারক চক্রটিকে নানা ব্যানারে সামনে আনেন এবং নানা অপপ্রচার চালানো শুরু করেন। এর  গুরু দায়িত্ব পালন করেন জহিরুল হক। আর তাই জহিরুল হক ও রেহানা মুসকানসহ এই প্রতারক চক্রের সকল সদস্যকে গ্রেফতারেরর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

 

নানা জনের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে  গত ৩১ মে দিনগত রাত ৩টায় র‌্যাব-১১ এর  ব্যাটালিয়ন সদর এর চৌকস দল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মাদানীনগর এলাকা হতে বহুমুখী সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের মূলহোতাসহ দুইজন প্রতারককে গ্রেফতার করে। এসময় গ্রেফতারকৃতদের হেফাজত হতে ১টি প্রাইভেটকার, মোবাইল ২টি, ব্যানার, জীবনবৃত্তান্ত ফরম, সাংবাদিক আইডিকার্ড, তালাশ নিউজ-৭৯ টিভি কার্ড উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতাররা হলো  প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ (৩৫), মো.আনিসুর রহমান (৪৫)। র‌্যাব-১১’র সিনিয়র এএসপি প্রণব কুমার এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানান।  

 

র‌্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, বহুমুখী প্রতারক চক্রের মূলহোতা প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ ওয়াকিটকি সেট, মনোগ্রাম সম্বলিত জ্যাকেট ও হ্যান্ডকাফ দেখিয়ে নিজেকে একাধারে ‘সমাজের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’ তালাশ নিউজ টিভি-৭৯ ও দৈনিক সত্যের সংগ্রাম পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে পরিচয় প্রদান করে থাকে এবং সে ভুয়া আইডি কার্ড তৈরি করে, ট্রাফিক পুলিশ ও যুব ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চাকুরীর আশ্বাস দিয়ে এবং তার কথিত টিভি চ্যানেল ও ‘সমাজের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার’ অন্যান্য সদস্যপদে ও নিউজ চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে সরল বিশ্বাসী মানুষের কাছ থেকে চাকুরী প্রদানের আশ্বাস দিয়ে পরিকল্পনা মাফিক বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিত বলে জানায়।

 

পরবর্তীতে তার কাছে কেউ টাকা ফেরত চাইলে তার কথিত টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে সে তাদের অত্যাচারের হুমকি প্রদান করত বলে ভুক্ত ভোগীদের কাছ থেকে জানা যায়।  র‌্যাব জানায়, চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো এই যে, এই প্রদীপ চন্দ্র নিজে এক সময় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিল। ২০১৫ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বাক্ষর জাল করার অপরাধে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা  হয়েছিল।

 

এছাড়াও অবৈধভাবে ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার ও বিতরণ করার অপরাধে তার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে টাঙ্গাইলের কালিহাতি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রতারক প্রদীপ এর প্রধান সহযোগী আনিসুর রহমান নিজে মূলত একজন রিকশা চালক বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে নতুন সদস্য সংগ্রহের কাজে তাকে বিভিন্ন ভাবে সহায়তা করে আসছিল বলে জানা যায়। অভিযোগ প্রাপ্তির পর সরেজমিনে বিষয়টি সত্যতা যাচায়ের পর র‌্যাব-১১ তথ্য প্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই বহুমুখী প্রতারক চক্রের মূলহোতা ও তার সহযোগী আনিসুর রহমানকে হাতে-নাতে গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাব-১১ এমন প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে এবং এই ধরণের অভিযান অব্যাহত থাকবে।   


 

এই বিভাগের আরো খবর