বৃহস্পতিবার   ১৩ মে ২০২১   বৈশাখ ২৯ ১৪২৮

রয়েল রিসোর্ট কেন বেঁছে নিলেন মামুনুল?

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০২১  

 নারায়ণগঞ্জে তা-ব চালিয়েছিলো হেফাজত। হেফাজতের হরতালে সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৮টি গাড়ি পোড়ানো হয়েছিলো, আহত হন অর্ধশত। এরআগে ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত টানা দুইদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তা-ব চালিয়েছে হেফাজত যেখানে এখন পর্যন্ত ৪৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতোকিছুর পরেও মাত্র তিন-চারদিনের মাথায় ৩ এপ্রিল নারায়গঞ্জের সোনারগাঁয়ে রয়েল রিসোর্টে অবকাশ যাপনের জন্য এসেছিলেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। সেখানে অবরুদ্ধ হওয়ার সময় সাথে থাকা নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করলেও এর কোন প্রমাণপত্র তিনি আগে ও পরে উপস্থাপন করতে পারেননি। দালিলিক প্রমাণ দেখাতেও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হয়েই প্রথম স্ত্রীকে  ফোনে বলেন, সাথে থাকা নারী তার সহকর্মী হাফেজ শহীদুল ভাইয়ের স্ত্রী। রিসোর্টে দ্বিতীয় স্ত্রী পরিচয় দেয়ার সেই নারীর নাম-পরিচয় ও সম্পর্ক নিয়ে ক্রমশই ধোঁয়াশার ডালপালা বেড়েছে। সেই নারীর পরিবার, মামুনুল হকের পরিবার ও স্ত্রীও নানামুখী দাবি করছেন। মামুনুল হকের এই নারীর সাথের সম্পর্কটিই পুরোটাই রহস্যের ঘোরটোপে ঘেরা। মাত্র কয়েকদিন আগেও ইসলামী নেতা হিসেবে আল্লামা মামুনুল হক যতখানি পরিচিতি পেয়েছিলেন, সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্ট কা-ের পর গত কয়েকদিনের ঘটনায় সেই ব্যক্তিই এখন ভাইরাল মামুনুল হকে পরিণত হয়েছেন। এদিকে এখন প্রশ্ন উঠেছে মামুনুল হক অবকাশযাপনের জন্য সোনরগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টকে কেন বেঁছে নিলেন? কেন এটিকে নিরাপদ ভাবলেন? এরআগেও কি তিনি রয়েল রিসোর্টে এসেছিলেন? যদি সোনারগাঁয়ে এসেই থাকেন তবে কারা তাকে আপ্যায়ন করেছেন নিয়মিত ? তদারকি করেছেন কি কেউ? এখন পর্যন্ত সোনারগাঁয়ে মামুনুল হক কা-ে  হেফাজতের তা-বের মামলায় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা আসামী হচ্ছেন। কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছেন।  
সুত্র জানিয়েছে, মামনুল হকের সাথে সোনারগাঁয়ের হেফাজত কর্মীদের সাথে গভীর সখ্যতা। স্থানীয় এমপির সাথেও সখ্যতা ছিল হেফাজত নেতা মামুনুল হকের। সবাই বলছেন, রয়েল রিসোর্টে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকার কথা ভেবেই তিনি এখানে এসেছিলেন। তিনি ভাবতেন, এখানে কোন ধরণের বিপদ হবেনা। যখন আওয়ামী লীগের লোকজন ও স্থানীয়রা মামুনুল হককে অবরুদ্ধ করেছিলো, তখন তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেসব হেফাজত কর্মীরা এসেছিলেন তাদের মধ্যে জাতীয় পার্টির লোকজনও ছিলো। স্থানীয়রা দাবি করেন, হেফাজত জাতীয় পার্টির লোকজন যৌথভাবে মামুনুল হককে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে।    
