নিতাইগঞ্জে চাঁদাবাজিই শহরে যানজটের অন্যতম কারণ
পরিচয় প্রকাশ গুপ্ত
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২২, ০৮:১৮ পিএম
# শ্রমিকরা অবিলম্বে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন চায়
চারদিন আগে শহরে যানযটের কারণ ও তার নিরসনের উপায় নিয়ে যুগের চিন্তা পত্রিকা শহরের বিশিষ্টজনদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছিলো। সে বৈঠকে যানজটের কারণ হিসেবে বিভিন্নজন বিভিন্ন সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন।
কারো মতে যানজটের কারণ শহরে ব্যাটারী চালিত তিন-চাকার গাড়ী তথা রিকশা, মিশুক ও অটো রিকশা, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ যাত্রীবাহি বাসের পথিমধ্যে দুই নং রেলগেট, কালির বাজার, চাষাঢ়া, রাইফেল ক্লাব ও চানমারী এলাকায় যাত্রী তোলা, শহরের বিভিন্ন মোড়ে রিকশা, ভ্যান, বেবি ট্যাক্সী ও ট্যাক্সী স্ট্যান্ডের অবস্থান। কারো মতে ফুটপাত দখলদার হকার, আবার কারো মতে নগরবাসীর অসচেতনতা। একজন বক্তা শহরে নিত্য যানজটের জন্য নিতাইগঞ্জ ট্রাক স্ট্যান্ডকে দায়ী করেছেন। তার মতে নিতাইগঞ্জে ট্রাকগুলি এক লাইনে থাকলে শহরে যানজট হবেনা।
তবে এ শহরে যানজটের অন্যতম কারণ যে ট্রাক তা বলাই বাহুল্য। শতবর্ষী পণ্য বাজার নিতাইগঞ্জকে কেন্দ্র করেই এ শহরে ট্রাকের আসা যাওয়া। প্রতিদিনই চাল, ডাল, গম, আটা, ময়দা, চিনি, তেল ইত্যাদি পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নিতাইগঞ্জে ট্রাক আসে। আবার নিতাইগঞ্জ থেকে বিভিন্ন জেলার উদ্দ্যেশে ট্রাক ছেড়ে যায়। ট্রাক মালিক, ট্রাক শ্রমিক ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বাইরের জেলা থেকে একটি ট্রাক নিতাইগঞ্জ এসে পণ্য খালাস করেই খালি ট্রাক ফিরে যায়না। বেশির ভাগ সময়ই নিতাইগঞ্জ থেকে আরেকটি ট্রিপ ধরে সে গন্ত্যব্যে ছুটে চলে। একটি ট্রাকের আসা এবং পণ্য খালাস করে আরেকটি ট্রিপ ধরে পণ্য বোঝাই করে চলে যাওয়ার মাঝে ট্রাকটি সাত আট ঘন্টা থেকে একদিন পর্যন্ত স্ট্যান্ডে অবস্থান করে।
এ সময় প্রতিটি ট্রাককে সাত ধরণের চাঁদা দিতে হয়। যেমন পার্কিং’র চাঁদা ১০০ টাকা, নাইট গার্ড বা লাইন ম্যানের চাঁদা ১০০ টাকা, মালিক সমিতির চাঁদা ৩০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়নের চাঁদা ৩০ টাকা। আবার ট্রিপ ধরে শহর থেকে বেরিয়ে যেতে বুক স্লিপের চাঁদা দিতে হয় ৮০০ টাকা। ট্রাক ড্রাইভার যদি দাললের মাধ্যমে ট্রিপ ধরে তাহলে তাকে ভাড়ার অতিরিক্ত ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা দালালকে চাঁদা দিতে হয়। এক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে যার থেকে যা লওয়া যায়। এরপর রয়েছে সিটি কর্পোরেশনের চাঁদা। সিটি করপোরেশন বাইরের ট্রাক থেকে ৫০ টাকা এবং স্থানীয় ট্রাক থেকে ৩০ টাকা চাঁদা আদায় করে। এভাবে এক একটি ট্রাক মাল খালাস করে ট্রিপ ধরে চলে যেতে তাকে ১৫৬০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। আবার ট্রিপ দালালের মাধ্যমে ধরলে চাঁদার পরিমাণ আরও কয়েক’শ টাকা বেড়ে যাবে। নিতাইগঞ্জে এই দালালদের সংখ্যা ৬০ জন। এরা সবাই ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের লোক।
মূলত সব ধরনের চাঁদাই তোলে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন নিয়োজীত লোকেরা। চাঁদার টাকা জমা হয় ইউনিয়নের ক্যাশিয়ারের কাছে। বর্তমানে নিতাইগঞ্জে ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে বলে ট্রাক শ্রমিকরা জানিয়েছেন। তারপরও প্রতিদিন অর্ধ শতাধিক ট্রাক এখান থেকে ট্রিপ নিয়ে বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। ভরা মৌসুমে ট্রাক যায় প্রতিদিন শতাধিক।
অভিযোগ রয়েছে, চাঁদার টাকা ইউনিয়ন সভাপতি সেক্রেটারিসহ নেতারা ভাগ-যোগ করে খায়। এই মন্দার বাজারেও প্রতিদিন নিতাইগঞ্জে চাঁদা ওঠে ৭৮ হাজার টাকা। মাসে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ টাকা।
সাধারণ শ্রমিকদের অভিযোগ, এ চাঁদার জন্যই নিতাইগঞ্জে যতো বিশৃঙ্খলা। লোড-আনলোড, গাড়ী পার্কিং ইত্যাদি নিয়েই সারাদিন ব্যাস্ত থাকে চাঁদাবাজরা। আর এই চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই যানজটের সৃষ্টি হয়। শ্রমিকদের নামে এখানে চাঁদা উঠলেও তা মূলত নেতাদের ভোগে লাগে। এসব নেতারা আবার অধিকাংশই বহিরাগত। সভাপতি সেক্রেটারি যারা হন তারা মূলত ট্রাক শ্রমিকই নন।
ক্ষমতাশীন রাজনৈতিক দলের কোটায় তারা এসে ইউনিয়ন দখল করেন। বিশাল এই চাঁদাবাজির টাকার ভাগ রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ প্রশাসন স্থানীয় মাস্তানসহ প্রভাবশালীরাই ভাগ করে খায়। শ্রমিকরা কিছুই পায়না। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। উনিশ বছর ধরে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নে কোনো নির্বাচন হয়না। ইউনিয়নের নেতৃত্ব প্রকৃত শ্রমিকদের হাতে এলে এখানে চাঁদাবাজি কমে যেত। একই সঙ্গে কমতো সড়কে বিশৃঙ্খলা ও যানজট। এ জন্য শ্রমিকরা অবিলম্বে ইউনিয়ন নির্বাচন চায়।এমই/জেসি


