ব্যস্ত শহরে নগরবাসীর জন্য ফুসফুসের কাজ করছে জীমখানাস্থ শেখ রাসেল পার্ক। ছবি তুলেছেন, আল-আমিন তুষার।
# প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা হাজারো লোকের সমাগম নির্মল বাতাসের জন্য
# রাসেল পার্কেই বদলে গেছে গোটা এলাকার চিত্র
# ব্যস্ত শহরে প্রাণোচ্ছল বিনোদনের অপরূপ সুযোগ
# কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রশংসা কুঁড়িয়েছে রাসেল পার্ক
শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের মূল শহরে হাফ ছাড়বার জায়গা ছিলনা। দখল-দূষণে শীতলক্ষ্যার বেহাল দশা থাকায় কোলাহলপূর্ণ এই শহরে নির্মল বাতাসের জন্য হাহাকার ছিল।শুধু নারায়ণগঞ্জবাসী কেন দেশের যে কোন এলাকা থেকে মানুষ নারায়ণগঞ্জ শহর মানেই এক ঘিঞ্জি শহর মনে করত। এই শহরে একটি ফুসফুসের প্রয়োজন ছিল। নির্মল বাতাস, সবুজ পরিবেশ আর বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে এমন একটি চিন্তা মাথায় নিয়েই শহরে ফুসফুস বসানোর উদ্যোগ নেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। সরকারদলীয় মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিলেও এটি ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শহরের দেওভোগে এই ফুসফুস বসাতে গিয়ে হাজারো ঝক্কি-ঝামেলা, মামলা, হামলার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ঠিকই নগরবাসীর জন্য শেখ রাসেল পার্ক তিনি করতে সমর্থন হন। যদিও এখনও পার্কের পুরো কাজ শেষ হয়নি, প্রতিদিনই হাজার হাজার দর্শনার্থীর পদচারণায় সকাল-সন্ধ্যা মুখরিত থাকে এই পার্ক। আর এসবই সম্ভব হয়েছে একমাত্র আইভীর জন্য। নাসিকের তৃতীয় নির্বাচনে আইভী এখন ভোট চাইতে চষে বেড়াচ্ছেন নাসিকের ২৭টি ওয়ার্ডে। অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন করলেও শেখ রাসেল পার্কই হবে এবার আইভীর জন্য ভোটের ট্রাম্পকার্ড।
নগর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেখ রাসেল পার্ক তৈরি করতে গিয়ে আইভীকে কী পরিমাণ যুদ্ধ করতে হয়েছে তা অবলোকন করেছেন পুরো শহরবাসী। মাদকের আড্ডাখানা গুড়িয়ে, সন্ত্রাস হটিয়ে এই প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করতে গিয়ে একের পর এক খড়গ আইভীর কাঁেধে এসে পড়ে। তবে নগরবাসীকে সাথে নিয়ে সেসব মোকাবেলা করে আইভী ঠিকই শহরবাসীর জন্য এক প্রাণবন্ত বিনোদন কেন্দ্র উপহার দিয়েছে। এখন প্রতিদিনই আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এখানে ভিড় করছে। এই শেখ রাসেল পার্ক মানুষের অবসাদ দূর করে দেয়। এখনও অনেক কাজ বাকি, তবে উদ্বোধনের আগেই প্রতিদিনই হাজারো দর্শনার্থী শেখ রাসেল পার্কে এসে ঘুরে যান। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও শেখ রাসেল পার্কের মনোমুগ্ধকর শোভা বিমোহিত করেছে।
নগরবাসীর বলছেন, পরিবেশবান্ধব ঘনসবুজ ঘেরা ছায়া ঢাকা, নির্মল পানি সমৃদ্ধ লেক বিশিষ্ট জীমখানাস্থ শেখ রাসেল পার্ক এখন নগরীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এর আয়তন ১৮ একর। বর্তমান লেকটি একসময় পরিত্যক্ত জলাশয়/ ডোবা ছিল। প্রতিনিয়ত মানুষের বর্জ্য ফেলার কারনে লেকটি ডাম্পিং স্থান ও মশামাছির প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়। এছাড়াও অবৈধ দখলের ফলে জীমখানা লেক এলাকার পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলো মাদকব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে হিসেবে পরিচিত ছিল। ফলে লেক এলাকাটির আশেপাশে দূষণ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালে ডিটেইন্ড এরিয়া প্ল্যান লেকটি বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জনগণের দীর্ঘদিনের চাহিদা পূরণের লক্স্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র থাকাকালীন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীল ২০১১ সালে জিমখানা লেক খনন, সংস্কার ও সৌন্দর্য্য বর্ধনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লি. এর মাধ্যমে বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এখনকার এই নয়নানিভিরাম কাজটি শেখ রাসেল পার্ক হিসেবে নামকরণের জন্য ২০১৭ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে আবেদন করলে ২০১৮ সালে ওই দপ্তর থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। শেখ রাসেল পার্কটি এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র। প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিপুল সংখ্যক লোক এখানে প্রকৃতির নির্মল পরিবেশ উপভোগ করার জন্য আগমন করেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্যানুসারে, লেকটির দৈর্ঘ্য ৬৭০ মিটার, প্রস্থ্য ৭৫ মিটার। শেখ রাসেল পার্কটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। লেকের চারপাশে ওয়াকওয়ে, স্ট্রীট লাইট, সিটিং পেভিলিয়ান, পরিবেশ বান্ধব সবুজ গাছপালা রোপন করা হয়েছে। যা এখন সবুজের সমারোহে পরিণত হয়েছে। দর্শনার্থীদের অবসর সময় কাটানোর জন্য ৪টি ভিউ ডেক ও ৬টি ঘাটলা নির্মাণ করা হয়েছে। উন্মুক্ত পরিবেশে যে কোন ধরণের অনুষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত মঞ্চ নির্মাণ করার হয়েছে। লেকটির সৌন্দর্য্যবর্ধন করে দাঁড়িয়ে আছে শেখ রাসেল ম্যুরাল। লেক এর দুইপাশের লোকজনের পারাপারের জন্য একটি নয়ানিভিরাম ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। খেলাধুলার জন্য ১টি খেলার মাঠ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া পাবলিক টয়লেট (পুরুষ ও মহিলা) এর কাজ চলমান আছে। অবশিষ্ট কাজের মধ্যে রয়েছে বোট ক্লাব, সুইমিং পুল, ওয়াটার গার্ডেন, জিমন্যাস্টিক ক্লাব ওয়াটার বডি, ড্রাই ফাউন্টেন, স্কেটিং জোন, সাইকেল লেনসহ সৌন্দর্য্যবর্ধণের কাজ।এছাড়াও পার্কের অভ্যন্তরে শিল্প সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশের লক্ষ্যে বিদ্যমান চারুকলা ভবনটির স্থলে নতুনভাবে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি পরিবেশে বান্ধব চারুকলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
পুরোপুরি শেখ রাসেল পার্কটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর পরিবেশ উন্নয়নসহ নগরবাসীর দীর্ঘদিনের বিনোদন কেন্দ্রের চাহিদা পূরণ হবে। এছাড়া লেকটি অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য সংরক্ষিত জলাধার হিসেবে কাজ করবে। অপরদিকে অগ্নিকান্ড নির্বাপনের জন্য পানি সরবরাহের একমাত্র প্রধান উৎস হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রায় মৃত জিমখানা লেকটিকে সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে নগরবাসীর একঘেয়ামি জীবনযাপন পরিবর্তন ও প্রাণোচ্ছল করতে যে সহায়ক ভূমিকা রাখছে তা কেবল আইভীর কল্যাণেই। আইভীর বিগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে এই প্রকল্পটি একটি মেঘা প্রকল্প। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, বিগত দুই নির্বাচনে শহর এলাকায় আইভী যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন এবার শেখ রাসেল পার্কের কল্যাণেই তার ভোট ব্যাঙ্ক আরো বাড়বে।


