Logo
Logo
×

নগর জুড়ে

অপ্রতিরোধ্য আইভী

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০৫:১৩ পিএম

অপ্রতিরোধ্য আইভী
Swapno

আসলেন, দেখলেন আর জিতে নিলেন। এ যেন নির্ধারিতই ছিল। হ্যা, আবারও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নাসিক) মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। নারায়ণগঞ্জ শহরে তাঁর যে জনপ্রিয়তা তাতে এই ফলাফল অনেকটা প্রত্যাশিতই ছিল। গণমাধ্যমে আইভীর জয়ের খবর শুনে বন্দর ঘাট সংলগ্ন চায়ের দোকানি মোজাফফর বলে উঠলেন, ‘এই শহরে আইভীর বিকল্প নাই। আইভীর বিকল্প আইভীই।’


রোববার (১৬ জানুয়ারি) রাতে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে পাওয়া বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী আওয়ামী লীগ মনোনীত ‘নৌকা’ প্রতীকের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৩ ভোট। অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ‘হাতি’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৭১ ভোট। এবার ৬৯ হাজার ১০২ ভোটের ব্যবধানে জিতলেন আইভী। এর আগে গত দুই নির্বাচনে প্রথমবার লক্ষাধিক ভোট এবং দ্বিতীয়বার প্রায় ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। ১৬ জানুয়ারির এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে তৃতীয় বারের মতো নাসিক মেয়রের চেয়ারে বসতে যাচ্ছেন তিনি।


বিজয়ের ঘোষণা পেয়েই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা। বিজয়ী মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাসার সামনে ভিড় করেন বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী। ভিড় করেন গণমাধ্যম কর্মীরা। তাঁর এবারের বিজয় দলের সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতি উৎসর্গ করেন। তিনি বলেন, এই বিজয় জনগণের, এই বিজয় শেখ হাসিনার নৌকার।


জানা যায়, ২০০৩ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নিউজিল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হন। বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সেই দলের সমর্থিত প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারান আইভী। অনুন্নত পৌরসভার হাল ধরে রাজস্ব আদায় দ্বিগুণ করেন তিনি। পিতা আলী আহাম্মদ চুনকার মতো অল্প সময়েই মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন ডা. আইভী। রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা ব্যক্তিটি অল্প সময়তেই বুঝেছিলেন, মানুষ উন্নয়নের পাশাপাশি শান্তি চায়। 

 

এই কাজটি মেয়র আইভী সুনিপুণ হাতে সম্পন্ন করতে পেরেছেন বলেই মত নগরবাসীর। ২০০৩ সালে পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২০২১ সালে দ্বিতীয় দফায় সিটি মেয়রের দায়িত্ব পালনকালীন বদলে দিয়েছেন নগরীর চেনা রূপ। রাস্তা-ঘাট নির্মাণ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবা দিয়েছেন তিনি। সুপরিকল্পিত নগরায়নের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে শহরের বুকে নির্মাণ করেছেন শেখ রাসেল নগর পার্ক। উন্নয়নের পাশাপাশি লড়েছেন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, ভূমিসন্ত্রাসীর মতো দৃশ্যমান গণশত্রুদের বিরুদ্ধে। কেবল নির্বাচনী আশ্বাসই নয়, দীর্ঘ এই রাজনৈতিক জীবনে লড়েছেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। মেধাবী ছাত্র ত্বকীসহ নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সকল হত্যাকান্ডের বিচার দাবি করেছেন এবং করে যাচ্ছেন ভরা মজলিশে। অনেকের মতে, রক্তচক্ষুকে ভয় না করার সাহস নগরবাসী পেয়েছেন মেয়র আইভীর কাছে। প্রতিকূলতার মুখে প্রতিবাদের অন্যতম প্রতীক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।


সিটি কর্পোরেশন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বিগত বছরগুলোতে, ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়ন পরিকল্পানায় আইভীর গৃহীত সবুজ ও পরিকল্পিত নগর গড়তে সড়ক উন্নয়ন, সমন্বিত ড্রেনেজ সিস্টেম, পয়োনিষ্কাশন, জলধার সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কমিউনিটি ক্লিনিক, নগর হাসপাতাল এবং অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু; পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য স্বল্প ব্যয়ে আবাসন ব্যবস্থা চালু, শহর থেকে ট্রাক টার্মিনাল সরিয়ে নিয়ে নতুন করে নির্মাণ, এনসিসির আয় বৃদ্ধির জন্য নিজস্ব ভূমিতে মার্কেট ও ফ্ল্যাট নির্মাণ এবং কাঁচাবাজারসমূহের উন্নয়ন, কবরস্থান ও শ্মশানের উন্নয়ন, হেরিটেজ পার্কসহ বিনোদনের জন্য শিশু পার্ক নির্মাণ, শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ, নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত করার সুপারিশ, নাগরিকের সুবিধার্থে হোল্ডিং ট্যাক্স সহনীয় মাত্রায় রাখা, নাসিকের প্রতিটি এলাকায় সমপরিমাণ উন্নয়ন, ২৭টি ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্পাদিত হয়েছেন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায়। এ ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে রাস্তায় রাতে বাতি জ্বালানো, জলাবদ্ধতা নিষ্কাশন, পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে ময়লার জন্য ড্যাম্পিং স্টেশন নির্মাণ, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে খেলার মাঠগুলো রক্ষা, নদী পারাপারে বন্দর ও শহরের নাগরিকদের জন্য শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের উদ্যোগও রয়েছে। শহরের বুকে নির্মাণ করেছেন শেখ রাসেল পার্ক। মৃতপ্রায় বাবুরাইল খাল ও সিদ্ধিরগঞ্জ খাল উদ্ধার করে সৌন্দর্যবর্ধন করেছেন তিনি। যা বদলে দিয়েছে নগরীর চেনা চিত্র। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয় মেয়র হিসেবে আইভী নাগরিক সেবাও নিশ্চিত করতে পেরেছেন। এসব বিষয়ই ভোটে তাঁর বিজঞ সুনিশ্চিত করেছে।


গত দুই মেয়াদে কেবল নগরীর উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্যই নয় আইভী এই শহরে জনপ্রিয় আরও কয়েকটি কারণে। শহরের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে কথা হলে তারা জানান, শুধু নারায়ণগঞ্জে নয় সারা বাংলাদেশেই সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন, মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাসহ বিভিন্ন গুম-খুনের ঘটনায় সোচ্চার ছিলেন আইভী। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে সবসময়ই জোরালো আওয়াজ ছিল তাঁর। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের পাশাপাশি আইভীকে সৎ হিসেবেও চিহ্নিত করেন এই শহরের মানুষ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভুমিদস্যুতার বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব আইভীকে করেছে তুমুল জনপ্রিয়। স্বীকৃতি পেয়েছেন গণমানুষের নেতা হিসেবে। তার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসী কোনো কর্মকান্ডের অভিযোগ নেই। সারাদেশে ভোটের মাঠে সরকারবিরোধী অনুভূতি কাজ করলেও সরকারদলীয় এই মেয়র প্রার্থীকে ভিন্নভাবে গ্রহণ করে এই শহরের মানুষ। মোটা দাগে আইভীকে বিশ্বাস করেন তারা। যার কারণে ২০১১ সালে লক্ষাধিক এবং ২০১৬ সালে প্রায় ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন। এবারও বড় ব্যবধানে জিতলেন তিনি। এই ব্যবধান গড়ে দেন সাধারণ জনগণই।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন