বর্তমান সরকারই ত্বকী হত্যার বিচার করবে
পরিচয় প্রকাশ গুপ্ত
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২২, ০৭:৪৩ পিএম
অগ্নিঝরা মার্চ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর ত্বকী হত্যার মাস। আগামী ৬ মার্চ ত্বকী হত্যার নবম বর্ষপূর্তি হবে। নয় বছর আগে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ শহরের শায়েস্তা খান সড়কের বাড়ি থেকে বের হয়ে সূধীজন পাঠাগার যাওয়ার পথে ও লেভেলের ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী অপহৃত ও নিহত হন। দুদিন পর ৮ মার্চ ত্বকীর ক্ষতবিক্ষত লাশ শহরের চারগোপের শীতলক্ষ্যা সংযোগ খালে ভেসে উঠে।
এ লাশ উদ্ধারের পর এ হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবীতে নারায়ণগঞ্জ শহরে সর্বস্তরের মানুষের যে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা ছিল সর্বকালের সেরা গণমানুষের স্বতঃস্ফ’র্ত প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। সে সময় এহত্যার প্রতিবাদে শীতলক্ষ্যার নৌকার মাঝিরাও পারাপার বন্ধ রেখেছিল এবং শহরে বাই সাইকেলও চালাতে দেয়া হয়নি।
এদিকে, এ হত্যাকান্ডের পর দায়েরকৃত মামলার বাদী নিহত ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি যা বলেছিলেন তা হলো, ২০১১ সালে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হয়ে নির্বাচন পরিচালনা করার অপরাধে এমপি শামীম ওসমানের নির্দেশে তার ভাতিজা আজমেরী ওসমান ও পুত্র অয়ন ওসমান এবং তাদের বাহিনী ত্বকীকে অপহরণ করে শহরের আল্লামা ইকবাল সড়কে অবস্থিত আজমেরী ওসমানের আস্তানায় নিয়ে যায়।
সেখানে আজমেরী ওসমান সহ ১১ জন মিলে পিটিয়ে ত্বকীকে হত্যা করে। এ হত্যাকান্ডের পর গ্রেফতারকৃত অন্যতম খুনী সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে দেয়া তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে এসব তথ্য প্রদান করেছিল। মূলতঃ ত্বকীর কোন অপরাধ ছিল না। তার পিতা রফিউর রাব্বি আইভীর হয়ে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় পিতাকে শিক্ষা দিতে পুত্রকে হত্যা করা হয়।
এ পর্যন্ত এ মামলায় পুলিশ ও র্যাব মিলে মোট ৫ জনকে গ্রেফতার করলেও এখনো এ মামলার চার্জসীট প্রদান করা হয়নি। এ কারণে মূলতঃ এ মামলার বিচার প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। উল্টো, গ্রেফতারকৃত আসামীরা জামিনে মুক্তি পেয়ে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। এরা একাধিকবার ত্বকী হত্যার বিচার দাবীতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে হামলা করেছে।
সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারী অভিযুক্তরা শহরের একটি দৈনিক পত্রিকা অফিসে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পত্রিকাটির বিরুদ্ধে হামলাকারীদের অভিযোগ, ত্বকী হত্যার বিচার দাবীতে পত্রিকাটিতে ২০১৪ সালে এ হত্যা মামলার তদন্তকারী র্যাব কর্মকর্তার দেয়া খসড়া চার্জসীটটি পুনর্মুদ্রন করে হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবী করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ৮ বছর আগে উক্ত র্যাব কর্মকর্তা এ খসড়া চার্জশীটের কপি সাংবাদিকদের সরবরাহ করে বলেছিলেন, অচিরেই আদালতে এ মামলার চার্জশীট প্রদান করা হবে। বাস! ঐ পর্যন্তই। আজ পর্যন্ত ঐ চার্জসীট আর আলোর মুখ দেখেনি।এদিকে নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যার বিচার নিয়ে দুটি পক্ষ সৃষ্টি হয়েছে এবং দু’পক্ষে এ স্পর্শকাতর মামলাটি নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে।
এক পক্ষে রয়েছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকীমঞ্চ, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট, কয়েকটি বাম সংগঠন এবং সমাজের কিছু প্রগতিশীল ও প্রতিবাদী মানুষ। অপরপক্ষে রয়েছে, ৯ বছর ধরে বিচার এড়িয়ে দায়মুক্ত থাকা খুনীরা, মুরুব্বী হিসেবে তাদেরকে ছায়াদানকারী সরকারী দলের কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং খুনীদের অনুগত বিশাল একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। বিচার দাবিকারীদের গো, বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা মাঠ ছাড়বে না। ওদিকে দায়মুক্ত থাকা খুনীদের গো, ত্বকী হত্যার বিচারদাবি করা যাবেনা।
