নোবেল বিজয়ী আইরিশ লেখক ও নাট্যকার জজ বার্নার্ডশ একবার বলেছিলেন জ্ঞানীরা শিখে দেখে আর বোকারা শিখে থেকে। বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, হিন্দিতে রয়েছে সামাঝদারকে লিয়ে ইশারায় কাফী অর্থাৎ বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। কথাগুলো মনে হলেও গত ১৬ জানুয়ারি শেষ হয়ে যাওয়া নাসিক নির্বাচন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এড. তৈমূর আলম খন্দকারের পরাজয় বরণও দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনাকে সামনে রেখে জাতীয় নির্বাচনে প্রতারিত পোড় খাওয়া একটি দল হচ্ছে বিএনপি।
দেশের জন সমর্থিত এ দলটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ছিল বর্তমান সরকার ও ইসির অধীনে কোন নির্বাচনে অংশ নিবেনা। একদিকে গুরুতর অসুস্থ দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদাকে সরকার আইনের অজুহাতে চিকিৎসার্থে বিদেশে যেতে না দেয়া,দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক জিয়া বিদেশে নির্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে লক্ষাধিক ভূতুড়ে মামলায় লাখ লাখ নেতা কর্মী বাড়ি ঘর ছেড়ে পলাতক। দলের জন্য একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ দেশের ক্লান্তিকালে কিসের নেশায়, কোন বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহব্বায়ক দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এড. তৈমুর আলম খন্দকার দলের সিদ্ধান্ত ও হাই কমান্ডারের নির্দেশ উপেক্ষা করে। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন অংশ নিলেন যা ছিল দলের প্রতি চরম আনুগত্যহীন তারই নামান্তর। বলা হচ্ছে বিএনপি ঘোষিত আন্দোলন সংগ্রাম তৈমুর আলমের বিরাট অবদান রয়েছে। তিনি জেল জুলুম অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এমন একজন পোড় খাওয়া মানুষ কতটা বাস্তবতা বিবর্জিত একজন স্বপ্নচারী মানুষ হলে কথিত অবৈধ সরকারের অধীন এবং প্রশাসনের প্রতিকূলে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করায় এর পিছনে রহস্যঘেরা প্রশ্নের উদয় হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে আইভী বিরোধী স্থানীয় এক ডাক সাইটে নেতাও তার পরিবারের পক্ষ থেকে সুযোগ বুঝে তৈমুর আলমকে নির্বাচনে দাড়ানোর টুপ দিয়েছিল। তাকে আর্থিক ও লোক সরবরাহ করে তাকে সর্বাত্মক সহায়তার ও নিশ্চিয়তা দেয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয় কাউন্সিলর প্রার্থী তার ভাইকে বিজয়ী করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। নিশ্চিয়তা খবরে তার আনুগত এক কাউন্সিলর প্রার্থীকে ও নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। বন্দরের সদ্য নির্বাচিত ৪ জন ইউপি চেয়ারম্যানকে তৈমুরের নির্বাচনী প্রচারণায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগ প্রধান-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকবার তৈমুর আলমের প্রশংসা করে ছিলেন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞাহীন তৈমুর তা বিশ্বাস করে আপ্লুত ছিলেন তাই তার নির্বাচনী সভাগুলোতে বলে বসলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি আমার নির্বাচনী এলাকার ভোটার হতেন তা হলে তিনি আমাকেই ভোট দিতেন।
