মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২   আষাঢ় ২১ ১৪২৯

সিভিল সার্জনের খামখেয়ালীপনায় অবৈধ মেডিস্টার হসপিটালে ঝরল প্রাণ

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২২  

 

 

# চার লাখ টাকায় রফাদফা
# ডা. সবুর অপারেশন করার পরপরই অবস্থার অবনতি
# বিষয়টি আমি জেনেছি, ব্যবস্থা নিচ্ছি : সিভিল সার্জন

 

 

মাত্র ৭২ ঘন্টার মধ্যে অবৈধ ক্লিনিক-হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিলেও শুধুমাত্র অবৈধ তালিকা করেই দায় সেরেছে নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়। অবৈধ তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ শহরে অবৈধ হাসপাতালগুলোতে অভিযান না চালানোয় প্রাণ গেল এক নারীর। নগরীর সলিমুল্লাহ রোড মেডিস্টার হসপিটাল এন্ড রেনেসা ল্যাব অবৈধ তালিকা থাকলেও খোলা রেখে মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে এমন খবর সিভিল সার্জনের বক্তব্য নিয়েই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে আসছিল দৈনিক যুগের চিন্তা।

 

কিন্তু শহরে অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অদৃশ্য কারণে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে অভিযানে অনীহার কারণেই মঙ্গলবার রাতে মেডিস্টার হসপিটালে প্রাণ যায় ওই নারীর। ঘটনা ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৪/৫ লাখ টাকায় রফাদফা করেছে বলে জানিয়েছে সূত্র। ভুল চিকিৎসা ও আনকোরো অপারেশনে রোজিনা আক্তার (৩০) নামে ওই নারীর প্রাণ যায় বলে অভিযোগ তার স্বজনদের। ওই নারীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে মেডিস্টারের কোন স্টাফ হাসপাতালে না থেকে গা ঢাকা দেয়। এমনকি ওই নারীর স্বজনদের লাশ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি তারা। রোজিনা আক্তার শিবু মার্কেট এলাকার হাজী তাজুউদ্দিন মার্কেট সংলগ্ন মিঠুন মিয়া বাড়িতে ভাড়া থাকেন। রোজিনার গ্রামের বাড়ি নীলফামারি জেলার শহীদপুর থানা এলকায়।

 

ভুল চিকিৎসায় নিহত রোজিনা আক্তারের স্বামী শ্রমিক মো. মঞ্জুর হেলাল জানান, মঙ্গলবার সকালে গলায় টনসিলের অপারেশনের জন্য রোজিনাকে সলিমুল্লাহ রোডের মেডিস্টার হাসপাতালে ভর্তি করেন। নাক-কান-গলা বিশেষঞ্জ ডা. সবুরের তত্বাবধানে বিকেলে অপারেশন হয় রোজিনার। রাত ৮টার পর থেকে রোজিনার অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ডিউটি ডাক্তারসহ নার্সরা এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। তবে আত্মীয়-স্বজনরা কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করলেও তারা কিছুই বলেনি।

 

মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তারাহুড়ো করে রোজিনার লাশ ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে তারা। কিছু বুঝে উঠার আগেই রাত সাড়ে ১০টার দিকে এম্ব্যুলেন্স ডাকে মেডিস্টারের স্টাফ রাশেদ। পরে অ্যাম্বুল্যান্সে রোজিনার বডি উঠিয়ে দিয়ে পুরো মেডিষ্টারের স্টাফ-নার্স-ডাক্তাররা সটকে পড়ে। এমনকি অবৈধ হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের আটকে রেখে যায় তারা।

 

মেডিস্টারের ৬ তলায় ভর্তি রোগীকে তালা মেরে গেছে হাসপাতালের লোকজন এমন অভিযোগ ইকবাল হোসেনের। তিনি বলেন, এক রোগী মারা যাওয়ার খবর জেনেই তাড়াহুড়ো করে সব রোগীর রুম তালা মেরে মুহুর্ত্বেই হাসপাতাল খালি হয়ে যায়। 


এদিকে মেয়ে রোজিনাকে হারিয়ে হাসপাতালের বাইরে বিলাপ করছেন মা ফাতেমা বেগম। তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, মেয়েটারে মারতেই যে এই হাসপাতালে ভর্তি করছিলাম, সকালেও টের পাইনাই। মাইয়াডা মইরা গেছে হেরা আমগোরে কিছুই কয়না। লাশ থুইয়াই হাসপাতালের সব লোক পলাইয়া গেছে গা। আমরা মাইডারে কোন রকমে খানপুর হাসপাতালে নিলে ডাক্তার কয়, আমার মাইয়া আর নাই। আমরা না জাইন্যাই এই হাসপাতালে মাইয়াডারের ভর্তি করছিলাম। আমগো মতো গরীব মানুষের ভাগ্য এতো খারাপ ক্যান। মাইয়াডারে এইহানে মরনের লাইগাই বুঝি ভর্তি করছিলাম।