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় এক সাংসদের সাথে সখ্যতার বদৌলতে সোনারগাঁয়ে বেশ কয়েকবারই এসেছিলেন মামুনুল হক। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও দুষছেন জাতীয়পার্টির টিকেটে সাংসদ এমপি লিয়াকত হোসেন খোকাকে।  গতবছরের ২ নভেম্বর হেফাজতের  এক সভায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে হত্যা করে ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা। এরপরেই বেপরোয়া হয়ে উঠেন এখানে হেফাজতকর্মীরা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় হেফাজত ও জাতীয় পার্টির নেতারা যৌথভাবে আক্রমন করেছে বলে মনে করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।
সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালাম হেফাজতের সাথে এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার সখ্যতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টটিকে নিরাপদ ভাবার অন্যতম কারণ হলো এখানে মামুনুল হক বেশ কয়েকবার সোনারগাঁয়ের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। স্থানীয় সাংসদ লিয়াকত হোসেন খোকার আথিথেয়তায় এখানে হেফাজত নেতারা খুব হেফাজতে ছিল এতোদিন। হেফাজতের উদ্বুদ্ধপূর্ণ আচণের পেছনে মূলকারণ স্থানীয় সাংসদ হেফাজতের এক জনসভায় বলেছিলেন, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতিকে হাতের কাছে পেলে তাহলে তাকে হত্যা করে আমি হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে যেতাম। পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, তিনি তাঁর বক্তব্যে অনড় আছেন। এরপরেও স্থানীয় সাংসদের নেতৃত্বে বিভিন্ন জায়গায় নানাসময় ভুরিভোঁজও হয়েছে। সেকারণে মামুনুল হক তাঁর রঙ্গলীলার জন্য নিরাপদ মনে করেছেন। এমপির উপস্থিতির কারণে প্রশাসন সবসময় তাঁর সাথে থাকতো, যে কারণে মামুনুল হক মনে করেছে সোনারগাঁয়ে তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন।  
মাহফুজুর রহমান কালাম বলেন, ‘মামুনুল হক রয়েল রিসোর্ট সম্পর্কে অবগত ছিলেন। স্থানীয় সাংসদের আথিতেয়তার কারণে তিনি বিভিন্ন সময় আসতেন। হেফাজতের তা-বের পরপরই জাতীয় পার্টির সোনারগাঁয়ের সেক্রেটারি মাওলানা ইকবালকে নিয়ে যিনি  হেফাজতের ধ্বংযজ্ঞ মামলার ১নং আসামী তাদের নিয়ে উদ্দমগঞ্জ বৈঠক করেছে। ভাঙচুরের পর ৪  ও ৫ এপ্রিল উদ্দমগঞ্জ বাজারে ইকবালের বাড়ির সামনের কার্যালয়ে এমপি  খোকা, ইকবাল মাওলানাদের নিয়ে মিটিং করে।’
কালাম অভিযোগ করেন, ‘রয়েল রিসোর্টটিকে স্থানীয় এমপি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নিজের এমপি খোকা নিজের বাড়িঘর বানিয়ে ফেলেছে। রিসোর্টের মালিক নিরুপায় হয়ে এমপিকে ব্যবহার করতে দিতে বাধ্য হয়েছে। আমার জানা মতে, রিসোর্টের মালিক ভদ্রলোক  নানা সময় অনেক নির্যাতিত হয়েছেন। রিসোর্টটির নিচে কোমল পানীয়ের ডেস্ক ছিল, সেটি বন্ধ করতে বন্ধ হয়েছিল এমপি লোকজনের কারণে, তারা সেই ডেস্কে গিয়ে ক্ষমতা দেখিয়ে ফ্রি খেয়ে আসতো।’
সাবেক সাংসদ আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত বলেন, ‘মামুনুল হক ও হেফাজতের সাথে স্থানীয় এমপির সখ্যতা বেশ পুরোনো। বিশেষ করে নভেম্বরে হেফাজতের এক সভায় তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে হত্যা করে ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর থেকে সোনারগাঁয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠে হেফাজত। এরপর থেকে হেফাজত এখানে মানসিকভাবে শক্তিশালী এবং সাংগঠনিকভাবে শক্তি সঞ্চয় করে। এরপরেও নানা সময় বর্তমান এমপি হেফাজত নেতাকর্মীদের নিয়ে ঘরোয়া মিটিং করেছেন।’