এ বক্তব্য তৈমুর আলমের রাজনৈতিক গভীরতা প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার দেউলিয়াত্বের প্রকাশ পেয়েছে। শেখ হাসিনা তৈমুরের প্রতি প্রশংসা ছিল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক ভাবে কনডেমন্ড করাই নামান্তর। তৈমুর একবারও চিন্তা করলেন না। আইভীকে ডেকে নিয়ে শেখ হাসিনা তাকে দলীয় নমিনেশন দেয়, তার নির্বাচন পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয় শক্তিশালী কমিটি করে দেন এমনকি কেন্দ্রীয় ভাবে শামীম ওসমানসহ সকল স্তরের নেতা কর্মীদের কঠোর নিদর্শনা দেন আইভীর পক্ষে কাজ করার জন্য। সেখানে তৈমুরের এ বক্তব্য-আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা সম্পর্কে তার অজ্ঞতারই পরিচায়ক। অতীতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে সরকার নিয়োগকৃত নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন যে ভূমিকা পালন করেছে, বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনে দিনের ভোট নিশিথরাতে করে ইসি ও প্রশাসন যে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছিল এতে সরকারের জন্য দেশ বিদেশে যে কালিমা লিপ্ত হয়েছিল আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তা থেকে উদ্ধারের জন্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের তকমা সরকারের জন্য প্রয়োজন ছিল।
নির্বাচনোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে তৈমুর বলেন ইভিএম এর মাধ্যমে তাকে হারানো হয়েছে তথা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আগামী নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনে করার পক্ষে নাসিক নির্বাচনকে দেশ বিদেশে বৈধতার হাতিয়ার হিসাবে সরকার ব্যবহার করবেন, অথচ সবাই জানে শুধু তারও গৃহ পালিত কিছু দল ছাড়া দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ নির্বাচন ইভিএম ব্যাবহারের বিরোধিতা করেছেন। তাহলে একদল সচেতন মানুষ হিসেবে কোন আশার কোহেলিকায় ইভিএম নির্ভর নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও নির্বাচনের কয়েকদিন পূর্বে থেকেই তৈমুর আলমের নির্বাচন পরিচালনার প্রধান সমন্বয়ক ও কর্মীদের পুলিশ পেন্ডিং মামলা ও হয়রানির নামে নেতা কর্মীদের গ্রেফতার শুরু করেছিল পুলিশ। নির্বাচন সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিলনা বলে তৈমুরের অভিযোগ করেছিলেন।
এ অভিযোগে তৈমুরের কি নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোর হুমকি দেওয়া উচিৎ ছিলনা? নাকি তিনি গায়বি ভোটে জিতার অপেক্ষায় ছিলেন। তৈমুর আলম তার নির্বাচনী প্রচারণায় তার নির্বাচনকে সামনে রেখে সদ্য বিদেশ ফেরত মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালকে পেলেও কোথাও মহানগরের সাবেক এমপি এড. আবুল কালাম, শামীম ওসমানকে পরাস্তকারী ক্যারিশমেটিক নেতা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন কোথায় নারায়ণগঞ্জের এক সময়ের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নাগরিক ঐক্যের এস এম আকরামকে পেলেও একদিনের জন্য ও নাগরিক ঐক্যের আলোচিত নেতা মাহামুদুর রহমান মান্নাকে তৈমুর তার নির্বাচনী প্রচারণায় শামিল করতে পারেননি।
কারণ তারা দলীয় রাজনৈতিক ও দলের নির্দেশনার প্রতি আনুগত্যশীল থাকায় এ নির্বাচনকে বৈধতা দিতে সজাগ ছিলেন। ২০১১ সালে নাসিক নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী তৈমুর আলমকে কৌশল ও বৃহৎ রাজনৈতিক কারণে নির্বাচনের কয়েক ঘন্টা আগে দলনেত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তাকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অন্যথায় তৈমুর নয়-আইভী নয় সেই নির্বাচনে শামীম ওসমান বিজয়ী হতেন। আবেগ প্রবণ তৈমুর আলম খন্দকার মানসিক ভাবে দলের এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। ক্ষুব্ধ তৈমুর আলম কেঁদে কেঁদে মিডিয়ার সামনে বলেছিলেন দল তাকে গোসল ছাড়াই কুরবানি করে দিয়েছে। ১৬ জানুয়ারি নাসিক নির্বাচন এবার সচেতন নাগরিকই তাকে গোসল দিয়েই কুরবানি করে দিয়েছেন।
লেখক : আইনজীবী/ সাংবাদিক।


