মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০২৪   আষাঢ় ১১ ১৪৩১

বাবুর ছত্রছায়ায় চেয়ারম্যান প্রার্থী বালু মহালের সম্রাট স্বপন

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৭ মে ২০২৪  

 

 

অনেকের কাছেই রাজনীতি হচ্ছে আলাদীনের চেরাগ। কেননা রাজনীতিকে পুঁজি করে অতি সহজেই ক্ষমতার মসনদে বসা ও অর্থবিত্তের খনি খুঁজে পাওয়া যায়। ঠিক এমনিই আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়ার সাবেক চেয়ারম্যান আড়াইহাজারের  মেঘনা নদের বালু মহালের সম্রাট সাইফুল ইসলাম স্বপন রাজনীতিকে পুঁজি করে নারায়ণগঞ্জ-২(আড়াইহাজার) আসনের সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবুর আশকারায় বালু মহল দখল করে কোটি কোটি টাকার খনি পেয়ে কালাপাহাড়িয়ার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদের ক্ষমতার মসনদ দখল করে বসে।

 

আর এই বালু মহলের সম্রাট অর্থবিত্ত ক্ষমতার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যান। কিন্তু আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে একটি পর্যায়ে নিজের ক্ষমতার মসনদের অপব্যবহার ও বালু মহলের সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে হত্যা, হামলা, মামলা নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটাতে কোনরকম দ্বিধা বোধ করেননি এই বালু স্বপন। তবে এই সমস্ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে রাজনীতিতে নিজেকে আরো পাকাপোক্ত করতে পেরে স্থানীয় সাংসদের গুড বুকে চলে যান।

 

আর এই বালু স্বপনকে পুরস্কার স্বরূপ স্থানীয় সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবু তার অন্যাতম মাই ম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ইচ্ছেমত পোষণ করেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবু আসন্ন আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ত্যাগী প্রবীণ দুঃসময়ের নেতাদের বাদ দিয়ে উপজেলার চেয়ারম্যান পদে ইউপি নির্বাচনে ফেইল করা প্রার্থীকে তার আর্শীবাদপুষ্ট চেয়ারম্যান পদ প্রার্থী হিসেবে এই বালু স্বপনকে সমর্থন করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাচ্ছেন।

 

স্থানীয় সূত্র বলছে, আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পূর্ব মুহুর্ত থেকেই দলীয় সাংসদদের তার অনুগত প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন বা কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না বলে কঠোরভাবে হুশিয়ারি দিয়েছিলেন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় বৃহস্পতিবার (২ মে) আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা যাতে কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ না করে সে জন্য তাদেরকে সতর্ক করেন আওয়ামীলীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দলকে কুক্ষিগত করে না রেখে সবাইকে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দেন।

 

কিন্তু নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঘটেছে তার ব্যতিক্রম। কারণ আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে নজরুল ইসলাম বাবুর হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ উঠেছে। কারণ আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ার কারণে দলীয় কোন প্রার্থীর পক্ষে স্থানীয় সাংসদের কোন প্রকাশ হস্তক্ষেপ বা একক সমর্থন করার সুযোগ নেই। সে জায়গায় নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সাংসদ হয়ে সংসদের হুইপ হয়েও আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে একজন বিতর্কিত বালু মহলের সম্রাট হিসেবে বিভেচিত সাইফুল ইসলাম স্বপন (ঘোড়া) প্রতীককে সমর্থন করেছেন।

 

এমনকি অন্যান্য প্রার্থীদের চাপ প্রয়োগ করে মনোনয়ন প্রত্যাহারের মাধ্যমে সিলেকশনে বালু সম্রাট স্বপনকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত করতে চেয়েছিলেন। আর এই ঘটনা আওয়ামীলীগের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জনসাধারণের মধ্যেও স্পষ্ট। কারণ গত ২ মে দলীয় প্রতীক বরাদ্দের পরদিন থেকেই আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামীলীগ ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে নারায়ণগঞ্জ-২(আড়াইহাজার) আসনের সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবু বিভিন্ন সভা করে মতবিনিময় করছেন সেখানে সাইফুল ইসলাম স্বপন (ঘোড়া) প্রতীকের প্রার্থীও উপস্থিত থাকছেন।

 

এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও স্থানীয় সাংসদের সাথে এই চেয়ারম্যান প্রার্থীকে দেখা যাচ্ছে। তবে গত ৪মে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের এক সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে নজরুল ইসলাম বাবু বলে ফেলেন, শেখ হাসিনার দলের প্রার্থী আমাদের একক প্রার্থী হলো সাইফুল ইসলাম স্বপন। স্বপন আওয়ামীলীগের প্রার্থী। স্বপন নির্বাচিত হলে এলাকার অনেক উন্নায়ন হবে। তার এমন বক্তব্য এবং বালু স্বপনকে নিয়ে একজন সাংসদ হয়ে একজন বিতর্কিত চেয়ারম্যান প্রার্থীকে নিয়ে মাতামাতির কারণে আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা বিক্ষুদ্ধ।

