মঙ্গলবার   ০৪ অক্টোবর ২০২২   আশ্বিন ১৯ ১৪২৯

আমাদের সংগ্রাম আমাদের জীবন-১

জাফরিন বর্ণী

প্রকাশিত: ৭ আগস্ট ২০২২  

 

এসেছি রাষ্ট্র ভাষার লাল রাজপথ থেকে

এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।

আমি যে এসেছি জয়বাংলার বজ্রকন্ঠ থেকে

আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে ।

 

চরণগুলো পড়লেই যেন সে রাজপথের সংগ্রামী দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে উঠে ।

 

মাতৃভাষা রক্ষা আন্দোলনরত অবস্থায়ই ছাত্ররা হানাদারদের গুলিতে প্রাণ হারায়। আমাদের স্মৃতিসৌধ গড়ে উঠল ,আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল হল এবং বাংলা হল আমাদের রাষ্ট্রভাষা। শহীদদের স্মরণে নির্মিত হল শহীদ মিনার ।

তারপর পূর্ববাংলার ভুমিজ “আওয়ামী লীগ” জনগনের অধিকার আদায়ে ৬ দফা দিয়ে শোষকমুক্ত করে মানুষের, ভুমির রাজনৈতিক অধিকার  ফিরিয়ে আনে । এরও আগে যুক্তফ্রন্ট নামক এক চেতনা ছিল স্বাধীনতার উপ্ত বীজ। কিন্তু শোষক গোষ্ঠি ষড়যন্ত্রের এক মায়াজালে তা শুরুতেই থামিয়ে দিয়েছিল। তবে ৬ দফা ঘোষণার পরের সংগ্রাম ছিল স্বপ্ন,সাহস আর বীরত্বের আবহওয়ায় ঘেরা। শোষকের শত চেষ্টাও আমাদের ঐক্য ভাঙ্গতে অক্ষম ছিল। ৭০ এর সেই গণ অভ্যূত্থান ছিল সেই ঐক্যের বিশ্ব প্রদর্শনী ।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এ নামের সঙ্গে বর্তমানে আমরা সকলেই পরিচিত এবং গর্বিত । এক স্বাধীন ভূমির চিত্র। চিত্রের নাম ”বাংলাদেশ”। বঙ্গবন্ধুই তো এ পূর্ববাংলার ক্যানভাসে সে চিত্রটি আঁকা শুরু করেছিলেন। তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম , মাওলানা ভাসানী সহ আরো অনেকেই তার সাথে সাথে এ ক্যানভাসে তুলি ধরেন । শুরু হল স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত সংগ্রাম ।

বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের সে স্বাধীনতার গর্জন যেন আজও বাংলার পর্বতে শুনা যায় । শোষক গোষ্ঠি বঙ্গবন্ধুকে কারাবদ্ধ করে বাঙালিদের দূর্বল করতে চেয়েছিল। কিন্তু শোষকরা তার সংগ্রামী চেতনার মাঝে বাঁধা হতে পারেনি ।

 

বঙ্গবন্ধুর বলেছিলেন “আমাদের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম“। তা শুনে বাঙালিদের আর কোনো বাহ্যিক শক্তির প্রয়োজন অনুভব হল না। এ গর্জনই ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে নামার চূড়ান্ত প্রশিক্ষন ।

 

তবে স্বাধীনতা অর্জনের যাত্রাটা ছিল রক্তক্ষয়ী । এক কালরাতে শোষক বাহিনী ”অপারেশন সার্চলাইট” নামক পতাকা হাতে দস্যু রূপে এসে এ ভুমির গ্রাম-শহর পুড়িয়ে দেয় । আপনজন হারানো বাঙালি তখন হয়ে গেল দিশেহারা ।

 

কিন্তু তাতে কি, প্রশিক্ষন তো ছিল জোড়ালো। দিশেহারা, শোকাহত স্পন্দন নিয়েই মুক্তিবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ মাস এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাঙালিরা শক্ত খুঁটির মত দাঁড়িয়ে ছিল। এ খুঁটি ভাঙতে হানাদার বাহিনী বোমা, গুলিসহ রাজাকারদেরও ছুড়ে মেরেছিল। তবে খুঁটিটা ছিল অটল । 