 

এদিকে খানপুর হাসপাতাল থেকে রোজিনার মরদেহ নিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স থামে মেডিস্টারের সামনে। মায়ের মরদেহ জড়িয়ে ধরে বসে আছে রোজিনার মেয়ে । চঞ্চলা মায়ের নিথর দেহ ধরে কান্নাও যেন করতে পারছেনা রোজিনার মেয়ে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার অর্থ যেন একি শুধুই মৃত্যু নাকি হত্যা।

 

এদিকে সবকিছু ম্যানেজ করে ধীরে ধীরে ফজরের আগে ফিরতে শুরু করে মেডিস্টারের স্টাফরা। তোরজোর করে সাংবাদিক-প্রশাসন ম্যানেজের চেষ্টা। দায়সারাভাবে রোজিনার মরদেহটি মেডিস্টারের সামনে থেকেই যেন সরাতে পারলে বাচে মেডিস্টারের হর্তাকর্তারা। সূত্র জানিয়েছে, খামের পর খাম সাজিয়ে কিছু সাংবাদিক, কিছু প্রশাসন আর কিছু দুস্থ অসহায় গরীব রোজিনার স্বজনদের পকেটে তোড়া পুরে দিয়ে যেন হাঁফ ছাড়লো মেডিস্টারের কর্তা ব্যাক্তিরা। ততক্ষণে ভোর সকাল। এবার অবৈধ মেডিস্টার হসপিটাল কর্তৃপক্ষ যেন আরেক রোজিনার অপেক্ষায়।

 

 অবৈধ মেডিস্টার হসপিটালে ম্যানেজার রাশেদুল হক যুগের চিন্তাকে বলেন, বিকেল সাড়ে ৪টায় ওই রোগীর অপারেশন হয়েছে। রাতে অবস্থার অবনতি ঘটলে প্যাসেন্টের কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়েছে।এমনটা হলে রোগী কোন ধরণের সুযোগ দেয়না। ডাক্তাররা যারা উপস্থিত ছিল তারা চেষ্টা করছে। রোগীর আত্মীয়স্বজনদের বলা হলো রোগীকে আইসিইউতে নিতে হবে। কিন্তু তারা নড়ে না।

 

ডা. সবুরের তত্ত্বাবধানে ছিল ওই রোগী। আমরা হাসপাতাল ছেড়ে যাইনি। রোগীর পরিবারের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। সব ম্যানেজ হয়েছে। আমরা নতুন হাসপাতাল নই, আমাদের হাসপাতালটি ২০/২৫ বছরের। আমরা যদিও জেলা স্বাস্থ্যবিভাগের অবৈধ তালিকায় আছি, তবে কাগজপত্র ম্যানেজের চেষ্টা করছি আমরা। আমরা নাম চেঞ্জ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে গেছি। সরকারি সবখাতে আমাদের টাকা পয়সা দেয়া আছে।

 

জেলা সিভিল সার্জন এএফএম মশিউর রহমান যুগের চিন্তাকে জানান, মেডিস্টারের রোগী মারা যাওয়ার খবরটি আমরা পেয়েছি। তবে লিখিত অভিযোগ না দিলে আমাদের জন্য বিপদ হয়ে যায়। তারা অবৈধ তালিকায় আছে। আমি বিষয়টি দেখছি।

 

প্রসঙ্গত, জেলা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৯৯ টি ক্লিনিক বৈধ এবং ৫৫টি ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার বৈধ রয়েছে। আর বাকি সব গুলোই অবৈধ তালিকায় রয়েছে। তালিকার বাহিরেও অনেক ক্লিনিক, ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নগরীর সলিমুল্লাহ রোড মেডিস্টার হসপিটাল এন্ড রেনেসা ল্যাব অবৈধ তালিকা থাকলেও খোলা রেখে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন ১০ জন ডাক্তার উপস্থিত থেকে সেবা প্রদান করে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।

 

এখানে ২০ জন রোগী ভর্তি করার ব্যবস্থা আছে। তাদের ডিজি হেলথের ছাড়পত্রের কাগজ নেই। সেই সাথে ফায়ার সার্ভিস অনুমোদন কাগজ আবেদন করলেও এখনো তা পান নাই। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের কাগজও নেই। তার পরেও তারা কি করে দিব্যি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তার উত্তর জানা নেই তাদের। তবে প্রশাসনকে ম্যানেজের জন্য দুইজনকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে এই অবৈধ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।এমই/জেসি
 

এই বিভাগের আরো খবর