প্রয়োজনে পিটিয়ে বিচারদাবি ভুলিয়ে দেওয়া হবে। তা সে ব্যক্তি হোক বা পত্রিকা হোক। এদিকে ত্বকী হত্যার নবম বর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে বিচারদাবিতে দুই সপ্তাহ ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহন করা হয়েছে। ৬ই মার্চ সকালে ত্বকীর কবর জিয়ারত ও সেখানে মিলাদ মাহফিল করা হবে। পরদিন ৭ মার্চ বিকেল ৩টায় শেখ রাসেল পার্কে শিশু সমাবেশ চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা ও পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হবে।
৮ মার্চ বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদীর ৫ নং খেয়াঘাটে সাংষ্কৃতিক জোটের উদ্যোগে সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ত্বকীকে নিয়ে নির্মিত একটি প্রামান্য চলচিত্র প্রদশন ও আলোর ভাসান অনুষ্ঠিত হবে। ১১ মার্চ বিকেলে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ১৮ মার্চ বিকেলে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরের বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে সপ্তম জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কণ ও রচনা প্রতিযোগিতা পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হবে।
এসব অনুষ্ঠান ও সমাবেশে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে ত্বকী হত্যার বিচার দাবি করবেন। এদিকে গতকাল ২ মার্চের পত্র-পত্রিকায় ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে দেশের ২৬ জন বিশিষ্ট নাগরিকের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। বিবৃতিতে তারা বলেন, আগামী ৬ মার্চ ত্বকী হত্যার ৯ বছর পূর্ণ হবে। অথচ আজও এ হত্যার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়ে বিচারকাজ শুরু হয়নি।
আমরা এতে উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ। অথচ হত্যাকাণ্ডের এক বছর না যেতেই তদন্তকারী সংস্থা র্যাব কেনো, কখন, কোথায়, কারা এবং কিভাবে ত্বকীকে হত্যা করেছে তা সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ করেছিলো। তদন্ত শেষ করার দীর্ঘদিন পরেও এ হত্যার অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করা হয়নি। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের বিচার পাওয়ার অধিকার সংবিধান নিশ্চিত করেছে।
অপরাধীর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দুর্বলতা প্রদর্শণ ও বিচার ব্যবস্থায় বৈষম্য শুধু আইনের ব্যত্যয়ই নয়, তা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও পরিপন্থী। কোনো হত্যার বিচার বন্ধ করে রাখা কখনোই কাম্য হতে পারেনা। আমরা অচিরেই ত্বকী হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের দাবী জানাচ্ছি। বিবৃতিতে সাক্ষর করেন, রবিন্দ্র গবেষক আহমদ শফী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. সঞ্জিদা খাতুন, মোস্তফা মনোয়ার, শিল্পী রফিকুন নবী, রামেন্দ্র মজুমদার, অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. সাহদীন মালিক, মালেকা বেগম, খুশি কবির, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ প্রমুখ।
এ বিষয়ে আলাপকালে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব কবি হালিম আজাদ বলেন, ত্বকী হত্যার ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এবার নারায়ণগঞ্জ শহরে বিভিন্ন সংগঠন ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে দু সপ্তাহ ব্যাপী নানা কর্মসূচী পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। আমরা আশা করি ত্বকী হত্যার বিচার হবে। বর্তমান সরকারই এ বিচার শুরু করবে এবং এ বছরই এ বিচার শুরু হবে।


