Logo
Logo
×

নগর জুড়ে

কালো অধ্যায়ের আজ ৭ বছর

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২১, ০৩:৩১ পিএম

কালো অধ্যায়ের আজ ৭ বছর
Swapno

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেই সাত খুনের সাত বছর পূর্ণ হলো আজ। তখন নৃশংস ও লোমহর্ষক ওই হত্যাকান্ডের তোলপাড় হয়েছিল সারাদেশ। যা বিশ্ব গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়িত হয়। এছাড়া দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আদালতের নির্দেশে র‌্যাবে কর্মরত সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

 

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্স র‌্যাব সদস্যদের সম্পৃক্ততায় নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে তো বটেই, দেশের ইতিহাসেও ন্যক্কারজনক ঘটনার একটিতে পরিণত হয়েছিলো ওই ৭ খুনের ঘটনাটি। তবে আলোচিত ওই হত্যাকান্ডের সাত বছর পূর্ণ হলেও অদ্যাবধি হত্যাকান্ডের রায় বাস্তবায়ন হয়নি। নিম্ন আদালতের পরে হাইকোর্টেও দ্রুত রায় ঘোষণা করা হলেও আপিল বিভাগে রায়টি নিষ্পত্তি হতে ধীরগতির অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজনরা।

 

চার বছর আগে উচ্চ আদালত ওই মামলার রায় প্রদান করলেও এখনও তা কার্যকর না হওয়ায় নিহতদের স্বজনরা চরম অনিশ্চয়তা ও আতংকের মধ্যে রয়েছেন । নিহতদের মধ্যে ২/১ জন স্বচ্ছল হলেও অনেকেই অস্বচ্ছল। বিভিন্ন সময়ে সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে নানাভাবে আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে তা না হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে নিহতের পরিবারগুলো। তারপরেও সরকারের কাছে তাদের একটাই দাবি উচ্চ আদালতের রায় যেন দ্রæত কার্যকর করা হয়।  

 

জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে হাজিরা শেষে প্রাইভেটকারযোগে ফিরছিলেন নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, সহযোগী তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম। একইসময়ে আদালতের কার্যক্রম শেষে অপর একটি প্রাইভেটকারে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম। পথিমধ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে সাদা পোশাক পরিহিত র‌্যাব সদস্যরা তাদের সাত জনকেই অপহরণ করেন। তখন সাত জনকে অপহরণের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জ।

 

দফায় দফায় চলতে থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ। অপহরণের ঘটনার একদিন পর কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় ছয়জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এ ছাড়া আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পালও একই থানায় পৃথক আরেকটি মামলা করেন। শুরুতেই নজরুলের শ্বশুর শহীদ চেয়ারম্যান গনমাধ্যমের মাধ্যমে দাবী করে আসছিল যে নুর হোসেনই র‌্যাবকে দিয়ে এই অপহরণের ঘটনাটি ঘটিয়েছে। ঘটনার তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীর চর ধলেশ্বরী এলাকা থেকে ছয়জনের ও ১ মে একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

 

সাত জনকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় একই পন্থা ও কায়দা অবলম্বন করা হয়। নিহতদের মধ্যে সবাইকে একই স্টাইলে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। যাতে করে মরদেহ ভেসে উঠতে না পারে। উদ্ধার করা মরদেহগুলো হাত-পা বাঁধা ছিল, পেটে ছিল ফাঁড়া। ১২টি করে ইট ভর্তি সিমেন্টের বস্তার দুটি বস্তা বেঁধে দেওয়া হয় প্রতিটি মরদেহগুলোর সঙ্গে। মরদেহগুলোর মুখ ছিলো ডাবল পলিথিন দিয়ে মোড়ানো।

 

আলোচিত এই হত্যাকান্ডটি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতে শিরোনাম হয়ে ওঠে। আর এই সমালোচনার ঝড় তোলার প্রধান কারণ হয়ে ওঠে এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে সেই সময় এ জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা র‌্যাবের তিন কর্মকর্তা (লে. কর্ণেল তারেক সাঈদ, লে. কমান্ডার এমএম রানা ও মেজর আরিফ) ও হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি নূর হোসেনের জড়িত থাকার ব্যাপারটি। এ ঘটনায় সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে হাইকোর্ট র‌্যাব ১১-এর তিন শীর্ষ কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এমএম রানাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন।

