ফতুল্লায় মাদক ব্যবসায়ী, ঝুট সন্ত্রাস ও কিশোরগ্যাং বাহিনী সাধারণ মানুষের কাছে বিষফোঁড়ায় রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে আবারও আলোচনায় এসেছে ফতুল্লার ইসদাইর। গত ২৮ জুন রাতে মাত্র ৬ ঘন্টার ব্যবধানে ইসদাইরে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে একটি মাদক কারবার, অপরটি ঘটে অটোরিক্সা ছিনতাইকে কেন্দ্র করে।
সূত্র জানায়, ইসদাইরে আধিপত্ত বিস্তার করাকে কেন্দ্র করে বরাবরই সক্রিয় রয়েছে একাধিক গ্রুপ। এসব গ্রুপগুলো ক্ষমতাসীন দলের ব্যানার ব্যবহার করলেও আদোতে মাদক ব্যবসায়ী, কিশোরগ্যাং ও সন্ত্রাসীদের লালন পালন করছেন এলাকায় আধিপত্ত ধরে রাখার জন্য। স্থানীয়রা বলছেন, ইসদাইরে এমন কিছু নেতার আশ্রয়ে থেকেই সংঘবদ্ধ হচ্ছে কিশোর অপরাধীরা। ঘটিয়ে চলেছে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। এদের অনেকেই আবার জড়িত আছে মাদক কারবারের সাথে। এভাবেই মাদক, কিশোরগ্যাং ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বৃহত্তর ইসদাইর এলাকা।
সবশেষ গত ২৮ জুন রাতে ইসদাইর রেললাইন ও চাষাঢ়া রেলস্টেশনে মাদকের স্পট থেকে মাসোহারা আদায় করাকে কেন্দ্র করে মাদককারবারী শামীম, রকি ও মানিক গ্রুপের সাথে ইসদাইর বুড়ির দোকান এলাকার জামান, সোহাগ ও শিমুল গ্রুপের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে শামীম গ্রুপের হাতে নির্মম ভাবে খুন হয় রুবেল নামে এক রাজমিস্ত্রি। একই ঘটনায় মাদকের মাসোহারা দাবি করা সোহাগও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়। পরবর্তীতে জামান, সোহাগ ও শিমুল গ্রুপের লোকজন পাল্টা হামলা চালায়। এসময় ইসদাইর বাজারে অবস্থিত অখ্যাত ‘জয়যাত্রা ক্লাব’ ও কয়েকটি দোকান ভাংচুর করা হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, ওই সংঘর্ষে রাজমিস্ত্রী রুবেল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েকৃত মামলায় উভয় পক্ষের ৩৩ জনের নাম উল্লেখ ও ৩০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় এখনো পর্যন্ত ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারদের মধ্যে ইসদাইর বুড়ির দোকান এলাকার ফারুক হোসেন শিমুল ফতুল্লা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং এক আওয়ামী লীগ নেতার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে এলাকায় পরিচিত। চাষাঢ়া রেলস্টেশন ও ইসদাইর রেললাইন এলাকার বিভিন্ন মাদক স্পট থেকে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা শিমুল ও তার সহযোগিরা মাসোহারা আদায় করতো বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে, চাষাঢ়া রেলস্টেশন ও ইসদাইর রেললাইন এলাকার মাদক ব্যবসায়ী শামীম, মানিক ও রকিসহ তাদের সহযোগিরা ইসদাইর এলাকার এক ব্যক্তির শেল্টারে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। ওই ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জের একটি বিশেষ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য ‘হাজী সাহেবের লোক’ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকেন। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, কিশোরগ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন সেক্টর দখলের লক্ষ্যে এমন একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে ইসদাইরে।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা শিমুল, তার সহযোগি জামান, সোহাগ এবং মাদক ব্যবসায়ী শামীম ও মানিক গ্রুপ ছাড়াও রয়েছে কাপুরাপট্টি এলাকার মাদক ব্যবসায়ী পেটকাটা রকি, ইসদাইর এলাকার পায়েল, কমল, মানিক, হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামী কিশোরগ্যাং লিডার ইভন, হাসান, উজ্জল, খান বাবু, অনন্ত ও মুরগি মামুন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে থানায় মামলা ও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপেই রয়েছে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ। পান থেকে চুন খশলেই আধিপত্ত বিস্তারের লক্ষ্যে ইসদাইরে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মহড়া চালায় এসব সন্ত্রাসীরা। জড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। ভয়ানক হয়ে উঠা এসব অপরাধীদের উৎপাতে ভীত হয়ে পড়েছেন ইসদাইর এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসদাইর এলাকার একাধিক বাসিন্দা দৈনিক যুগের চিন্তাকে জানান- ‘এসব সন্ত্রাসী, কিশোরগ্যাং ও মাদককারবারি গ্রুপগুলো ইসদাইরের শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে বিষ ফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে ক্রমশই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ইসদাইর বাজারে মানিক গ্রুপ গড়ে তুলেছে ‘জয়যাত্রা’ নামক একটি ক্লাব। যেখানে দিন রাত চলতো তাদের আড্ডা। বেপরোয়া হয়ে উঠা এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ইসদাইরের শান্তিপ্রিয় বাসীন্দারা।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেছেন, ‘যারাই যেকোন ধরনের অপরাধ সংঘঠিত করছে, তাদেরকে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। আর গত তিনদিন আগে ইসদাইরে দু’পক্ষের সংঘর্ষে যেই হত্যাকান্ড ঘটেছে, ওই ঘটনায় আমরা মামলা নিয়েছি। ইতিমধ্যেই ৮জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার অভিযান অব্যাহত আছে। আমরা অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো ট্রলারেন্স নীতি অবলম্বন করছি। অপরাধীরা যেই দলের বা ব্যক্তিরই হোক, তাদের বিন্দু মাত্র ছাড় দেয়া হবে না। এই বিষয়ে আমাদের গভীর তদন্ত চলছে।’


