ত্বকী হত্যার ১০০ মাস উপলক্ষে দেশব্যাপী আলোক প্রজ্বালন অনুষ্ঠিত
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২১, ১০:১০ পিএম
তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১০০ মাস উপলক্ষে ত্বকী সহ সকল হত্যা ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের আহবানে সারাদেশে আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খেলাঘর, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমগীত, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, প্রগতি লেখক সংঘ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রফ্রন্টের কর্মীবৃন্দ, ‘জাতীয় ত্বকী রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা’য় বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিজয়ীবৃন্দ এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
করোনা বাস্তবতার কারণে স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে সারাদেশে একযোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ত্বকীর পরিবার, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, মানবাধিকার সংগঠক এড. সুলতানা কামাল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যপক আনু মুহাম্মদ সহ সহস্রাধিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, মানবাধিকার কর্মী আলোক প্রজ্বালনে অংশনেন। এ কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশের বাইরে আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, ইতালি, সিঙ্গাপুর ও ভারত থেকে বাংলাদেশী ও সে সব দেশে বসবাসরত সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীবৃন্দ আলোক প্রজ্বালন করে অংশ গ্রহণ করেন।
কর্মসূচি উপলক্ষে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহবায়ক, ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, ১০০ মাস অতিবাহিত হলেও ত্বকী হত্যার তৈরী করে রাখা অভিযোগপত্রটি আদালতে পেশ না করা শুধু মাত্র বিচারহীনতার নজিরই নায় এইটি সরকারের দেউলিয়াপনার উদাহরণ। সরকার নিজের ব্যার্থতা রাষ্ট্রের কাঁধে চাপিয়ে রাষ্ট্রকেই আজকে প্রশ্নের মুখোমুখী দাঁড় করিয়ে দেউলিয়া করে দিতে চাচ্ছে। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ বিচার ব্যবস্থার অবসান চাই। সাগর-রুনী ও তনু হত্যার বিচার চাই। নারায়ণগঞ্জের আশিক, চঞ্চল, মিঠু, বুলু হত্যার বিচার চাই। সাড়ে তিন বছর আগে অপহৃত শিশু সাদমান সাকির উদ্ধার চাই। ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে ভিন্ন-মত দমনে নিষ্ঠুরতার অবসান চাই।
সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা ত্বকীহত্যার বিচার চেয়ে আসছি। কিন্তু বিচারটি হচ্ছে না। ইতিমধ্যে সরকার অনেকগুলো আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য সম্পন্ন করে তার নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু কি এক অজানা কারণে সারাদেশের এমনকি বিদেশের বাংলা ভাষা-ভাষীদের কাছেও আলোচিত নারায়ণগঞ্জের এই হত্যাকাণ্ডটির বিচার হচ্ছে না। আমার কাছে এখন এটাই বোধগম্য যে, প্রভাবশালীরা প্রভাব খাটিয়ে সরকারের প্রশাসনকে ব্যবহার করে এই বিচারটি বাধাগ্রস্থ করছে, বিচারটিকে বিলম্বিত করছে। প্রভাবশালীরাতো নিশ্চয়ই সরকারের চেয়ে বেশী শক্তিশালী নায়। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি ত্বকী হত্যার বিচারটি দ্রুত ও নিরপেক্ষতার সাথে সম্পন্ন করা হোক। নারায়ণগঞ্জবাসী সহ সারা বাংলাদেশের মানুষের দাবীর প্রেক্ষিতেই এই বিচারটি এখন অতি-দ্রুত সম্পন্ন করার জোর দাবী জানাচ্ছি। এটা এখন সময়ের দাবি।
সুলতানা কামাল বলেন, আজ ত্বকী’র স্মরণে আলো জ্বালিয়ে আমরা জানাতে চাই, ঘৃন্য হায়েনারা ত্বকীকে আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে দিলেও ত্বকী আমাদের হৃদয়ে ভালোবাসার আলোতে ভাস্বর হয়ে আছে। ত্বকী সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী, দখলদার ও খুনিদের রাজত্ব। তারা অন্যায় জুলুম দখল সন্ত্রাস যা খুশি তাই করতে পারে, আইন আদালত অকার্যকর করে রাখতে পারে। ত্বকী হত্যাকাণ্ড এবং তার চিহ্নিত খুনিদের রক্ষায় সরকারের তৎপরতা এর এক ভয়ংকর দৃষ্টন্ত! অন্যদিকে ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে নারায়ণগঞ্জ প্রতিরোধের যে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে তা সারাদেশের গুম খুন ধর্ষণ নিপীড়ন প্রাণ প্রকৃতি বিনাশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে মানুষকে সাহস যোগাচ্ছে। আমরা ত্বকী-তনু-সাগররুনী সহ সকল খুনের বিচার এবং ক্রসফায়ার নামে রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ, গুম, খুনীদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করার দাবি জানাই।
সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানী শংকর রায় বলেন, আজ সারা দেশে ও বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে আলোক প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে মানুষ ত্বকী সহ সকল হত্যা-খুন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আমরা আশা করবো সরকার মানুষের এ দাবি ও প্রতিবাদের ভাষাকে বুঝবে, সকল হত্যার বিচার নিশ্চিৎ করবে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নগরীর শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। এর দু’দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
৫ মার্চ ২০১৪ তদন্তকারী সংস্থা র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদেরই টর্চারসেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। অচিরেই তারা অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করবেন। কিন্তু সে অভিযোগপত্র আজো আদালতে পেশ করা হয় নাই। ত্বকী হত্যার পর থেকে বিচার শুরু ও চিহ্নিত আসামীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।


