শুক্রবার   ২১ জানুয়ারি ২০২২   মাঘ ৮ ১৪২৮

রিয়াদের বাড়িতে র‌্যাব-পুলিশের অভিযান

অরণ্য মানিক

প্রকাশিত: ৯ জানুয়ারি ২০২২  

# ঘন্টাখানেক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে

# সিটি নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা রুখতে অভিযান অব্যাহত থাকবে : এসপি

 

অরণ্য মানিক : হাবিবুর রহমান রিয়াদ। মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি পদে ছিলেন তিনি। এছাড়াও সাংসদ শামীম ওসমান পুত্র অয়ন ওসমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতও এই গুনধর ব্যাক্তিটি। ইউপি নির্বাচনে এনায়েতনগরের মাসদাইরে কেন্দ্র দখল করতে গিয়ে র‌্যাবের হাতে পিটুনী খেয়েছিলেন রিয়াদ ও তার লোকজন। গতকাল মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি কেন্দ্র কর্তৃক বিলুপ্তির ৯ ঘন্টার মধ্যে রিয়াদের বাড়িতে রাত পৌনে ১০ টার দিকে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব,ডিবি ও থানা পুলিশ। খবরটি নিশ্চিত করেছেন একাধিক সূত্র। রিয়াদের বাড়িতে অভিযান পরিচালনার খবরে অয়ন ওসমান পন্থী ছাত্রলীগ নেতারা রাতে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গা ঢাকা দিয়েছেন বলেও সূত্রের দাবী। তবে জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম নিশ্চিত করেছেন আগামী ১৬ জানুয়ারী নির্বাচনকে সামনে রেখে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে এমন সম্ভাব্য ব্যাক্তিদের বাড়িতে তল্লাসী চালানো হচ্ছে। কে কোন দলে তা মূখ্য নয়। তথ্যের উপর ভিত্তি করেই অভিযান চালানো হচ্ছে যা নির্বাচন পর্যন্ত চলবে।

হাবিবুর রহমান রিয়াদ মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। ব্যানারে ছাত্রলীগ নেতা হলেও তিনি মূলত ওসমান পরিবারের রাজনীতি করেন। সাংসদ পুত্র অয়ন ওসমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও রিয়াদের পরিচিতি রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ছাত্র রাজনীতিতে তেমন ভুমিকা না রাখতে পারলেও এবারের অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে এনায়েতনগরের ৭ নং ওয়ার্ডের কেন্দ্র দখল করে আলোচনায় আসেন রিয়াদ ও তার বাহিনী। অপরদিকে ৮ নং ওয়ার্ডে কেন্দ্র দখল করতে গিয়ে র‌্যাবের হাতে বেদড়ক পিটুনির শিকারও হয়েছেন তিনি। আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেন্দ্র থেকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেয়ার পর,শামীম ওসমান বলয়ের অন্য বেশ কিছু নেতাদের সাথে সাথে মহানগর ছাত্রলীগের নেতা ও তারন সহচররা নিরব ভুমিকা পালন করে আসছেন। গত ২৪ ডিসেম্বর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নারায়ণগঞ্জে শেখ রাসেল পার্কে সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সমাবেশেও রিয়াদসহ অয়ন ওসমানপন্থী ছাত্রলীগ নেতাদের কাউকে উপস্থিত দেখতে পাননি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের প্রশ্নের সম্মুখিনও হয়েছিলেন জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ।

জেলা আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগে ওসমান পরিবারের একটা প্রভাব রয়েছে এটা অনস্বীকার্য। শামীম ওসমান বলয়ে থেকে অনেকে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগ মানে ওসমান পরিবার মনে করেন। আর এই কারনে আইভীকে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নৌকা প্রতীক দেয়ার পরেও অনেকে ওসমানীয় মতাদর্শ থেকে বের হতে পারেননি। শামীম ওসমানের মতো অনেক নেতা নিজেদের নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন হতে পারে এই ভয়ে তারাও ঘরে বসে আছেন। অথচ তারা ইচ্ছে করলে নৌকার মনোনীত প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারতেন। জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগেরও একটি অংশ সাংসদ পুত্র অয়ন ওসমানের নির্দেশে ওঠাবসা করে। তাঁর নির্দেশেই হয়তো দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশের পরেও নৌকার পক্ষের প্রার্থীর ব্যাপারে তারা সেভাবে মাঠে নামেনি।

