ত্বকী হত্যার ১০৭ মাস;বক্তারা:‘শামীম ওসমান আমাদের কাছে মশা’
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৮:০৪ এএম
মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১০৭মাস উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোক প্রজ্বালনের আয়োজন করে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।
# ঘুঘু দেখেছেন ঘুঘুর ফাঁদ দেখেন নাই : এড. মাসুম
# অসম্পূর্ণ অভিযোগপত্র কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না : রফিউর রাব্বি
সম্প্রতি ত্বকী হত্যাকাণ্ডের বিচারবিভাগীয় তদন্ত চেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমান। ২০১৩ সালে ত্বকী হত্যাকাণ্ডের পর এই প্রথম ত্বকী হত্যার বিচার নিয়ে কথা বলেন শামীম ওসমান। তবে হুট করে শামীম ওসমানের এমন দাবি প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের নেতৃবৃন্দ। তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১০৭মাস উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোক প্রজ্বালনের আয়োজন করে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। সেখানে এমপি শামীম ওসমানের কঠোর সমালোচনা করেন নেতৃবৃন্দ।
নারারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, ‘আমরা ১০৭ মাস যাবৎ ত্বকী হত্যার বিচার চেয়ে দাবী জানিয়ে আসছি। আজকে ৯ বছর পরে এসে শামীম ওসমান বললেন তিনিও ত্বকী হত্যার বিচার চান। তিনি বললেন ১০ জন বক্তা ৩ জন শ্রোতা কয়েক দিনের মধ্যে তারা আবার রাস্তায় নামবে। আমরাতো রাস্তায় নামবোই। আপনি শামীম ওসমান জানেন না কোথায় চলে গেছেন। আপনি ঘুঘু দেখেছেন ঘুঘুর ফাঁদ দেখেন নাই। আপনি বেশি বাড়া বাড়ি কইরেন না। বেশি বাড়াবাড়ি করা ভালো না। আপনি হাতির উপর উঠে নৌকা ডুবাতে চান। শামীম ওসমানের দিন ফুরিয়ে গেছে। আপনি অপেক্ষা করেন।
মাহবুবুর রহমান মাসুম শামীম ওসমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি মানুষের যন্ত্রণা দেখেন নাই। অসহায় মানুষের প্রতিবাদের ভাষা দেখেন নাই। শামীম ওসমান ক্ষমতায় থেকে বড় বড় কথা বলছেন। আপনি নারায়ণগঞ্জকে জিম্মি রাখার পাশা পাশি পরিবহন সেক্টরকে জিম্মি করে রেখেছেন। ভূমি দস্যুতার সাথে আপনি সম্পর্ক রেখেছেন। এই শহরকে অশান্ত করে রাখছেন আপনি। সেই আপনি ত্বকী হত্যার বিচার চাইলেন। আবার খুব টেকনিক্যালি বললেন প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই।
আপনি একবারওতো বললেন না তদন্তকারী সংস্থা আপনারা এই হত্যার বিচার শেষ করুন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে আপনি কোন দিকে দৃষ্টিপাত ঘুরাতে চাচ্ছেন আমরা তা জানতে চাই শামীম ওসমানের কাছে। মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, শামীম ওসমান আপনি আপনার ভাতিজাকে ত্বকীকে খুনের আদেশ দিলেন, খুন হলো, কিন্তু সেই খুনের ইমোশনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীকে বায়েষ্ট করলেন।
আবার এখন এসে নতুন নাটক মঞ্চে বললেন আপনি ত্বকী হত্যার বিচার চান। আরেক সময় বলেন আমি ত্বকী হত্যা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন। আপনার বুকের পাঠা এত নাই। ত্বকী হত্যার বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে তথ্য উপস্থাপন করবেন সেই সাহস আপনার নেই। তদন্তকারী সংস্থা র্যাব বলে, ১১ জনের ক্লিন মিশন তক্বীকে হত্যা করেন। আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে ত্বকীকে হত্যা করা হয়। তার গাড়ি দিয়ে ত্বকীর লাশ শীতলক্ষা নদীতে ফেলা হয়।
নাসিক নির্বাচনের ৬ দিন আগে এসে বলেছেন আপনি নৌকার পক্ষে। আপনি আপনার প্রতিটি কর্মীকে তৈমূর আলম খন্দকারের হাতির পক্ষে কাজ করিয়েছেন। আবার আপনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নাকি কাকে দিয়ে তৈমূর সাহেবকে প্রার্থী করেছে। এখানে প্রধানমন্ত্রীকে টানেন কেন? প্রধানমন্ত্রী মেয়র আইভীকে নৌকার মনোনয়ন দিয়েছে। আমি আমার চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি যিনি ত্বকী হত্যার বিচার বন্ধ করেছেন তিনি ত্বকী হত্যার বিচারের নির্দেশ দিবেন। অপেক্ষা করেন ত্বকী হত্যার বিচারের এখন শুধু সময়ের অপেক্ষে। এই সরকারের আমলে ত্বকী হত্যার বিচার হবে।’
তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি ওসমান পরিবারকে অনেক দিয়েছেন। কিন্তু এই পরিবার আপনাকে কিছুই দেয় নাই। এবার নারায়ণগঞ্জবাসীকে দেখুন। এই শহরের মানুষের দিকে তাকান। শেষ পর্যন্ত তারা হাতির উপর ভর করেছে। আমরা আপনার কাছে ত্বকী হত্যার বিচার চাই।
