নারায়ণগঞ্জকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রকাশ ও ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো জেলা পুলিশ। ২০১৮ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের তৎকালিন পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান আনুষ্ঠানিক ভাবে ৩২ জন মাদক ব্যবসায়ীর ছবি প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দিতে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। রাঘোব বোয়ালদের অনেককেই ওই তালিকায় আনা না হলেও ৩২ জনের সবাই ছিলেন চিহ্নিত মাদক কারবারি।
তালিকার বিষয়ে তৎকালিণ পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেছিলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদারেরা ৩২ বা ৪০ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এদের সংখ্যা আরও বেশি। আমাদের এই তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকবে। আমরা নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি নাগরিকের সহায়তা আশা করছি।” তবে, তালিকা হলেও ওই মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে পরবর্তীতে আর তৎপরতা দেখা যায়নি। এরই মধ্যে ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলী হন আনিসুর রহমান। তার স্থলে আসেন আলোচিত পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ (বর্তমানে অতিরিক্ত উপ মহাপরিদর্শক)।
তিনি নারায়ণগঞ্জের অপরাধীদের জন্য মুর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও পূর্ববর্তী পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানের করে যাওয়া মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা ধরে অভিযান চালাতে দেখা যায়নি তাকে। কিংবা ওই তালিকা সংস্কারও করা হয়নি পরবর্তীতে। নানা ঘটনার জন্মদিয়ে গত ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর এসপি হারুনের নারায়ণগঞ্জ অধ্যায় সমাপ্ত হলে নারায়ণগঞ্জে তার স্থলাভিষিক্ত হন বর্তমান পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন তিনি। এরপর দেড় বছর পেড়িয়ে গেলেও তার দায়িত্বকালিণ এই সময়ের মধ্যেও ওই তালিকা সফলতার মুখ দেখেনি। তালিকাটি নিয়ে বর্তমানে জেলা পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঝে কোন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এক কথায় হিমাগারে পড়ে আছে সেই ৩২ মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা।
৩২ জনের ওই তালিকায় আসা মাদক ব্যবসায়ীরা হলো- নারায়ণগঞ্জ শহরের ২নং বাবুরাইল এলাকার কালাচান মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ বাদশা (৪০), পাইকপাড়া এলাকার মৃত মুরাদ মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ওরফে রুমান (৪৮), ১৯২ নং দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার মৃত সাদেক আলীর ছেলে বাদল ওরফে বাদলা ওরফে মকবুল হোসেন (৫১), সৈয়দপুর এলাকার শামসুদ্দিনের ছেলে কালা মিয়া ওরফে হামিদ ওরফে কালাই (৩৮), বেপারীপাড়া এলাকার মৃত মুনু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ রানা (৩৫), দক্ষিণ রেলী বাগান এলাকার মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ শেখ ফরিদ (২৭)। থানা পুকুর পাড় রয়েল ট্যাঙ্ক রোড রেলি বাগানের মৃত অর্জুন চন্দ্র পালের ছেলে কার্তিক চন্দ্র পাল (২৮), দেওভোগ আখড়া মসজিদ হোল্ডিং নং ৫২ এলএন রোড এলাকার মৃত কালাচাঁন মিয়ার ছেলে দিপু (৩৬)|
