অবৈধ পরিবহন জব্দে কঠোর ডিসি; পরিবহন মাফিয়াদের অনীহা!
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২২, ০৫:৪০ পিএম
# বাস মালিকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন
# তালিকা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি : বিআরটিএ (এডি)
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ানো হয়েছে বাস ভাড়া। বাস মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করেই বাড়তি ভাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। কিন্তু ঢাকা নারায়ণগঞ্জ সড়কে বাসের চালক-সুপারভাইজারেরা সেই সিদ্ধান্ত মানছেন না। কন্তিু অভিযোগ রয়েছে বাস মালিকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন। এ নিয়ে প্রতিদিনই বাসের স্টাফদের সাথে যাত্রীদের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে, কোথাও হাতাহাতিও হচ্ছে।
এদিকে মাস দেড়েক আগে থেকে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক অবৈধ পরিবহন গুলোর বিরুদ্ধে অভিযান করে জব্দ করার কথা জানান। কিন্তু ডিসির এই অভিযানে নারাজ পরিবহন মালিকরা। যাদেরকে পরিবহন মাফিয়া বলে থাকেন মানুষ। কেননা তারাই অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে মানুষের পকেট কেটে থাকেন। নারায়ণগঞ্জে গণপরিবহনের নৈরাজ্য চরম আকার ধারণ করেছে।
সড়ক আইন ও সরকারের বিধিমালা উপেক্ষা করে জেলার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে গণপরিবহন পরিচালনা করছে বিভিন্ন সিন্ডিকেট। জেলার সড়কে চলাচলকারী বেশিরভাগ যানবাহনের ফিটনেস না থাকলেও রহস্যজনক কারণে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না এই সকল পরিবহনের বিরুদ্ধে। যদিও জেলা প্রশাসন অবৈধ পরিহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু এখনও কোনো অভিযান হয়নি।
সেই মাস দেড়েক আগের ঘোষণা আবারও জেলা প্রশাসক কঠোর ভাষায় বলেছেন, কিন্তু জেলা প্রশাসকের কথায় পরিবহন মালিকরা নারাজ। তারা চান না ডিসি, অবৈধ পরিবহন যেমন- ফিটনেস বিহীন বাস, লাইসেন্স বিহীন পরিবহন, রোড পারমিট বিহীন গাড়ি যে গুলো আছে সেগুলো জব্দ করার অভিযান পরিচালনা করেন।
গতকাল রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ বাস মালিকদের সাথে মতবিনিময় সভা করেন। এসময় জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, ‘আমরা চাই ঢাকা নারায়ণগঞ্জ সড়কে অনেক অবৈধ বাস রয়েছে যে গুলোর বিরুদ্ধে আমরা অভিযান পরিচলনা করে তা জব্দ করতে চাই। আর এই ব্যাপারে পরিবহন মালিকরা আমাদেরকে সহযোগিতা করুন। সেই সাথে আমরা চাই এখানে শান্তি-শৃঙখলা বজায় রেখে পরিবহন গুলো চলাচল করুক। অবৈধ পরিবহন যে গুলো আছে তা সরিয়ে ফেললে আপনারাও ভালো থাকবেন।’
অপর দিকে পরিবহন মালিকদের পক্ষে রওশন আলী জেলা প্রশাসকের এই অভিযানে অনীহা প্রকাশ করেন। কারন হিসেবে তিনি উল্লেখ্য করেন, ‘অনেক বাস আছে যেগুলোর রোড পামিট বা ফিটনেসের জন্য আবেদন করা আছে সেগুলো যেন ধরা না হয়। তার এই কথায় জেলা প্রশাসক, ‘না করে দেন এবং প্রশ্ন তুলেন এগুলোর এখনো অনুমোদন নেই তাহলে কেন জব্দ করা হবে না।’
এসময় বন্ধন পরিবহনের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বলেন, ‘ম্যাজিষ্ট্রেট অভিযান পরিচালনা করে যেন বাস ড্রাইভারদের জরিমানা না করেন।’ কিন্তু তার এই কথার উত্তরে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আপনার কথায় আমরা চলবো না। আপনারা পরিবহন মালিকরা যদি আমাদের সহযোগিতা না করেন তাহলে আইন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিবো। এখানে এসে কেউ গায়ের জোর দেখিয়ে কথা বললে হবে না।’