জেলা নেতৃবৃন্দ আরো জানান,গত ২৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের শেখ রাসেল পার্কে বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেই সমাবেশে সিটি নির্বাচনের ব্যাপারে সমাবেশে যোগদান করেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম,সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি,বি এম মোজাম্মেল হক, আহমদ হোসেন,মৃণাল কান্তি দাস এমপি,আবদুর রহমান। এরআগে গত ২২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রস্ততি সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে যুবলীগ,স্বেচ্ছাসেবক লীগ,শ্রমিক লীগ সহ বিভিন্ন অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ওই সভায় অনুপস্থিত ছিলেন,নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। আওয়ামীলীগের হেভিওয়েট নেতারা নারায়ণগঞ্জে আসার পরেও জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের অনুপস্থিত কেউ ভালো চোখে দেখেনি। বিষয়টি জেলা নেতৃবৃন্দের কেউ কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে আনেনি। তবে তারা ছাত্রলীগের অনুপস্থিতি ঠিকই টের পেয়েছিলেন। পার্টি অফিসে ছাত্রলীগের কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখিন হয়েছিলেন জেলা নেতৃবৃন্দ। এটা ছিলো লজ্জাস্কর ঘটনা। যেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জেলায় উপস্থিত সেখানে মহানগর ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে ওসমান পরিবারের আজ্ঞাবহ অনেক নেতাই উপস্থিত হননি।    

সূত্রের দাবী, সেদিন পার্টি অফিসে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহার কাছ থেকে ছাত্রলীগ নেতা রিয়াদের নাম্বার নিয়ে, মোবাইলে ফোন দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। সেদিন নাসিম তার নিজের মোবাইল থেকে রিয়াদের ফোনে ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন,সমাবেশে রিয়াদ আসেনি কেনো। রিয়াদ প্রতিউত্তরে বলেছিলেন ‘আমি অসুস্থ’। বাহাউদ্দিন নাসিম তাকে বলেছিলেন ‘ঠিক আছে তুমি রেস্ট নাও’। এরপর নাসিম মহানগর আওয়ামীলীগের নেতাদের কাছে অন্য ছাত্রলীগ নেতাদের মোবাইল নাম্বার চাইলে নেতারা অন্য ছাত্রলীগ নেতাদের মোবাইল নাম্বার তাদেরকে দিতে পারেনি। জেলা ও মহানগরের ছাত্রলীগের কোনো নেতাই সেদিন উপস্থিত ছিলেন না।

অপরদিকে, গত দুদিন যাবৎ রিয়াদ লোক দেখানোভাবে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আইভীর পক্ষে একটি উঠান বৈঠক করেছেন। শুধুমাত্র প্রশ্ন থেকে বাঁচতেই এ কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন রিয়াদসহ অয়ন ওসমান পন্থী ছাত্রলীগ নেতারা। সর্বশেষ গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার করা হয়। এ ঘোষণার ৯ ঘন্টার মাথায় রিয়াদের বাড়িতে পুলিশ, র‌্যাব ও ডিবি পুলিশের অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় রিয়াদের উপস্থিতিতে মাসদাইরের বাড়িতে প্রায় আধাঘন্টা তল্লাসী চালানো হয় বলে জানিয়েছেন একাধিক সূত্র। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রিয়াদের ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি জব্দ করেছেন বলেও সূত্রের দাবী। রিয়াদের বাড়িতে তল্লাসীর পরে ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে অনেকেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গা ঢাকা দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।

এব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো.জায়েদুল আলম দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, গত কয়েকদিন যাবৎই জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিটি নির্বাচনে কোনো নাশকতা যাতে না হয় সে জন্যই অভিযান চলছে। তবে কার কার বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে তা নির্দিষ্ট নেই। যেখানেই সন্দেহ সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হবে, তা চলবে নির্বাচনের আগ মুহুর্ত্ব পর্যন্ত।

এই বিভাগের আরো খবর