 

মামলা চলাকালে প্রধান আসামিকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামিদের চোখ রাঙানি, নরঘাতকদের পক্ষে আদালতপাড়ায় শোডাউনসহ নানা ঘটনায় গেলো পৌনে তিন বছর ধরেই আলোচিত ছিল ৭ খুনের মামলাটি। তদন্ত শেষে প্রায় এক বছর পর ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর নূর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। দু’টি মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। আর চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে এখনো ১২ জন পলাতক রয়েছে।

 

২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দু’টি মামলায় নূর হোসেনসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। দু’টি মামলাতেই অভিন্ন সাক্ষী ১২৭ জন। এর মধ্যে দু’টি মামলার বাদী, দু’জন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীসহ ১০৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। এরপর ২৪ অক্টোবর থেকে শুরু হয় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে শোনানো ও তাদের বক্তব্য গ্রহণের কার্যক্রম। ২১ নভেম্বর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। ৩০ নভেম্বর শেষ হয় আলোচিত ৭ খুন মামলার আইনি কার্যক্রম। ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি সকাল ১০টা ৪মিনিট থেকে ১০টা ৯ মিনিট পর্যন্ত তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন আলোচিত সাত খুন মামলার রায় ঘোষণা করেন।

 

আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নাসিকের বরখাস্তকৃত কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাবের চাকরিচ্যুত অধিনায়ক লে. কর্ণেল (অব) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, উপ-অধিনায়ক মেজর (অব.) আরিফ হোসেন ও ক্যাম্প ইনচার্জ লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানাসহ ২৬ জনের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। বাকি ৯ জনের মধ্যে অপহরণ ও মরদেহ গুমের সঙ্গে জড়িত থাকায় এক আসামিকে ১৭ বছর, অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকায় ৬ জনকে ১০ বছর এবং মরদেহ গুমে জড়িত থাকায় ২ জনকে ৭ বছরের কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত। পরে  আসামিপক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট সাত খুন মামলায় সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র‌্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডে রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। বাকি ১১ জনের মৃত্যুদন্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। পরে আসামিপক্ষ আবারও এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করে।

 

ফাঁসির ১৫ জন আসামি :

হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামিরা হলো, প্রধান আসামি নূর হোসেন, র‌্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা (এমএম রানা), হাবিলদার এমদাদুল হক, ল্যান্সনায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়্যব, কনস্টেবল মো: শিহাব উদ্দিন, এসআই পুর্নেন্দ বালা, সৈনিক আবদুল আলীম, ল্যান্সনায়েক হীরা মিয়া, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী (পলাতক), সৈনিক আলামিন শরিফ (পলাতক) ও সৈনিক তাজুল ইসলাম (পলাতক)।

যাবজ্জীবন প্রাপ্ত ১১ জন আসামি:

১১ জনকে ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জের নিম্ন আদালত মৃত্যুদন্ড দিলেও ২২ আগস্ট হাইকোর্ট যাবজ্জীবন কারাডন্ড প্রদান করে। তারা হলো, র‌্যাবের সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, নূর হোসেনের সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, নূর হোসেনের বডিগার্ড মোর্তুজা জামান চার্চিল, নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, জামালউদ্দিন, এনামুল কবীর, সানাউল্লাহ সানা (পলাতক), শাহজাহান (পলাতক)।

কারাদন্ড প্রাপ্ত ৯ জন আসামি :

এর আগে ১৬ জানুয়ারি ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করে, যাদের রায় ২২ আগস্ট হাইকোর্ট বহাল রেখেছে। অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে করপোরাল রুহুল আমিনের ১০ বছর, এএসআই বজলুর রহমানের ৭ বছর, হাবিলদার নাসির উদ্দিনের ৭ বছর, এএসআই আবুল কালাম আজাদের ১০ বছর, সৈনিক নুরুজ্জামানের ১০ বছর, কনস্টেবল বাবুল হাসানের ১০ বছর কারাদন্ড হয়েছে। পলাতক আসামিদের মধ্যে হাবিবুর রহমানের ১৭ বছর, কামাল হোসেনের ১০ বছর ও মোখলেসুর রহমানের ১০ বছর কারাদন্ড হয়েছে। হাইকোর্ট তাদের নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখেছে।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন