শনিবার   ২৮ মে ২০২২   জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪২৯

অসুরের বিরুদ্ধে জনতার জয়

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০২২  

# মেয়র পদে আইভীর হ্যাট্রিক বিজয়
# নৌকার ভোট ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৩ ভোট, হাতি পেয়েছে ৯২ হাজার ১৭১ ভোট



নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হ্যাট্রিক বিজয়ী হয়েছেন নৌকার প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার হাতি প্রতীকে পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৭১ ভোট। দুজনের ভোটের ব্যবধান ৬৯ হাজার ১০২ ভোট।

 

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠিত হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন আইভী। ওই নির্বাচনে প্রায় ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে নৌকা সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমানকে পরাজিত করেছিলেন তিনি।  উল্টো ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই শামীম ওসমান ও আইভী বলয় কঠিনভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আইভীকে নানাভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা চালান শামীম ওসমান। আইভীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তিনি ব্যাঘাত সৃষ্টি করেন।

 

ওই সময় শামীম ওসমান ঘোষণা দিয়েছিলেন আইভীকে আর নৌকা দেয়া হবেনা। কেন্দ্রে না পাঠালেও দ্বিতীয় সিটি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হন সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী এড. সাখাওয়াত হোসেন খান ধানের শীষ প্রতীকে লড়াই করে ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। আইভীকে নিয়ে খেলা থেকে আর নিজেকে গুটিয়ে নেননি শামীম ওসমান।

 

হকার ইস্যু, ধর্মীয় উস্কানী, দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগ, কবরস্থানে শশ্মানের মাটি ফেলার অভিযোগসহ নানা বিষয় নিয়ে আইভীকে একের পর এক ঘায়েলের চেষ্টা করেন শামীম ওসমান। এতেও যখন তিনি পেরে উঠছিলেন না তখন আইভীকে যাতে নৌকার মনোনয়ন না দেয়া হয়  তা নিয়ে কেন্দ্রে দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করেন তিনি। এবারও মেয়র প্রার্থী হিসেবে শামীম ওসমানের প্ররোচনায় কেন্দ্রে পাঠানো হয়নি আইভীর নাম। কিন্তু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নিজেই আইভীর হাতে তুলে দেন নৌকা।

 

এর বিপরীতে ওসমান বলয় এড. তৈমূর আলম খন্দকারকে মেয়র প্রার্থী বানিয়ে তার পিছনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট ও মাঠ পর্যায়ের রিপোর্টে যখন আইভীকে হারানোর  ছক বেরিয়ে আসে তখনই নড়েচড়ে বসে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। তারা আইভীকে নিয়ে মাঠে নামেন। অন্যদিকে খেলারাম তৈমূরকে সামনে রেখে নেপথ্যের খেলা চালিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে কেন্দ্রের চাপে শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে নৌকার পক্ষে নিজের সমর্থন ব্যক্ত করেন।

 

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, শামীম ওসমান তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের স্বরে নৌকাকে সমর্থন জানিয়েছেন, আইভীকে নয়। দাম্ভিকতার সাথে বলেছেন,  ১৬ তারিখে খেলা হবে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে শামীম ওসমান সমর্থিত নেতাকর্মীদের বেশিরভাগই মাঠে কাজ করতে নামতে দেখা যায়নি। বরং বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূরের পক্ষেই তারা কাজ করেছেন। শামীম ওসমানের অনুগত যে সকল নেতা প্রক্যেশ্যে ছিলেন তারারও লোক দেখানো নৌকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

 

একারণেই কেন্দ্র থেকে শামীম ওসমানপন্থী মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। তার অনুগত মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা রবিউল হোসেনকেও বহিঃষ্কার করা হয়। বাকি আরো কয়েকজনকেও আনা হয় শাস্তির আওতায়। কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, বাহাউদ্দিন নাছিম, আবদুর রহমানসহ অন্যান্য নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে দিয়ে বলেন, শামীম ওসমানসহ কোন নেতা নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করলে তাদেরকে ছাড় দেয়া হবেনা। এতো কিছুর পরও গোটা নির্বাচনকে ঘিরে ওসমান বলয়ের প্রকারন্তরে আইভীর বিরুদ্ধাচরণ করে বেড়িয়েছেন। সিদ্ধিরগঞ্জে শামীম ওসমান সমর্থিত এক আওয়ামী লীগ নেতা যুগের চিন্তাকে বলেছেন, ভোটের একদিন আগে শামীম ওসমান হোয়াটস এ্যাপে ফোন করে তাকে বলেছেন, তার আদেশ না শুনলে ১৬ তারিখের পর নারায়ণগঞ্জ থেকে বের করে দেয়া হবে। ওই নেতার বক্তব্য হচ্ছে, নৌকার পক্ষে কাজ করা যাবেনা।

 

এরকম একই ধরণের কথা আরো অনেককে শামীম ওসমান ফোন করে বলেছেন বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতারা। আইভীকে আগাগোড়াই লড়াই করতে হয়েছে এক অপশক্তির বিরুদ্ধে। যে অপশক্তি নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নকে বরাবরই বাধা সৃষ্টি করেছে। নৌকার প্রার্থী হয়ে যেখানে আইভীর ফুরফুরে থাকার কথা ছিল সেখানে অপশক্তির কূটকৌশল মোকাবেলায় নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। আর এই অপশক্তি কতটা আইভীর বিপক্ষে কাজ করেছছে তা ভোটের ফলাফলই বলে দেয়। তৃতীয়বারের মতো বিজয়ী হয়ে আইভী তার জয়কে ভোটার তথা জনগণকে উৎসর্গ করেছেন। এই অঞ্চলের মানুষ মনে করেন, আইভী একটি প্রতিক মাত্র। যাকে সামনে রেখে গডফাদার তথা অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে মানুষ। আর তাই বরাবরই গডফাদারের কূটকৌশল ভেঙে আইভীর গলায় বিজয়ের মালা তুলে দেন ভোটাররা।

এই বিভাগের আরো খবর