দীপু-জাহাঙ্গীরের রাজসিক প্রত্যাবর্তন
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ০৫:৪১ পিএম
# সিটি নির্বাচনে তারুণ্যদীপ্ত চেহারায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে তাদের
# দীর্ঘদিন আর একটি বিশেষ মহলের রোষানলে ছিলেন
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবেই লাইম লাইটে সবার চোখের মনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনিত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে এই নির্বাচনে আইভীর বাইরে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের দুই নেতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য এড. আনিসুর রহমান দীপু ও জেলা আওয়ামী লীগের য্গ্মু সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমও লাইম লাইটে। আইভীর প্রচারণার পুরোটি সময় জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন আইভীর সাথে ছায়ার মতোন। আবার অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এমনকি মিডিয়ার সাথে সমন্বয়ের গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারের নির্বাচনে আইভীর দুইশক্তিশালী হাত এবং থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করেছেন এই দুই নেতা।
সূত্র জানিয়েছে, আনিসুর রহমান দীপু এবং জাহাঙ্গীর আলম দুইজন প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের বন্ধু। ১৯৮১ সালে এমপি শামীম ওসমান সরকারি তোলারাম কলেজের ভিপি থাকাকালীন ওইসময় জিএস ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। আইনজীবী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত আনিসুর রহমান দীপুও একসময় এমপি শামীম ওসমানের অন্যতম ঘনিষ্ট ও আস্থাভাজন ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরেই নীতি এবং আদর্শিক মতপার্থক্যের দরুণ দীপু ও জাহাঙ্গীর দুইজনই এমপি শামীম ওসমানের বলয় থেকে দূরে ছিলেন। এতে তাদের বিড়ম্বনাও কম পোহাতে হয়নি। আনিসুর রহমান দীপুকে তো জেলা আওযামী লীগের কমিটি থেকেই দূরে রাখা হয় এছাড়া আইনজীবী সমিতিতেও তাকে রাখা হয় অদৃশ্য চাপে। এমনকি গত দুবছর আগে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে অংশ নেয়াকে নিয়েও শামীম ওসমান এড. দিপুর উপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন বলে জানায় সূত্র। আর স্পষ্টভাষী জাহাঙ্গীর যেন সবসময়ের জন্যই চক্ষুশূল। স্পষ্টভাষী হওয়ায় তাকে টার্গেটে রাখে একটি মহল সবসময়। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভপতি আনেয়ার হোসেনের উদ্বোধন করা ভিত্তিপ্রস্তর ভাঙার প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধনে মুখ ফসকে একটি কথা বেরিয়ে যাওয়া এবং পরে ক্ষমা চেয়েও পার পাননি জাহাঙ্গীর আলম। জেলা আওয়ামী লীগের পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরে কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে তিনি তার পদ ফিরে পান। আনিসুর রহমান দিপু ও জাহাঙ্গীর আলম দুইজনকেই যেন ওসমানপন্থী নেতারা প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখছেন দীর্ঘদিন। সিটি নির্বাচনকে মাথায় নিয়ে তাদের উপর অদৃশ্য চাপ তৈরির চেষ্টা করেছিল ওই মহলটি। তবে রাজনীতির পাকা হাতেখড়ি থাকায় এই দুই আওয়ামী লীগ নেতাও ছিলেন নাছোড়বান্দা। পরিশেষে শুধু আইভীর জয়ই ছিনিয়ে আনলেননা, এ যেন তাদেরও রাজসিক প্রত্যাবর্তন।