২নং রেল গেইট বিবি রোড এলাকার হারুন রশিদের ছেলে সোয়াদ হোসেন ওরফে বান্টি (২৫), পাইকপাড়া এলাকার জয়নাল আবেদিনের ছেলে মহিউদ্দিন (৩৫), দেওভোগ পানির ট্যাংকি এলাকার মৃত এনায়েত আলির ছেলে আওলাদ (৩২), পাইকপাড়া এলাকার সালাউদ্দিনের ছেলে রাজু আহমেদ (৩৫), সৈয়দপুর আল-আমিন নগরের মৃত খালেক বেপারীর ছেলে জাবেদ বেপারী (৪০), দক্ষিণ রেলী বাগানের মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ বাদল (৩৭), রেলী বাগানের ওয়াজউদ্দিনের ছেলে সালাউদ্দীন (৩১) এবং শহরের মেট্রো হল সংলগ্ন কুমুদিনী বাগানের মৃত বাবুল মিয়ার ছেলে মাসুদ ওরফে সিআডি মাসুদ। ফতুল্লা থানার ১৬ মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদারদের মধ্যে ওই তালিকায় আনা হয়, দাপা মসজিদ এলাকার মৃত মতলব কাজীর ছেলে রিপন কাজী, মাসদাইর গুদারা ঘাট এলাকার রফিকুল ইসলাম ভেন্ডারের ছেলে নাদিম (৩০), দাপা ইদ্রাকপুরের হাবিবুর রহমানের ছেলে মন্টু মিয়া (৪২), একই এলাকার শাহ আলমের স্ত্রী পারভীন ওরফে নাইট পারভীন, খোচপাড়ার মৃত ফজলুল হকের ছেলে টিকি মরা লিটন (৪৫), রাম নগরের মৃত সাবেদ আলির ছেলে রহিম বাদশা (৪৮), মাসদাইরের মজিবরের ছেলে হিটলার (৪৮), একই এলাকার গোলাম মোস্তফা রনির স্ত্রী পারুল ওরফে পারুলী, দাপা ইদ্রাকপুরের সাইফুল ইসলামের ছেলে লিটন ওরফে সাইকেল লিটন (৪৮), আব্দুল রশিদ মিস্ত্রির ছেলে মানিক রতন, মাসদাইরের ফজলুল হকের ছেলে হান্ড্রেড নাসির, ফাজিলপুরের সামসুল হকের ছেলে সানি, দাপা মসজিদের ছেলে মতলব কাজির ছেলে সেন্টু কাজি (৩৪), দাপা মসজিদ এলাকার আলী নূর বেপারীর ছেলে উজ্জল, দাপা মসজিদ এলাকার মৃত সেকান্দারের লতিফ (৩৪) এবং দাপা ইদ্রাকপুরের মৃত সামসুল হকের ছেলে লিপু ওরফে ডাকাত লিপু (৩২)।
তালিকার প্রথম ৮ জনকে ধরিয়ে দিতে পারলে প্রত্যেকের জন্য ১০ হাজার এবং পরবর্তী আট জনকে ধরিয়ে দিতে পারলে প্রত্যেকের জন্য পাঁচ হাজার করে আর্থিক পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছিলো। জানা গেছে, তালিকা প্রকাশের পর আত্মগোপনে ছিলো মাদক ব্যবসায়ীরা। ধরিয়ে দিতে পারলে মিলবে পুরস্কার- এমন ঘোষণায় সাধারণ মানুষের মাঝেও তা ছিলো আলোচনার খোরাক। তবে, শেষপর্যন্ত অদৃশ্য কারণে ওই তালিকার সুফল মেলেনি বা পরবর্তীতে এমন ফলাও করে বা আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন কোন তালিকাও হয়নি। যদিও বিভিন্ন সময়ে এদের মধ্যে কেউ কেউ ভিন্ন ভিন্ন অভিযানে আটক হয়েছিলেন। কিন্তু ওই তালিকা ধরে অভিযান চালানো হয়নি।
জানা গেছে, এসপি আনিসুর রহমান নারায়ণগঞ্জে আসার পর মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা রেখেছিলেন। এমনকি তিনি সদর ও ফতুল্লাসহ নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য থানা এলাকায় ফোর্স নিয়ে নিজে উপস্থিত থেকে মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হানা দিয়েছিলেন। আসামী ধরাসহ নিজেই উদ্ধার করেছিলেন মাদক। তবে, পরবর্তী সময়ে এমন অভিযান লক্ষ্য করা যায়নি। এদিকে, ৩২ জনের ওই তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের বর্তমান পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘৩২ জনের ওই তালিকা নিয়ে পরবর্তীতে কাজ করা হয়নি। তবে, আমার দায়িত্বকালিণ সময়ে আমরা প্রতিনিয়তই মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা করছি এবং বর্তমান তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। যদিও তা পূর্বের তালিকার মত আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রচার করা হয়নি। আর পূর্বের ওই তালিকার বিষয়ে নির্দেশনা এসেছিলো যে, তা আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করার এবং পুরস্কার ঘোষণা করার।’


