# ঋতু ছিলেন গর্ভবতী
# ঋতুর ভাই বিয়ে করেছেন মুসলিম নারী
# হিন্দু-মুসলিম বিয়ে নিয়ে পরিবারে ছিল বিরোধ
সব যেন এক ঝটকায় শেষ হয়ে গেল নিতাইগঞ্জের ইসলাম স্টোরের কর্মচারী রামপ্রসাদ চক্রবর্তীর। সকালে যখন নিতাইগঞ্জ ডালপট্টি বিকেদাস রোডের স্বপন কুমারের ছয়তলা ফ্ল্যাটের বাসা থেকে বের হন তখনও ভাবতে পারেননি দুপুরেই স্ত্রী আর অন্তঃসত্ত্বা মেয়ের মরদেহ দেখতে তাকে দুপুরেই আবার বাসায় ফিরতে হবে। এক নিমিষেই দুনিয়া যেন অন্ধকার হয়ে এসেছে রামপ্রসাদের।
গতকাল বিকেলে ভাড়া বাসা থেকেই তাঁর স্ত্রী রুমা চক্রবর্তী (৪২) ও মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা ঋতু চক্রবর্তীর (২২) রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসি (তদন্ত) আজিজুলের নেতৃত্বে ঘটনাস্থল থেকে জোড়া খুনের অভিযোগে জোবায়েরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় জোবায়ের কাছ থেকে ৪ টি ছুঁড়ি ও ২টি হ্যান্ড গ্লাভস উদ্ধার করে।
জোড়া খুনের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে বলে যুগের চিন্তাকে জানান জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। তিনি বলেন, জোবায়েরই মা-মেয়েকে হত্যা করেছে বলে ইতিমধ্যে স্বীকারোক্তি দিয়েছে পুলিশের কাছে। তবে কেন হত্যা করা হয়েছে তা এখনো সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি।’
নিহত ঋতুর বাবা ও রুমার স্বামী রাম প্রসাদ যুগের চিন্তাকে জানান, ‘আমি আড়াইটার পরে আমার স্ত্রী রুমার ফোনে কল করি তখন জোবায়ের ফোন রিসিভ করে বলে, তোর টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার কই আছে বল? এই বলেই ফোন কেটে দেয়। এই ঘটনা যে হবে আমি বুঝতেও পারি নাই। আমাদের সাথেতো কারো কোন শত্রুতা নেই।
যে আমার স্ত্রী ও মেয়েকে মার্ডার করেছে তাকে আমি এর আগে দেখিও নাই। তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্কও নেই। কেন আমার স্ত্রী সন্তানকে মার্ডার করা হলো আমি তার বিচার চাই। এই বলে তিনি কান্নায় ঢলে পরেন। খানিক পর আবার বলেন, আমার এটা কি হলো।
আমিতো সব হারিয়ে ফেললাম। আমারতো আর কিছুই রইলোনা। আমার মেয়ের পেটে সাত মাসের বাচ্চা ছিল। এই খুনি আমার মেয়েকে খুন শুধু করেনি একটি নিষ্পাপ বাচ্চাকেও মেরে ফেলেছে। তাকে দুনিয়ার মুখও দেখতে দিল না। আমি খুনি জোবায়েরের ফাঁসি চাই। আমি ন্যায় বিচার চাই।’
নিতাইগঞ্জ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শংকর সাহা যুগের চিন্তাকে জানান, আমার ভবনে হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পাই। তখন ডাকাত ভেবে গেটের ফটক আটকে দেই। এসময় নিচে এক নারী রক্তাক্ত বটি হাতে নিয়া বের হতে চাইলে তাকেও বের হতে দেয়া হয় না। পরে সদর থানা পুলিশকে খবর দিলে তারা এসে ২ জনের মরদেহ উদ্ধার করে।
গ্রেপ্তারকৃত জোবায়ের কাছ থেকে ৪ টি ছুঁড়ি ২ টি হ্যান্ড গ্লাবস পাওয়া যায়। সে প্রথমে রাম প্রসাদের স্ত্রী রুমাকে খুন করে, পরে তার মেয়েকে হত্যা করে। আমার মনে হচ্ছে এটা পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে কি কারনে এই ঘটনা ঘটেছে তা জানি না।
স্থানীয়রা জানান, জোড়া খুনের অভিযোগে আটক জোবায়ের নগরীর পাইকপাড়া এলাকার আলাউদ্দিনের ছেলে। জোবায়ের নিতাইগঞ্জে লবণের ব্যবসা করে। এর আগে বিভিন্ন খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলো সে। সে ছুঁড়ি, হ্যান্ড গ্ল্যাভস নিয়ে এই বাসায় প্রবেশ করে বলে জানান এলাকাকাবাসী।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি তদন্ত আজিজুল বলেন, ‘আমি খবর পেয়ে ৩ টার সময় ঘটনাস্থলে যাই। গিয়ে দেখি ভবনের নিচে ফারজানা নামে এক নারী দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের ছয় তলায় গিয়ে দেখি একই রুমে মা মেয়ের দুই নারীর লাশ পড়ে আছে। নিহত ঋতুর শরীরে তিনটি ছুঁড়ি বিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তার মা রুমার শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ছুঁিড়র ৬টি আঘাত পাওয়া যায়।
একটি রুমে আসামী জোবায়ের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। পরে তার হাতে গ্ল্যাভস পরা ছুঁড়ি নিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিকভাবে সে স্বীকার করে এই দুই নারীকে তিনিই মার্ডার করেছেন। তিনি আরও জানান, রক্তাক্ত বটি নিয়ে ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নারী রাম প্রসাদের ছেলে হৃদয়ের স্ত্রী ফারজানা। ফারজানার উপর যখন বটি দিয়ে আঘাত করা হয় তখন তিনি ধস্তাধস্তি করে তা হাতে নিয়ে না দৌঁড়ে নিচে বাসা থেকে নিচে নেমে আসে। তাকেও মেরে ফেলতে চেয়েছে জোবায়ের। সে অল্পতে নিজেকে রক্ষা করেছে।
’
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি শাহ জামান জানান, ‘আটক জোবায়ের বেলা আড়াইটার দিকে নিহতদের বাসায় প্রবেশ করে টাকা পয়সা লুণ্ঠন করতে যায়। তাকে বাধা দেয়া হলে তখন তিনি মা ও মেয়েকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে খুন করেন। প্রথমে নিহত রুমার উপর আঘাত করে তাকে বাচাতে নিহত রুমার মেয়ে ঋতু এগিয়ে আসলে তাকেও ছুঁড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। যা জোবায়ের নিজেও স্বীকার করেছে।’
জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানান, মা মেয়ের হত্যার ঘটনায় জোবায়ের নামে একজন গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইতি মধ্যে তিনি খুনের ঘটনায় হত্যার স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তবে কেন হত্যা হয়েছে তার জন্য তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তবে বাড়ির মালিক স্বপন কুমার দাসের ছেলে শোভন কুমার দাস জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘রামপ্রসাদ চক্রবর্তী আমাদের বাড়িতে ছয় থেকে সাত বছর যাবৎ ভাড়া থাকেন। তার ছেলে হৃদয় চক্রবর্তী গত কয়েকদিন আগে মুসলিম পরিবারের একটি মেয়ে ফারজানাকে বিয়ে করেছে। যা মেয়ে ও ছেলে দুইজনের পরিবারই মেনে নিতে পারেনি। আমাদের ধারণা, ধর্মে পার্থক্য থাকায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।’


