টানবাজারে প্রতিদিন কোটি টাকার বন্ড সুতা বিক্রি!
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২২, ০৬:৪৩ পিএম
# সুতার ব্যবসার আড়ালে বন্ড সুতার শক্তিশালী বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট চক্র
# পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তারা এই সেক্টর থেকে মাসোয়ারা পাচ্ছেন
দেশের অন্যতম সুতার বাজার হলো নারায়ণগঞ্জের টানবাজার। টানবাজারে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট চক্র প্রতিদিন অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার বন্ড সুতা বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিনই ট্রাক যোগে টানবাজারে আসছে তাঁতীদের জন্য শুল্ক রেয়াত সুবিধায় আনা সুতা। আর টানবাজার থেকে সেই সুতা ছড়িয়ে যাচ্ছে সাড়া দেশে।
গত দুই বছর আগে বেশ কয়েকবার তাঁতী সমিতির নামে আমদানি করা বন্ডের সুতা অবৈধ ভাবে বিক্রি করায় টানবাজারে অভিযান চালিয়েছিল ডিবি পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ প্রশাসনের কতিপয় কিছু অসাধু কর্মকর্তারা এই সেক্টর থেকে মাসোয়ারা পাচ্ছেন। আর রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানা গুলো পুনঃ রপ্তানির শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ পায়।
একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এসব শুল্কমুক্ত কাঁচামাল বা পণ্য এনে অবৈধভাবে অপসারণের মাধ্যমে টানবাজারে বিক্রি করছে। প্রশাসনকে মাসোয়ারা দিয়ে ম্যানেজ করেই টানবাজারে সুতার ব্যবসার আড়ালে গড়ে উঠেছে বন্ড সুতার শক্তিশালী বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট চক্র।
সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জে খোলা বাজারে অবৈধভাবে বন্ডের সুতা বিক্রির অভিযোগে আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ২২ টন সুতা জব্দ করেছিল ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট কার্যালয়। শহরের সুতারপাড়া এলাকায় সাদ ট্রেডার্স ও আজাদ ট্রেডার্সের গুদামে এ অভিযান চালিয়েছিলেন সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের সিআইডি পুলিশ ও কাস্টমস বিভাগ এ অভিযানে সহায়তা করেছিল। এর আগে টানবাজারে বন্ডের সুতা অবৈধ ভাবে বিক্রি করা হলেও কোন সংস্থাই অভিযান পরিচালনা করেনি। অথচ প্রতিদিনই বিক্রি হচ্ছে বন্ডের সুতা। এদিকে রেয়াত সুবিধায় আমদানি করা সুতার সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে দেশীয় সুতার মিলগুলোয় সুতার স্তুপ জমছে।
শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা সুতায় সয়লাব টানবাজারের সুতা আড়ৎ গুলোতে। অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে বন্ড সুবিধার আমদানি করা সুতা। আর এই প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান। তবে টানবাজার ছাড়াও দেশে আরো বেশ কয়েকটি স্থানে বন্ডের সুতা বিক্রি হচ্ছে।
সূত্রে আর জানা গেছে, স্বাধীনতার পর দেশে তাঁত শিল্পের ব্যাপক প্রসার লাভ করে।
সে সময় তাঁত শিল্পের সুতা সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত স্পিনিং মিল ছিল না। দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল তাঁতিদের বিটিএমএ’র পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতা সরবরাহ করা হতো, যা দিয়ে তাঁতীরা গামছা, লুঙ্গি ও তোশকের কাপড়সহ মোটা কাপড় বানাতেন। তাঁতী সমিতির নেতাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তারা সুতার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
যদিও তাঁতের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু তাঁতীদের নাম ভাঙিয়ে দেদার সুতা, রাসায়নিক আমদানি করছেন তারা। এক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দিতে আমদানি করা সুতার দামও কম দেখানো হচ্ছে।
একদিকে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার কারণে সরকার ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে খোলাবাজারে বিক্রির কারণে সেখান থেকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অথচ নারায়ণঞ্জের গরিব অসহায় তাঁতীরা প্রকৃতপক্ষে সরকারি এসব সুবিধা পাচ্ছেন না।
টানবাজারের বেশ কয়েকজন সুতা ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টানবাজারের সুতা ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে বন্ডের সুতা খোলা বাজারে আসা। বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানায় ব্যবহারের জন্য আনা এলসির সুতা খোলা বাজারে বেচাকেনা হওয়ায় টানাবাজারে দেশী সুতা ব্যবসায়ীরা মার খাচ্ছেন। বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোয় যে সুতা উৎপাদন হয়, তা দিয়ে চাহিদা মেটানোর পর আরো উদ্বৃত্ত থাকে।
কিন্তু কতিপয় আসাধু ব্যবসায়ী ব্যাক টু ব্যাক এলসির জন্য আনা সুতা চোরাইপথে টানবাজারে বিক্রি করছে। আর ব্যাক টু ব্যাক এলসির সুতা মানের দিক থেকে কিছুটা উন্নত হওয়ায় তাঁতীরা তা ব্যবহার করছেন। ফলে দেশী মিলগুলো লোকসান গুনছে।
তারা আরও জানান, টানবাজারের ব্যবসায়ীরা মূলত বিভিন্ন স্পিনিং মিলের সুতা বেচাকেনা করে থাকে। কিন্তু মিলগুলো সরাসরি ক্রেতা প্রধান এলাকায় শো-রুম খুলে ব্যবসা করায় আমাদের কিছুটা বিপাকে পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে বন্ডের সুতা খোলা বাজারে চলে আসায় দেশিয় সুতা মার খাচ্ছে। বন্ডের সুতা খোলা বাজারে বেচাকেনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কিন্তু তারপরও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বন্ডের সুতা খোলা বাজারে এনে বিক্রি করে দিচ্ছে। তবে আমরা বিষয়টি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বারবার অবহিত করা হলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও তারা ক্ষোভ প্রকার করেন।