সূত্র জানায়, গত দেড় বছর আইভীর বিরুদ্ধে লাগাতার বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ তুলে যখন বিভিন্ন মহল নারায়ণগঞ্জ শহর উত্তপ্ত করার মিশনে ছিল। তখন আনিসুর রহমান দীপু ও জাহাঙ্গীর আলম জননন্দিত নেত্রী আইভীর সাথে ছিলেন ছায়ার মতো। ষড়যন্ত্রকারীদের নানা অপবাদের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছেন বুক চিতিয়ে। এ যেন সত্যের সাথে মিথ্যার লড়াই। নানা লোভ প্রলোভন, চাপ, হুমকি কোন কিছুতেই তাদের দমানো যায়নি। অবশেষে গত ৩ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারো আস্থা রাখেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর উপর। আইভীর মনোনয়ন ঠেকাতে ওসমানপন্থী নেতারা এমন কোন হেন চেষ্টা নেই যে করেননি। কিন্তু এরপরও আইভীর উপর আস্থা রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সংবাদটি পাওয়া মাত্র আনন্দে আত্মহারা হয়ে মিছিলে ছুটে যাওয়ার সময় অসুস্থ্য হয়ে পড়েন জাহাঙ্গীর আলম। মনোনয়ন পাওয়ার আনন্দ ভুলে আইভীসহ সকল নেতৃবৃন্দ তখন জাহাঙ্গীরের জন্য হাসপাতালে। বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি জানার পর সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এরপর আইভীর প্রচারণার সার্বক্ষণিক সঙ্গী জাহাঙ্গীর আলম। আর এড. দিপু যেন ফিরে গেলেন তারুণ্যে। কেন্দ্রীয়, মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে বঙ্গবন্ধু সড়কের রাজপথে যেভাবে স্লোগান ধরেছেন তিনি তা দেখে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিকদের বিস্ময়ের কমতি নেই। শুধু কি তাই, কেন্দ্রীয় নেতারা যখনই এসেছেন তাকে পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের নারায়ণগঞ্জের সাথে মিশে যেতে যিনি অন্যতম সহযোগিতার হাতটি বাড়িয়েছেন তিনি এড. দীপু। এছাড়া মিডিয়ার সাথে কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে আইভীর নির্বাচনী মতবিনিময়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মোট কথা, আইভীর মনোনয়ন পাওয়ার আগে ও পরে আনিসুর রহমান দীপু ও জাহাঙ্গীর আলম যেন তুরুপের তাস হয়েই তাদের নেতৃত্বগুন দেখালেন। স্থানীয় নেতারা তো বটেই কেন্দ্রীয় নেতারাও দীপু ও জাহাঙ্গীরের দলের প্রতি আত্মনিয়োগের স্পৃহা দেখে বিস্মিত। সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারা নারায়ণগঞ্জের সাংগঠনিক তৎপরতার স্থবিরতা দেখে ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর নির্দেশনার পরও ওসমানপন্থী নেতাদের অসহযোগিতা তাদের ব্যথিত করেছে। হাতে গোনা যে কয়েকজন নেতা তৃণমূলকে সংগঠিত করার কাজে সার্বক্ষণিক আত্মনিয়োগ করেছেন তার মধ্যে আনিসুর রহমান দীপু ও জাহাঙ্গীর আলম অন্যতম। কেন্দ্রীয় নেতারা নারায়ণগঞ্জের এসে সকল আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে খোঁজ খবর নিয়ে কেন্দ্রে রিপোর্ট করেছেন। নারায়ণগঞ্জে থেকেই মহানগর ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। আরো কয়েকটি অঙ্গসংগঠনের কমিটিও ভেঙে দেয়ার কথা হচ্ছে। তাছাড়া জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিও সম্মেলনের মাধ্যমে ভেঙে দেয়ার কথা হচ্ছে। সিটি নির্বাচনে নেতাদের আত্মনিয়োগের উপর ভিত্তি করে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের হাতে সাংগঠনিক দায়িত্ব দেয়া হবে। সেখানে যে রাজসিক প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের জাত চেনানো আনিসুর রহমান দীপু ও জাহাঙ্গীর আলম যে বিশেষ অবস্থানে থাকবেন সে কথাই বলাই বাহুল্য।