 

একটা সময়ে এসে মুক্তিবাহিনীর সামনে হানাদার বাহিনী ভঙ্গুর হয়ে গেল।“জয়বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!” মুক্তিবাহিনীর এ গর্জন হানাদার বাহিনীকে ভীত হতে বাধ্য করেছিল ।

 

কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্রের জাল তখনও ধীর গতিতে ছড়াচ্ছিল। দেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবি ও জ্ঞানী সমাজ এ মায়াজাল হতে রেহাই পেল না।  

 

সে ৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত বোধহয় এমন কোনো মুহুর্ত ছিল না যেখানে বাঙালি যুদ্ধ করেনি বা কোনো প্রিয় মানুষকে হারায়নি । এক লম্বা দাসত্ব সময়ে অবস্থান করেই বাঙালি জাতি নিজের মুক্তির রচনা লিখেছে । বহু ত্যাগ, বহু স্বার্থপরতা, বহু ষড়যন্ত্র অতিক্রম করেই তবে স্বপ্ন ছোঁয়া।

 

কিন্তু শোষক গোষ্ঠির কোনও কার্যকলাপ মুক্তিবাহিনীকে দমানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না । সে শক্ত খুঁটি ধীরে ধীরে এক বিরাট স্তম্ভে পরিণত হচ্ছিল। ঘরে ঘরে ছিল যোদ্ধা-ঢালকুমারিদের অবস্থান।

 

হানাদার বাহিনীর অসহ্য যন্ত্রণা পাড়ি দিয়েই তো মুক্তির সৈনিকরা বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে আনে। ডিসেম্বর মাসের সেদিনটা শুরুই হয়েছিল বিজয়ের লাল অরুণ হাতে নিয়ে ।

 

আমার জন্ম সে সময়ে হয়নি, বরং তারও বহু বছর পর হয়েছে। আমি তো সে সময়ে ছিলামই না। তবে তারপরও কেন যেন নিজেকে সে সংগ্রামের অংশ মনে হয়। এ রহস্য বোধহয় বাঙালি হয়ে জন্ম নেবার সাথে জড়িত। মুক্তির সে সংগ্রামের যত বছরই কেটে যাক না কেন, আমরা বাঙালিরা আজীবন সেই সংগ্রামের অংশ থাকব।

 

সংগ্রাম ৯ মাসের ছিল না , সংগ্রাম ছিল ২৩ বছরের। বা হতে পারে তারও বেশি। এ সোনার ভূমিতে হাজার বছর ধরেই দস্যুর আগমন হয়েছে, শোষকদের বর্বর নির্যাতন, শোষণ চলেছে।

 

এখন পর্যন্ত এ দস্যু আমাদের দেশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো এখনো এক অঘোষিত সংগ্রাম বাংলাদেশ করে যাচ্ছে, আসলে বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল এক মহাসংগ্রাম সমাপ্ত করে।  তাই বোধহয় এদেশের নিয়তির মধ্যে আজীবন মুক্তির আন্দোলনের ধারাবহিকতা থেকে যাবে। যুদ্ধ বিদ্রোহ বাঙালি জাতির জীবনের সাথে ওতপ্রোতো ভাবে জড়িত। তাই স্বাধীনতা অর্জনের এত বছর পরও আমরা মুক্তি খুঁজে বেড়াই। জীবনের এ অসমাপ্ত যুদ্ধই বাঙালি জাতিকে বীরযোদ্ধার ন্যায় সাহসী ও শক্তিশালী বানিয়ে দিয়েছে।

 

বাঙালিরা এখন সংগ্রামকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর এ সংগ্রামের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। বর্তমান আধুনিক বাংলাদেশে এ সংগ্রামটা এতটাই স্বাভাবিক যে দৈন্দদিন কার্যকলাপের খাতায় এর নাম সবসময় লেখা থাকে।এমই/জেসি