নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশিপুরে সেই বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা ছিলো উপজেলা প্রশাসনের। জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ সেই নির্দেশই দিয়েছিলেন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জোহুরাকে। তবে, শেষ পর্যন্ত ওই পরিবারটিকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে স্থানীয় শাহীনুর আলম নামে এক ব্যক্তি। এজন্য ওই পরিবারটির কাছ থেকে নেয়া হয়েছে মুচলেকাও। তবে, মুচলেকা কাকে দেয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করতে চাননি ভুক্তভুগি পরিবারটি। তা নিয়ে চলছে নানামুখি গুঞ্জন।
একটি সূত্রের খবর, শাহীনুর আলম নামে ওই ব্যক্তির মাধ্যমে গোপনে ৬০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ফলে সচেতন মহলের প্রশ্ন- ক্ষতিপূরণ ঘোষণার পর তা কেন গোপনে সাধারণ ব্যক্তির মাধ্যমে প্রদান করা হলো? তবে, জেলা ও সদর উপজেলা প্রশাসন বলছে, জেলা প্রশাসনের চ্যারিটি থেকেই উপজেলা প্রশাসনের সম্মতিতে শাহীনুর নামের ওই ব্যক্তি বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।
এদিকে, ৩৩৩ কাণ্ড ঘটনার জন্য দায়ি করা হচ্ছে কাশিপুর ইউপির ৮নং ওয়ার্ড সদস্য আইয়ুব আলীকেও। ইউএনও আরিফা জহুরাও দাবি করেছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আইয়ুব আলী তাকে সঠিক তথ্য দেননি। ওই পরিবারটি স্বচ্ছল বলেই তাকে তথ্য দেয়া হয়েছিলো। এমনটা হয়ে থাকলে ওই ঘটনার জন্য অন্যতম দায়ি আইয়ুব আলী। এক্ষেত্রে ভুক্তভুগি পরিবারটিকে আইয়ুব আলীর পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করলেও তা যৌক্তিক হতো বলে মনে করছেন সচেতন মহল। কিন্তু বলা হচ্ছে, উপজেলা প্রশাসন বা আইয়ুব আলী নয়- ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহীনুর আলম। তাই প্রশ্ন উঠেছে, কার ভর্তুকি কে দিলেন?
এদিকে, এই বিষয়ে জানতে চাইলে শাহীনুর আলম বলেন, ‘আমারে প্রশাসন থেকে ফোন করছে। বলছে এটার যখন একটা ঘটনা ঘটছে, আপনি একটা ব্যবস্থা করেন। তাই আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ফরিদ আহমদ ও তার স্ত্রীর হাতে ৬০ হাজার টাকা দিছি।’ প্রশাসন থেকে টাকা দিতে বলা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, প্রশাসন থেকে বলে নাই। আমি আমার ব্যক্তিগত টাকা দিছি।’
এদিকে, শাহীনুর আলমের কথার সাথে মিল নেই ইউএনও আরিফা জহুরার সাথে। সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা গতকাল দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘শাহীনুর আলম আগেও আমার মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করতে চেয়েছিলেন। তাই ওই ঘটনার পর তিনি নিজেই ওই পরিবারটিকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৬০ হাজার টাকা প্রদান করেছেন। ফরিদ উদ্দিন এর খরচ হয়েছিলো ৫৭ হাজার টাকা।’
জেলা প্রশাসক তো নির্দেশ দিয়েছিলেন সরকারী তহবিল থেকে উপজেলা প্রশাসনকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সরকারি তহবিল বলতে স্যার (জেলা প্রশাসক) বলেছিলেন, আমাদের উপজেলা প্রশাসনের অনেক চ্যারিটি থাকে, সেই চ্যারিটি থেকে দিতে। এটা চ্যারিটির মাধ্যমেই হয়েছে। উনি স্থানীয় লোক, সাহায্য করতে চাইছেন, তাই সম্মতি দেয়া হয়েছে।’
