‘সাহস হারালে চলবে না, এ শহরে একজন আইভী আপনাদের পাশে আছে’
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২২, ০৬:৪৩ পিএম
ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগম মেধাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে মেয়র
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, ‘আমাদের সমাজে নারীদের এত বাধা-বিপত্তি তাতে অনেক সময় পিছিয়ে পড়তে হয়। কিন্তু সাহস হারালে চলবে না, মমতাজ বেগমের কথা চিন্তা করবেন এবং নারায়ণঞ্জ শহরে একজন আইভী আছে আপনাদের পাশে, এইটা মাথায় রাখবে।
পুরুষ মানুষদেরও কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাঝখান দিয়ে, রাজনৈতিক বাধার মধ্য দিয়ে আগাতে হয়। সততার কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। অন্যায় যেন কখনও না করি। অন্যায়কে যেন আমরা না বলতে পারি।’ তিনি বলেন,‘যে অসৎ সে সত্য কথা বলতে ভয় পায়। অন্যায় কাজ করলে সাহস থাকে না। সাহস নিয়ে অকপটে সত্য কথা বলতে হবে। দেশপ্রেম আমাদের ভেতর জাগাতে হবে।
প্রীতিলতা, বেগম রোকেয়া, মমতাজ বেগমের মতো সাহসী হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা মাথায় রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নারীদের অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। এজন্য তাকে স্যালুট দিতে হবে।’ রোববার (১৩ মার্চ) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগম মেধাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এইসব কথা বলেন।
এই অনুষ্ঠানে ১৬ জন শিক্ষার্থীকে মমতাজ বেগম মেধাবৃত্তি প্রদান করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘আগে মেয়েরা কথা বলতে পারতো না। রিকশায় চড়লে চারদিক ঢেকে রাখতো, ঘোড়ার গাড়ি ঢেকে রাখা হতো।
সেই সময় একজন নারীর লেখাপড়া করা, প্রতিবাদী হওয়া কিন্তু সহজ ব্যাপার ছিল না। এখনও আমরা প্রতিবাদ করতে ভয় পাই। অথচ সেই সময় এত কঠিন মুহুর্তে নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে মমতাজ বেগম প্রখর দেশপ্রেম নিয়ে প্রতিবাদে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘কেন জানি মনে হয়, আগের চেয়ে হালকা ব্যক্তিত্ব আর ভালোবাসা নিয়ে এখন আমরা ঘুরে বেড়াই। যাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এত শক্তিশালী সেইসাথে আমরা তুলনা করলে মনে হয় আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। আমরা হারিয়ে যেতে চাই না। আমার স্কুলের শিক্ষার্থীদের গোছানো কথাবার্তা শুনে আশাবাদী হই। আশা করি, সবাই সত্য ও ন্যায়ের পথে আসবে।’
ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগম সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে মেয়র আইভী বলেন, ‘আমি যখন মর্গ্যান স্কুলে পড়তাম তখন মমতাজ বেগমের কথা জানতাম না। আমি পৌরসভার চেয়ারম্যান হওয়ার পর নাগরিক কমিটির কাছ থেকে জানতে পারি। অনেকেই হয়তো তাঁর সম্পর্কে জানতো না। কেননা তাঁর ইতিহাস সংরক্ষিত ছিল না। পরে একটি রাস্তার নাম মমতাজ বেগমের নামে নামকরণ করার আলোচনা উঠলে আমি এক বাক্যে রাজি হয়ে যাই।
অন্য সকলেও এতে রাজি হন। পরে স্কুলের পাশের রাস্তাটিই মমতাজ বেগমের নামে হয়। আমার নিজের মায়ের নামও মমতাজ বেগম।’ সিটি মেয়র বলেন, ‘মর্গ্যান স্কুলের জমি তৎকালীন পৌরসভা দিয়েছে। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল, নারায়ণগঞ্জ কলেজ, তোলারাম কলেজসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জায়গা দান করেছে।
কিন্তু কালেভদ্রে এমন হয়ে যে, ম্যানেজিং কমিটিতে তৎকালীন পৌরসভা বা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউকেই রাখা হয়নি। আমি মনে করি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এইটা রাখা উচিত। আমি কাউকে সম্মান না জানালে ভবিষ্যতে আমাকেও কেউ সম্মান জানাবে না।’
এ সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, ‘কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় কিন্তু কেউ রাজনীতিবিদ হতে চায় না। মেধা-বুদ্ধি দিয়ে এই দেশের সেবায় কাজ করতে চাই সেইটা কেউ বলতে চায় না। কারণ রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটি নেতিবাচক আলোচনা আছে। সবাই কিন্তু এক রকম না। তাই তোমাদের চিন্তা-ভাবনাও পরিবর্তন করতে হবে।
নারীরা যেখানে গিয়েছে, সেটা হোক রাষ্ট্রপ্রধান বা ঝাড়ুদার, সব জায়গায় নিজ মেধা ও বুদ্ধি দিয়ে স্ব স্ব অবদান রেখেছে। পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করে আগাতে হয়। এই পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে আমাদের জায়গা করে দিতে হবে। আমরা আমাদের বাবা, ভাই, সন্তানদের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। পুরুষরা আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ নয়। তাদের পাশে নিয়েই আমাদের হাঁটতে হবে।
আমাদের পথটা তাদেরই করে দিতে হবে।’ আইভী বলেন, ‘এই মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। তবে আমি মনে করি, প্রতিদিনই আমাদের নারী দিবস। যে নারী ঘরে থাকেন তিনিও অনেক কাজ করেন। নারীরা জন্মগতভাবে যোদ্ধা। যে নারী সন্তানকে জন্ম দিতে পারে সে পিছিয়ে থাকতে পারে না। সাহসের সাথে কাজ করতে হবে। তোমাদের ডিকশনারি থেকে না শব্দটি উঠিয়ে দিতে হবে।
’ মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এই সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগমের জ্যেষ্ঠ নাতনি ডা. ফারজানা ইসলাম রূপা, মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগমের কনিষ্ঠ দৌহিত্র ওয়াসীম ইসলাম বাবু, কনিষ্ঠ নাতনি রিজওয়ানা মনির গোপা, মর্গ্যান গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক লায়লা আক্তার,
মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আহসান হাবীব, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক কবির ইউ চৌধুরী। নারায়ণগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম ১৯৫২ সালে স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে ভাষা আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। এজন্য তিনি ২০১২ সালে মরনোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন।