আপনি ত্বকী হত্যার বিচারের নির্দেশ দেন। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। আইনের মাধ্যমে আমরা ত্বকী হত্যাকারীদের ফাসি চাই। শামীম ওসমান বলেছেন, আমরা ৩ জন। আপনার বড় ভাইতো বিকেএমই’র সভাপতি, তিনি নির্দেশ দিলে তিন লাখ শ্রমিক চলে আসে। ত্বকীকে হত্যার করার নারায়ণগঞ্জ সহ সারাদেশের ছাত্র সমাজ, সচেতন মানুষ জেগে উঠেছে। স্বাধীনতার পর এমন আন্দোলন আর হয় নাই। মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন আপনি বুঝেন না। ভাড়াটিয়া ক্যাডার এনে আপনি বড় বড় কথা বলেন। আমরা এগুলো পছন্দ করি না। শামীম ওসমান আপনি ভালো হয়ে যান। আমরা আপনাকে ঘৃণা করি। সর্বশেষ আমরা যত দিন পর্যন্ত ত্বকী হত্যার বিচার না হবে ততদিন পর্যন্ত আমরা আন্দোলন করে যাবো।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, প্রতিপক্ষকে দমাতে হত্যা-গুমের সাথে জড়িতদের বিভিন্ন সময় সরকার উৎসাহিত ও পুরস্কৃত করায় তা দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এখন বহির্বিশ্বের সমালোচনা ও নিষেধাজ্ঞায় সরকার মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে। সরকার দেশে নিয়ন্ত্রিত বিচার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। বেছে বেছে বিচার সংগঠিত করে। যে ঘটনা বা অপরাধের সাথে সরকার দলীয় ব্যক্তিবর্গের সংশ্লিষ্টতা নাই তারা কেবল সে সব বিচারই করে; অপরাধী দলীয় বা সরকার সংশ্লিষ্টদের বিচারে তাদের আগ্রহ নেই, বরং তা অঘোষিত ইন্ডেমনিটিতে বন্ধ করে রাখছে। কিন্তু যে সব ঘটনা সরকারের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, সরকার বাধ্য হয়ে সে সবের বিচার করে। যেমন সাবেক সেনা সদস্য সিনহা হত্যা তার উদাহরণ। এইটি আমাদের বিচার ব্যবস্থার দেউলিয়াপনার চিত্র।
তিনি বলেন, নয় বছর হতে চললো ত্বকী হত্যার বিচার বন্ধ হয়ে আছে। তদন্ত শেষ হয়ে অভিযোগপত্র তৈরী করে রাখার পরেও তা আদালতে পেশ করা হয় নাই প্রধানমন্ত্রীর অনিচ্ছার কারণে; এবং তার নির্দেশেই এ হত্যার বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আইনকে কেবলি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে গিয়ে সরকার গোটা বিচার-ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উল্টোপথে সরকার চলতে চলতে বিচার-ব্যবস্থার সাথে সাথে নির্বাচনী-ব্যবস্থা, মানুষের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার, গণতন্ত্র সবকিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে। তিনি বলেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ঘাতক সুরতান শওকত ভ্রমর, বলেছে আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে আজমেরী সহ ১১ মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। র্যাব তাদের সংবাদ সম্মেলনেও তা উল্লেখ করেছে, আমরা চাই অভিযোগপত্র দেয়ার আগে আজমেরী ওসমানকে গ্রেপ্তার করে ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি নিয়ে অভিযোগপত্র পূর্ণাঙ্গ করা হোক। কারণ আমরা বরাবরই বলে এসেছি, শামীম ওসমানের নির্দেশে আর ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান তাদের লোক জন নিয়ে ত্বকীকে হত্যা করেছে। অসম্পূর্ণ অভিযোগপত্র কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব কবি হালিম আজাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বলেছেন ত্বকীকে কারা হত্যা করেছে তিনি তা জানেন, তা হলে কেন নয় বছরেও বিচার হবে না। তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে বলেন আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা হয়ে কখনো ঘাতক, খুনীদের পক্ষ নিতে পারেন না। আপনাকে ত্বকী হত্যার বিচার করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানি শংকর রায়ের সভাপতিত্বে সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদের সঞ্চালনায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন নিহত ত্বকীর পিতা ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, সদস্যসচিব কবি হালিম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এড. মাহাবুবুর রহমান মাসুম, সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি প্রদীপ ঘোষ বাবু, এড. জিয়াউল ইসলাম কাজল, সিপিবি’র জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, বাসদের জেলা আহ্বায়ক নিখিল দাস, ন্যাপ জেলা সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, গণসংহতি আন্দোলন জেলার নির্বাহী সমন্বয়ক অঞ্জন দাস, ওয়ার্কার্স পার্টি জেলা সভাপতি হাফিজুর রহমান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি মাহমুদ হোসেন, সামাজিক সংগঠন সমমনার সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক সভাপতি দুলাল সাহা ও খেলাঘর জেলা সাধারণ সম্পাদক ফারুক মহসীন প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নগরীর শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দু’দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী শাখা খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জানায়, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। এর পর থেকে ত্বকীর হত্যার বিচার শুরু ও চিহ্নিত আসামীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোকপ্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।