এর আগেও অবৈধ পরিবহন গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়র কথা জানান ডিসি মঞ্জুরুল হাফিজ। কিন্তু তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় আইনের তোয়াক্কা না করে জেলাজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ ফিটনেস বিহীন যানবাহন। শুধু তাই নয়, অনেক পরিবহনের রুট পারমিটও নাই। আবার নিজেদের ইচ্ছেমত অবৈধ স্ট্যান্ড বানিয়ে যাত্রী-উঠা নামা করাচ্ছে পরিবহন মালিকরা।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নারায়ণগঞ্জ বিভাগের তথ্যমতে, গত ১৬ জুন জেলা প্রশাসন ও বৈধ পরিবহন মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন। সেই সভায় এক সপ্তাহের মধ্যে সকল মালিকদের বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে ফিটনেসসহ লাইসেন্সকৃত পরিবহনের তালিকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এক সপ্তাহ পর ২৬ জুন শহরে অবৈধ পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযান হবে জানিয়ে ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ। ২৩ জুন তালিকা সম্পন্ন করার কথা থাকলেও এখনো লাইসেন্সকৃত পরিবহনের তালিকা প্রস্তুত করেনি নারায়ণগঞ্জের বিআরটিএ বিভাগ।
জেলার যাত্রী অধিকার ফোরামের অভিযোগ, যথাযথ আইনের প্রয়োগ না থাকায় সড়কগুলোতে ফিটনেস বিহীন যানবাহন দেদারসে চলাচল করছে। এতে দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনা ও যাত্রী সাধারণের ভোগান্তি বাড়ছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কর্তৃপক্ষের মনিটরিং করার কথা থাকলেও এ ধরনের কার্যক্রম দেখা যায়না বললেই চলে। ফলরূপ, নিত্যদিনের দূর্ঘটনার জন্য এসব ফিটনেস বিহীন যানবাহনসহ লাইসেন্স বিহীন অদক্ষ চালক অনেকাংশেই দায়ী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সড়কে প্রশাসন কিংবা বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি না থাকায় জেলার সড়কগুলোতে বেশিরভাগই ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করছে। কোনো কাগজপত্র ছাড়াই ফিটনেসবিহীন এসব যানবাহন চালাচ্ছে লাইসেন্সবিহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকরা।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংকরোড, চিটাগাংরোড-নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা পুরাতন সড়কে এসব যানবাহন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এছাড়া চাষাঢ়া-আদমজী-চিটাগাংরোড রুটে দুরুন্ত পরিবহন ও চাষাঢ়া-মুক্তারপুর রুটে লেগুনা, মদনগঞ্জ-মদনপুর-ঢাকা, আদমজী-ঢাকা, চিটাগাংরোড-ঢাকা রুটে অসংখ্যক অবৈধ বাস, লেগুনা চলছে। সোনারগাঁও, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জ থেকে ঢাকামুখী বিভিন্ন পরিবহন চলছে। যার অধিকাংশের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই।
সড়কে চলাচল করলেও কাগজপত্র বিহীন পরিবহন থেকে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না। আবার এই সকল পরিবহনের যাত্রীরা চাহিদামত ভাড়া দিয়েও কাংখিত সেবা পাচ্ছে না। লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িতে বাধ্য হয়ে চলাচল করতে গিয়ে যাত্রীদের নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নারায়ণগঞ্জ বিভাগের সহকারি পরিচালক সৈয়দ আইনুল এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা পরিবহন কোম্পানির মালিকদের থেকে বৈধ পরিবহনের তথ্য সংগ্রহ করছি। তালিকা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। আর জেলা প্রশাসন থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এর মাধ্যমে ফিটনেস বিহীন, রুট পারমিট ছাড়া, লাইসেন্স ছাড়া পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমাদের দায়িত্ব বৈধ পরিবহনের তালিকা প্রস্তুতের। তালিকা প্রস্তুত হলে অভিযান করে অবৈধ পরিবহন জব্দ করা হবে ‘ কিন্তু কবে অভিযান পরিচালনা হবে তা জানাননি।
উল্লেখ্য, গত ১৬ জুন বিআরটিএ এর নারায়ণগঞ্জ বিভাগের সহকারি পরিচালক অবৈধ পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযান প্রসঙ্গে বলেন, গত ১২ জুন থেকে আমরা ফিটনেস বিহীন, রুট পারমিট ছাড়া, লাইসেন্স ছাড়া পরিবহন বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বৈধ পরিবহন মালিকদের সাথে বিআরটিএ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনে সভা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ বৈধ পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা সভায় বলেন, ‘যেকোন ভালো কাজের জন্য ত্যাগ করতে হয়। নারায়ণগঞ্জে পরিবহনকে সুশ্ঙ্খৃল করতে সকলকে একত্রে চেষ্টা করতে হবে। লোভ একটু কম করতে হবে।’ এন.এইচ/জেসি


