সাংবাদিক স্টিকারের পরিচয়ে পরিবহনে চাঁদাবাজির মহোৎসব
বটুক লাল ভট্ট
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২২, ০৭:৩৭ পিএম
সাংবাদিক দের জাতির দর্পণ বলা হয়। সমাজের বিভিন্ন অন্যায়,অবিচার,অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার লেখনী এই খ্যাতি এনে দিয়েছে তাদের। কিন্তু এই জাতির দর্পনরাই যখন চাঁদাবাজির মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে তখন আর যাই হোক তাদের আর সাংবাদিক তথা জাতির দর্পন বলা চলেনা। প্রায় অর্ধকোটি মানুষের আবাসস্থল নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন অপরাধ সামনে নিয়ে আসার পরিবর্তে নিজেরাই বড়সড় অপরাধ করে বেড়াচ্ছেন সাংবাদিক নামধারী অপসাংবাদিকরা।
শহরে যেখানে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত গাড়ি প্রবেশ সম্পূর্ন নিষিদ্ধ সেখানে কিছু নামধারী সাংবাদিক তাদের নাম,পরিচয় ব্যবহার করে ষ্টিকার বিলিয়ে পরিবহনে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির মহৌৎসবে লিপ্ত আছে। আর এসব নামধারী অপসাংবাদিকদের ষ্টিকারযুক্ত গাড়ি বিনা বাধায় প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ জায়গায় চলাচল করছে।
গত কয়েকদিনের অনুসন্ধানে শহরের ২ নং গেইট, চাষাড়া,মেট্রোহল, কালির বাজার, ডিআইটি এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় সম্পাদক জাকির সাহেব এর“দৈনিক জনতা”, সম্পাদক আরিফ সাহেব এর “ টেলিগ্রাফ নিউজ ২৪.কম,সম্পাদক দিপু সাহেব এর “নিউজ স্বাধীন বাংলা.কম , সম্পাদক আব্দুল রিয়েল রাজা সাহেবের “ দৈনিক নগর সংবাদ”, সম্পাদক দেলোয়ার সাহেব এর “ নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ঐক্য পরিষদ”, এর ষ্টিকার সম্বলিত কয়েকশত ইজিবাইক। এছাড়াও প্রেস মিডিয়া, দ্যা ঢাকা বিডি এর মতো আরোও বেশ কিছু ষ্টিকারযুক্ত গাড়ি চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে।
এ নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, নামধারী ঐ সাংবাদিকরা প্রতিটি ষ্টিকার এর জন্য ইজিবাইক চালকদের কাছ থেকে প্রতি মাস এ ১৫০০ টাকা করে নিচ্ছে। যদি কোনো চালক সাংবাদিক এর ১০ টি ষ্টিকার বিতরণে সক্ষম হয় তাহলে উক্ত চালক এর জন্য তার কার্ড এর বাবদ মাসিক ফি নেয়া হয় না। অর্থাৎ ১০ টি কার্ড বিতরণে সক্ষম হলে ১ টি কার্ড এর টাকা সম্পূণ মওকুফ হয়ে যায়। এভাবে তারা চাঁদাবাজিকে আরোও ব্যাপকভাবে প্রসারের পরিকল্পনা চালাচ্ছে। উপরোক্ত সব সাংবাদিক প্রায় একইভাবে পরিবহনে চাঁদাবাজি চালাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক এর কার্ডধারী ইজিবাইক চালক যুগের চিন্তাকে জানান, আমি যেই সাংবাদিক এর কার্ড নিয়েছি সে ১০০ এর বেশি ইজিবাইকে এভাবে কার্ড দিয়ে মাসে ১৫০০ টাকা করে নিচ্ছেন। এই কার্ড দেখলে ট্রাফিক পুলিশ ও কমিউনিটি পুলিশ শহরে গাড়ি প্রবেশে কোনো বাধা দেয় না। যদি কোনো সমস্যায় পরি সাংবাদিক ফোন দিলে সমস্যার সমাধান হয়ে যায় ।
তিনি আরো জানায়, খুব পাওয়ারফুল আমার সাংবাদিক। এই ষ্টিকার দেখলে কোনো ট্রাফিক বাধা দেয় না। এতে করে জনমনে প্রশ্ন জাগে তবে কি যারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনে দায়িত্বরত তারাও এসব চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত? তারা কি ঐসব অপসাংবাদিকদের কাছ থেকে কোনো রকম সুবিধে নিয়ে এসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করছে।
এ ব্যাপারে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (এডমিন) মো. করিম যুগের চিন্তাকে জানান, সাংবাদিক ষ্টিকারযুক্ত কার্ড দিয়ে চাঁদাবাজি আগে আরোও ব্যাপক আকারে ছিল। আমি কয়েকমাস দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই এই সংখ্যা একেবারে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও অনেকটাই কমে গিয়েছে। আগে চাষাড়া মোড়, মেট্রোহলে কোনো চেকপোস্ট ছিলো না। এখন এখানে চেক পোস্ট হয়েছে। আমরা এখন এসব ইজিবাইক শহরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রনের জন্য অনেক বেশি তৎপর। মাঝে মাঝে এসব ষ্টিকার যুক্ত গাড়ি ধরলে সম্পাদক ফোন দেয়। তখন আমরা তাদের শহনশীলতা দেখিয়ে ছেড়ে দেই।
না ছাড়লে তারা এসে এটা সেটা নিয়ে প্রশ্ন করে আমাদের কাজে বাধাগ্রস্থ করে। কিন্তু বারবার আমরা ছেড়ে দিবোনা। আমরা এগুলো কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রন করবো। একটা মহল চায়না আমাদের চেকপোস্ট গুলো থাকুক । কিন্তু আমরা চেকপোস্ট রেখেছি। আমরা সাংবাদিকদের এসব পরিবহন চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রন করতে বদ্ধ পরিকর। তিনি আরোও বলেন আমাদের কোনো কমিউনিটি পুলিশ যদি এসব এ জড়িত থাকে আমরা সাথে সাথে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো।
সাংবাদিকদের অবৈধ ষ্টিকারযুক্ত ইজিবাইক অনুপ্রবেশ নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. জাহেদ পারভেজ চৌধুরী যুগের চিন্তাকে জানান, আমরা কোনো রোগীবাহী, ছাত্রবাহী অথবা খুব জরুরি কাজে কোনো ইজিবাইক শহরে ঢুকতে চাইলে তাদের ক্ষেত্রে আমরা শিথিল আচরণ করি। তবে সাংবাদিক ষ্টিকার ব্যবহার করে শহরে অনুপ্রবেশ নিয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না বলে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি আরোও জানান, এর আগে একজন আমাকে এ ব্যাপারে অবহিত করেছিল। তার কাছে এসব ষ্টিকার এর ছবি চাইলে সে দিতে পারেনি।
তিনি যুগের চিন্তা প্রতিনিধির কাছে এসব সাংবাদিকদের ষ্টিকার এর ছবি দেখতে চান। এবং আশ্বস্ত করেন এসব চাঁদাবাজির ঘটনা সত্যি হলে তিনি যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। তবে শহরবাসী ধারনা করছেন, এটা চোখে না পরার মতো কোনো ঘটনা নয়। এটা প্রকাশ্য এবং দীঘর্দিন ধরেই চলছে। এখন এ চাঁদাবজির কিভাবে ইতি টানে পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) সে দিকে চোখ রাখছেন শহরবাসী।এসএম/জেসি


