বুধবার   ১২ মে ২০২১   বৈশাখ ২৯ ১৪২৮

শীতলক্ষ্যার ৩য় সেতুর নকশায় ক্ষুব্দ নদী রক্ষা কমিশন

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল ২০২১  

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গোর ধাক্কায় লঞ্চডুবির ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নদীর প্রশস্থতা কমে আসার কথা। দীর্ঘদিন ধরে নির্মানাধীন এই ব্রীজের কারনে বহুদিন ধরেই নৌযান সমূহ গতি কমিয়ে চলাফেরা করতো। বিষয়টি এতদিন পর দুর্ঘটনার মধ্যদিয়ে সামনে নিয়ে আসার পর ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশন। নদীর তীর দখল থেকে শুরু করে ব্রীজের নকশায় নদীকে হত্যা করা হচ্ছে উল্ল্যেখ করে নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের শাস্তিও দাবী করেন কমিশনের কর্মকর্তা।


সোমবার (১৯ এপ্রিল) দৈনিক যুগের চিন্তাকে দেয়া এক মতামতে বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের অনারেবল মেম্বার শারমিন সোনিয়া মুরশিদ এ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।


তিনি বলেন, বাংলাদেশে লঞ্চডুবির মত ঘটনা এবারই প্রথম হয়নি। ১৯৮৮ সালে শীতলক্ষ্যার ঠিক এই স্থানেই বড় একটি লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছিলো। তখন কিন্তু অনেক মানুষ মারা গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেটি ছিল ১৯৮৮ আর নতুন দুর্ঘটনা হলো ২০২১। এখনও কিভাবে কার্গোগুলো হাইস্পিডে চলে? এখনও কেন লঞ্চগুলো একটি আরেকটির সাথে প্রতিযোগিতা করে? কেমন করে একটা ব্রীজ তৈরী হয় যেই ব্রীজ একটি নদীকে সংকীর্ন করে তোলে? এর মানে হচ্ছে নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয় সবকিছুই অবগত। নৌ অধিদফতরে এসব বিষয়ে সব ধরনের নিয়ম কানুন রয়েছে। একটি লঞ্চ এই নদীতে চলতে হলে তার কেমন ফিটনেস থাকা প্রয়োজন? একটি নৌযান কতটুকু গতিতে চলতে পারবে। এসব নৌযানের চালকদের কেমন দক্ষতা থাকতে হবে। এর সবকিছুই অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন কতৃপক্ষ, ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং এর কাছে উল্ল্যেখ করা আছে।


তারা ইনভেস্টিগেশন করে পেলেন নদীর ব্রীজের কারনে নদী সংকীর্ন হয়েছে। অর্থাৎ পিলারটা ঠিক জায়গায় বসানো হয়নি। নদীর পিলার তাহলে কে বসিয়েছে? এসব দপ্তরকে অবগত করিয়েই তো বসানো হয়েছে পিলার। তাহলে এই দায় তারা কিভাবে এড়াবে? তারা নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন প্রকার স্টাডি না করেই ব্রীজ নির্মানের অনুমতি দিয়ে দিলেন। যেন কিছু টাকা আর প্রজেক্ট দেখেই তারা ব্রীজ তৈরী করে ফেললেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি নদীর উপর শত শত ব্রীজ। বিভিন্ন নদীর উপরে এই একই অন্যায় প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে তারা।


তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে ‘ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে সেতুর পিলার সরিয়ে নদীর প্রশস্ততা বাড়ানো’। এখন প্রশ্ন উঠে নতুন ব্রীজ যেটি এখনও পুরোপুরি নির্মান হয়নি। আমরা নৌ অধিদফতরের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই এই হিসেবটা আজ কেন করা হচ্ছে? এই ব্রীজ নির্মানের পূর্বে কেন তারা করেননি?


তিনি কার্গো জাহাজের দ্রুতগতির জন্য উদাসীনতাকে দায়ী করে বলেন, যেসব জাহাজ চলছে তাদের আকার আকৃতি অনুযায়ী গতি কেমন হবে তা স্পেসিফিক থাকা দরকার। শুধু লিপিবদ্ধ থাকলে চলবে না এই আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে প্রতিনিয়ত। আমি মনে করি যেই চালক কার্গোটি চালিয়েছিলো তার যথেষ্ট এক্সপেরিয়েন্স নেই এবং তার বৈধ কাগজপত্র নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ করার অবকাশ রয়েছে। আমরা কমিশনে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় দেখেছি চালকদের সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার সেই যোগ্যতা নেই। জাহাজ ও লঞ্চকে এপ্রুভ করে দেয়া হচ্ছে যার নদীতে চলা উচিৎ না। এটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদাসীনতা যা তারা এড়াতে পারে না। এসকল কাজের একটিও যদি ঠিকমতো পালন করতো তাহলে এই দুর্ঘটনা আমাদের দেখতে হতো না।


এখন যদি তারা ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা রোধ করতে চায় তাহলে এই শীতলক্ষ্যার প্রশস্থতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী পিলার ভাঙ্গবে। টাকার তো অভাব নেই। মাঝে থেকে কিছু টাকা অপচয় হলে তাদের কারও কিছু আসে যায় না। প্রজেক্ট মানেই টাকা আসবে। ভুল হলেও তাদের কোন গায়ে লাগে না। আবারও দেখা যাবে অনেকগুলো টাকা বরাদ্ধ পেয়ে নতুন করে প্রজেক্ট নিয়ে নেমেছেন নৌ অধিদফতর। 


উল্লেখ্য, শীতলক্ষ্যায় লঞ্চ দুর্ঘটনা ৩৪ জনের মৃত্যুর পর নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন মন্ত্রনালয়ে জমা দিয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন এখনও গণমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এই তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে জানান, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এসকেএল– ৩ কার্গো জাহাজটির বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। চালকের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।


সুপারিশ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে সেতুর পিলার সরিয়ে নদীর প্রশস্ততা বাড়ানো। ছোট আকারের সাংকেন ডেকবিশিষ্ট লঞ্চ ক্রমান্বয়ে সরিয়ে নেওয়া। যেখানে সেখানে অলস জাহাজ নোঙর ও লোড আনলোড বন্ধ করা। চালকদের দক্ষ ও সচেতন করতে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা। সার্ভেয়ারের সংখ্যা বাড়ানো সহ ২২ থেকে ২৩টি সুপারিশ করা হয়েছে।
 

এই বিভাগের আরো খবর