 

কারণ স্থানীয় নেতাকর্মীরা দাবি করছে, আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামীলীগে বালু মহলের সম্রাট একজন বিতর্কিত আওয়ামীলীগ নেতা। যে গত ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ২হাজার ৯১ ভোটের বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। এমনকি অধিকাংশ কেন্দ্রেই বিপুল ভোটে হেরেছিলেন যার কারণে এই বালু স্বপনের কারণে লজ্জা পেতে হয়েছিল আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের।

 

এর আগেও সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবুর আর্শীবাদে দুবার ইউপি চেয়ারম্যান হয়েছেন। সেখানেও তিনি সিলেকশনে চেয়ারম্যান হয়েছেন। তবে একবার পুরোদমে ভোটের সম্মুখীন হয়েই বিপুল ভোটে ধরাশয়ী হয়ে যান। নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে, তার মত একজন অকার্যকর  নেতা কিভাবে আমাদের সাংসদ সমর্থন করেন।

 

তার চেয়ে অধিক জনপ্রিয় নেতা আমাদের সাংসদের অনুগতই ছিল বা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও অনেক যোগ্য প্রার্থীরা রয়েছেন তাদের বাধ দিয়ে সাংসদ কেন এই বালু সম্রাটকে সমর্থন করেন। তাহলে কি আড়াইহাজারে আওয়ামীলীগ কী দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে? সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে, আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপনের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

 

কেননা তিনি আড়াইহাজারে আওয়ামীলীগের রাজনীতিকে আলাদীনের চেরাগ হিসেবে বিবেচনা করে রাজনীতি করেছেন। যার কারণে প্রথমেই কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি পদকে পুঁজি করে বালু মহলকে টার্গেট করেন। পরবর্তীতে আর পিছনে ফিরে তাকেতে হয়নি তাকে হয়ে যান ইউপি চেয়ারম্যানও বালু মহলের টাকায়। একটা সময় বালু উত্তোলনকে অর্থের খনি হিসেবে বিভেচনা করে প্রায় ১২ থেকে ১৪টি ড্রেজারের মাধ্যমে মেঘনা নদী থেকে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন করে অর্থের পাহাড় গড়েছেন যেখানেও বর্তমান সাংসদের সহযোগীতা ছিল।

 

কারণ বেশীরভাগ সময়ই অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করেছেন। আর এই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে তার ছিল বিশাল এক সন্ত্রাসী বাহিনী সর্বদাই অস্ত্রের মহড়া অস্ত্রের জনজনানীতে সাধারণ মানুষের ভয়ে বুক কাপলেও মুখ খুলতে পারত না। যার কারণে একপর্যায়ে বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেত। তবে এমতাবস্থায় এক সময়ে প্রতিবাদস্বরূপ এই বালু স্বপনের সাম্রাজ্যকে গুড়িয়ে দিতে এলাকাবাসী ক্ষিপÍ হয়ে বালু উত্তোলিত ড্রেজারকে পুড়িয়ে ডুবিয়ে দেয়।

 

বালু মহলে একের পর এক অপরাধমূলক কান্ড ঘটাতে ঘটাতে ২০১৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪ টায় বালু স্বপনের এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রুবেল নামে পুলিশের এক কনস্টেবল খুন হয়। রুবেল হত্যার পর তৎকালীন চেয়ারম্যান স্বপনকে প্রধান আসামী করে প্রায় অর্ধশত লোকের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে এই মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেও নিহতের পরিবারের অভিযোগ ছিল ক্ষমতার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে এই মামলা থেকে তাকে নিস্তার দেয় প্রশাসন।

 

কিন্তু আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এই ধরণের হিংস্র প্রকৃতির চেয়ারম্যান প্রার্থীকে কোন ভাবেই সাধারণ মানুষ ভোট দিতে মনোনিবেশ করতে পারছে না। এছাড়া সুষ্ঠ ভোটের পরিবেশ নিয়েও সংশয় রয়েছে আড়াইহাজারবাসীর। কারণ এই ধরণের হিংস প্রকৃতির লোক যে কিনা এলাকাবিত্তিক ঘটনায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারে।

 

আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে স্থানীয় সাংসদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে উপজেলা বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা করবে না এর নিশ্চয়তা কী। এমনকি ইতিমধ্যেই সে হুমকিস্বরূপ আচরণ করছেন। যার কারণে আড়াইহাজারের সাধারণ ভোটার আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের পরিবেশের কথা ভেবে আতঙ্কিত।

এই বিভাগের আরো খবর