রয়েল রিসোর্ট এমপি খোকার আস্তানা উল্লেখ করে সাবেক এমপি কায়সার হাসনাত বলেন, ‘এটা শতভাগ সত্য যে, রয়েল রিসোর্টকে এমপি খোকা নিজের আস্তানা হিসেবে গড়ে তুলেছে। তিনি প্রতিদিন সেখানে বসেন, যাবেনই। এটা তাঁর জন্য একটা নৈমত্রিক বিষয়। তবে আশ্চর্যের বিষয়, যেদিন মামুনুল হকের ঘটনা সেদিন এমপি রয়েল রিসোর্টে যাননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।’    
মামুনুল হককে আতিথেয়তা করা প্রসঙ্গে এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন,  ‘মামুনুল হক একবারই সোনারগাঁয়ে এসেছিলো নভেম্বরে। তখন রয়েল রিসোর্টে আলেম ওলামারা সকলে মিলে খাওয়া-দাওয়া করেছিলো। সেদিনই তাকে প্রথম দেখি। এরবাইরে মামুনুল হকের সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নাই, তাকে আমি সেভাবে চিনিও না। যারা এসব অভিযোগ করছেন তারা মিথ্যা বলছেন।’  
হেফাজতের মামুনুল কান্ডের পুরো বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের অন্যতম সদস্য এড.আনিসুর রহমান দিপু বলেন, ‘মমিনুল হক সোনারগাঁ এলাকাটাকে নিজের এলাকা মনে করতো। যে কারণেই তিনি সোনারগাঁয়ে বারবার আসতো। রিসোর্টটিকে সে অনেক নিজেরই মনে করতো। সেখানে বিভিন্ন সময় গিয়ে অনেক আদর আপ্যায়ন পাওয়ার কারণে এই রিসোর্টটিকেই সে বেঁছে নিয়েছে। এরআগে স্থানীয় এমপির আমন্ত্রণে রিসোর্টটিতে মামুনুল হক বেশ কয়েকবার রিসোর্টটিতে গিয়েছে। একারণেই রিসোর্টটিকে মামুনুল জায়গা হিসেবে মনে করেছে।’  
এদিকে মামুনুল হককে আসামি করে হেফাজতের তা-বের ঘটনায় সোনারগাঁ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামুনুল হক ৩ এপ্রিলের আগে বেশ কয়েকবার সোনারগাঁয়ে এসেছেন এবং রয়েল রিসোর্টে গিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নে জেলা পুলিশের ‘খ’সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন, এবিষয়ে কিছু বলা যাবেনা।’ তদন্তকাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই উত্তর দিয়েছেন সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান।
তবে রয়েল রিসোর্টের সত্ত্বাধিকারী আবু সাঈদ বলেন, ‘এখানে প্রশাসনের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে তথ্যাদি সংগহ করছে। আমার রিসোর্টের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আমি কোন মামলা করিনি, আর করবোনা। রিসোর্টটি একদিনের জন্য নয়, আজীবনের জন্য। তাছাড়া মামলায় আমি কাকে আসামী করবো। আমাকে বারবার বলা হয়েছে মামলা করতে, কিন্তু যেহুতু পুলিশ মামলা করেছে, তারা জানতেছে আমার ক্ষতি হয়েছে।’ রিসোর্টের ক্ষতির ব্যাপারটি ইনস্যুরেন্স করা আছে তারা দেখবে, ব্যাংক দেখবে। মামুনুল হকের ব্যাপারে আমি এরচেয়ে বেশি কিছু বলতে পারবোনা। স্থানীয় সাংসদ রয়েল রিসোর্টটিকে রাজনৈতিক কার্যালয়ের মতো ব্যবহার করে এমন জনশ্রুতি আছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার রিসোর্টটিতে সবাই আসে। ফরেইনাররা সবসময় আমার রিসোর্টে থাকে। সবার জন্য উন্মুক্ত। এবিষয়ে আর কোন কথা নয়।’

এই বিভাগের আরো খবর