শনিবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১   আশ্বিন ১০ ১৪২৮

বাঁশের তৈরি পণ্য বিক্রি করে ভাগ্য পরিবর্তন

আশরাফুল আলম

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২১  

সোনারগাঁ উপজেলার গুলনগর গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৫৪)। প্রায় ৩০ বছর ধরে বাঁশ দিয়ে পাইছা, পাতি, কুলা, খাঁচা, বড় টুকরি, ছোট টুকরি, মুরগীর খাঁচা, মাছ রাখার খাঁচি, চালনী, বুকসেলফ, কলমদানী ও ফুলদানীসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির কাজে জড়িত। দেশে এসব পণ্যের চাহিদা সারা বছরই থাকে বিধায় লাভের পরিমান বেশি।

 

বাঁশের তৈরি প্রতিটি পণ্য বিক্রি করলে ৪০/৫০ টাকার মত লাভ হয়। সে জন্য রোকেয়া বেগম দাম্পত্য জীবনের শুরুতে তার স্বামী আসন আলীর হাত ধরে এ পেশায় এসেছেন তিনি। সেই থেকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রোকেয়া বেগমের পরিবারকে। শুরুতে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে গুলনগর নামে একটি গ্রামের অর্থনৈতিক চাকা ঘুরিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাবলম্বী করেছেন।

 


নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী গুলনগর গ্রাম। এ গ্রামের প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ বংশ পরম্পরায় বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছে। স্থানীদের চাহিদা মিটিয়ে বাঁশের তৈরি বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী দেশের বড় বড় হাট বাজার গুলোতে পাঠাচ্ছে গুলনগর গ্রামের বাসিন্দারা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকার মহাজনরা এ গ্রামের কারিগরদের কাছ থেকে বাঁশের তৈরি পণ্য কিনে নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাঁট বাজারে বিক্রি করেন।

 


গুলনগর গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম জানান, তার স্বামী আসন আলী পাকিস্তান আমল থেকে এ গ্রামে প্রথম বাঁশের তৈরি পণ্য তৈরি করা শুরু করেন। পাশাপাশি গুলনগর গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাদের বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করার কাজও তিনি শিখিয়েছেন। একটানা ৩৭ বছর তিনি এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিগত কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। রোকেয়া বেগম ও তার স্বামীর দেখাদেখি এ গ্রামের মানুষ এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। পুরুষদের পাশাপাশি বর্তমানে গুলনগর গ্রামের নারীরা এ পেশায় এগিয়ে রয়েছেন। এক সময়ের অভাব অনটনে থাকত এ গ্রামের মানুষ। নারী-পুরুষ এক সঙ্গে এ পেশায় এসে কাজে মনোযোগি হওয়ার কারণে গ্রামের সবাই এখন স্বাবলম্বী। সবার পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে। তিনি আরো জানান, পরিশ্রম করলে যে কোনো পেশায় থেকেও যে স্বাবলম্বী হওয়া যায় এ গ্রামের মানুষ তা প্রমাণ করেছে।

 


গতকাল সকালে গুলনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মানুষ তাদের বাড়ির উঠানে বাঁশ কেটে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী তৈরি করছেন। পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও সমান তালে এ কাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে আমরা বাঁশের পাইছা, পাতি, খাঁচা, বড় টুকরি, মুরগীর খাঁচা, মাছ রাখার খাঁচি, কুলা, চালনী, কলমদানী, ফুলদানী তৈরি করি। এসব পণ্য তৈরি করে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বংশ পরম্পরায় আমরা এ কাজ করছি। একাজ শিখতে লেখাপড়া জানতে হয়না। আমরা তাই তেমন লেখাপড়া শিখতে না পারলেও ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠাই।

 


বাঁশের তৈরি বিভিন্ন পণ্য তৈরির কারিগর গুলনগর গ্রামের জমিলা খাতুন (৪৫) জানান, আমাদের গ্রামের আসন আলীর মাধ্যমে এ গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ এ পেশায় জড়িত হয়েছেন। গ্রামের পুরুষদের পাশাপাশি প্রায় ৩০ ভাগ নারী এখন এ পেশায় যুক্ত। এ পেশায় কাজ করে গ্রামের একজন দক্ষ নারী কারিগর মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকে। বর্তমানে এ গ্রামে এখন কারো ঘরে অভাব অনটন নেই বললেই চলে, সবাই অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী।

 


সাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ জানান, গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য বাঁশের তৈরি পণ্য। গুলনগর গ্রামের নারী-পুরুষরা বংশ পরম্পরায় এ পেশায় যুক্ত। এ পেশায় তাদের গ্রামের অনেকেরই ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। ছেলে মেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে তারা বেশ ভাল আছেন।
 

এই বিভাগের আরো খবর