তাহলে বিষয়টি কী এমন যে, আপনারা সরকারের তহবিল থেকে ওই পরিবারটিকে ক্ষতিপূরণ দিতে অনাগ্রহী? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিষয়টি এমন নয়। মূলত একজন লোকাল মানুষ ওই পরিবারটিকে হেল্প করতে চেয়েছে। আমি তাকে সেই সুযোগ দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিনের এক ছেলে প্রতিবন্ধী। তাকে সরকারের প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেয়া হবে। আরো কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা সেটা করবো।’
জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘আমরা উপজেলা প্রশাসনকে বলেছি তার কোন চ্যারিটেবল ফান্ড থাকলে সেখান থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য। আমি যতটুকু জানি চ্যারিটেবল ফান্ড থেকেই ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে।’
এদিকে, চ্যারিটেবল ফান্ড থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হলে জেলা প্রশাসনের হাত থেকে কেন নয় কিংবা ওই স্থানীয় ব্যক্তি শাহীনুরের হাত থেকেই কেন ক্ষতিপূরণ দেয়া হলো- তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। এক্ষেত্রে কার ভর্তুকি কে দিলেন তাও রয়েগেলো অন্ধকারে।
প্রসঙ্গত, ৩৩৩ নম্বরে কল করে সরকারের খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়- এমন প্রত্যাশা থেকে মানবিক সাহায্যের আর্তনাদ করেছিলো পরিবার নিয়ে খাদ্য সংকটে পরা বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। কিন্তু মানবিকতার বদলে তিনি পেয়েছেন অমানবিকতার তিক্ত স্বাদ। তার ৪ তলা বিশিষ্ট বাড়ি রয়েছে এবং তিনি ‘যথেষ্ট স্বচ্ছল’ স্থানীয় ইউপি সদস্য আইয়ুব আলীর এমন তথ্যের ভিত্তিতে সাহায্য দেয়ার বদলে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরার নির্দেশনায় ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তা করতে হয়েছে অর্থ সংকটে থাকা বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও তার পরিবারকে। অন্যথায় ৩ মাসের জেল হবে বলে জানানো হয়।
এমন হুমকি থাকায় আত্মমর্যাদা রক্ষায় শেষ সম্বল স্ত্রী’র গহনা বিক্রি করে দিতে হয়েছে ভর্তুকি। স্ত্রী’র গহনা বিক্রি ও ধারদেনা করে ৬৫ হাজার টাকা ব্যায়ে ১০০ জনের মাঝে চাল, আলু, ডাল, লবন ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করতে হয়েছে তাকে।
অমানবিক এই ঘটনায় পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর ভুক্তভুগি পরিবারকে সরকারের তহবিল থেকে ক্ষতিপুরণ দেয়ার কথা জানিয়েছিলো জেলা প্রশাসন। ঘটনার নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে গঠন করেছেন তদন্ত কমিটিও। তবে, সাহায্য চেয়ে উল্টো রোষানলে পড়া বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিনের ভর্তুকি দেয়ার পেছনের গল্পটা যে কতটা নির্মম, সেই ক্ষতিপূরণ নিরূপন হবে কি দিয়ে? সেই প্রশ্নই তুলেছেন সচেতন মহল। এই ক্ষতিপূরন হবার মত নয় বলেও মন্তব্য করছেন অনেকেই।
ভুক্তভুগি ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ভাই শাহীন ও ভাইয়ের স্ত্রী বিলকিস বেগম বলেন, ‘১০০ জনের খাবার দিতে না পারলে জেল হবে- এই লজ্জায় ফরিদ উদ্দিন আহমেদ শুক্রবার রাতে দু’বার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। মানসিক চাপে যদি ফরিদ উদ্দিন আত্মহত্যা করেই বসতেন, তাহলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াতো। কী ক্ষতিপূরন দিতো প্রশাসন? সহায়তা চাওয়ার পর, নির্নয় করে যদি দেখতেন সে সহায়তা পাওয়ার যোগ্য নয়, তাহলে তাকে সহায়তা না করলেই পারতো। কিন্তু সহায়তাতো করলই না, উল্টো তার সাথে এমন অমানবিক ঘটনা ঘটলো। চাপের মুখে পড়ে স্বপরিবারে মানসিক ভাবে যেই ক্ষতির শিকার হতে হয়েছেঠ সেই ক্ষতিপূরণ হবার নয়।’


