অনলাইন জুয়ায় ঋণগ্রস্থ হয়ে বাসায় চুরি, দেখে ফেলায় নানীকে হত্যা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:১৩ পিএম
অনলাইনের জুয়া খেলে ঋনী হয়ে গিয়েছিলো রাকিব। তাই তার মায়ের স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা চুরি করেছিলো সে। চুরির সময় তার নানী আয়শা বেগম (৬১) দেখে ফেলায় নানীকে হত্যা করে রাকিব (২৫)।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসি আই পানির কল এলাকায় ঘটা এ হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে পিবিআই। এ ঘটনায় মামলা করেছিলেন নিহতের মেয়ে নাসরিন আক্তার। মায়ের করা মামলায় এখন ছেলে-ই আসামী।
পিবিআই এর নারায়ণগঞ্জ অফিসের পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম সোমবার দুপুরে সাইনবোর্ড এলাকায় পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
এ সি আই পানির কল এলাকায় আট কক্ষ বিশিষ্ট নিজস্ব টিন শেড ভবনে নিহত আয়শা বেগম, তার মেয়ে নাসরিন আক্তার, নাসরিন আক্তারের দুই ছেলের বউ শান্তা ও ছোঁয়া ও রাকিব নামের সর্ব কনিষ্ঠ ছেলে বসবাস করে।
নাসরিন আক্তারের স্বামী উজ্জ্বল রাশেদ খান দুই বছর আগে মারা গেছেন। বড় দুই ছেলে রাসেল খান (৩২) ও পাপ্পু খান (২৮) দেশের বাইরে বসবাস করেন। হত্যার ঘটনার তিন-চারদিন আগেই দুই ছেলের স্ত্রী তাদের বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলো।
পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘটনার দিন বিকেলে নাসরিন আক্তার তার ভাসুরের বাড়িতে কোরআন তালিমে যান। রাত সাড়ে নয়টায় তিনি বাসায় ফিরে দেখেন বাসার গেইটের সিটকিনি ভেতর থেকে লাগানো। এ বাড়িতে খোরশেদা নামের একজন গার্মেন্টস কর্মীও বসবাস করেন। ভাড়াটিয়া খোরশেদা, তার মা আয়েশা ও তার ছেলে রাকিব বাসায় থাকার কথা।
তিনি অনেকক্ষন ডাকাডাকি করলেও কেউ বাসার গেইট খুলে দেয়নি। এসময় তিনি তার ছোট ছেলে রাকিবকে ফোন দিলে রাকিব তিন-চার মিনিটের মধ্যে এসে পেছনের দেয়াল টপকে গেট খুলে দেয়। তিনি ভেতরে ঢুকে দেখেন তার মায়ের লাশ মায়ের কক্ষে পড়ে আছে। আর তার কক্ষ তছনছ করা। সেখান থেকে স্বর্নালংকার চুরি হয়েছে।
তিনি ধারণা করেন কোনো দুর্বৃত্ত তার মাকে হত্যা করে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা ও প্রায় ছয় লাখ পয়তাল্লিশ হাজার টাকা মুল্যের সাতভরি সাত আনা স্বর্নালঙ্কার চুরি করেছে। এ ব্যাপারে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করে।
পিবিআই ঘটনার তদন্ত করতে নেমে জানতে পারে নাসরিনের ছেলে রাকিব গার্মেন্টসে চাকরি করলেও সে উচ্ছৃঙ্খল। সে অনলাইনে জুয়ায় আসক্ত। ব্রাক ব্যাংক থেকে ষাট হাজার টাকা ঋন নিয়ে সে শোধ করতে পারছে না।
এ থেকে পিবিআই তাকে সন্দেহ করে। সে যে গার্মেন্টে চাকরি করে সেখানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ঘটনার দিন সে কাজে যায়নি। প্রযুক্তির মাধ্যমে জানতে পারে যে, ঘটনার দিন সে বাসায় বা বাসার আশেপাশে ছিলো।
১৭ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতার করে ঘটনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সে হত্যার কথা স্বিকার করে। সে জানায়, অনলাইনে জুয়া খেলে সে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়ে। ব্রাক ব্যাংক থেকে নেয়া ঋন শোধ করতে পারছিলো না। তাই সে নিজ বাসায় চুরি করার পরিকল্পনা করে।
ঘটনার দিন গার্মেন্টসে না গিয়ে সে সন্ধা সাতটায় বাসায় ঢুকে। বাসায় ঢুকেই বাড়ির গেইট বন্ধ করে দেয়। যাতে বাইরে থেকে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। তার মায়ের কক্ষের তালা ভেঙ্গে প্রবেশ করে আলমারির তালা ভেঙ্গে এক ভরির একটি স্বর্নালঙ্কার নেয়। তবে তালায় যাতে তার আঙ্গুলের ছাপ না পড়ে এজন্য সে আঙ্গুলে গার্মেন্টসের ঝুট পেঁচিয়ে নেয়।
আরো স্বর্ণ নেয়ার জন্য সে যখন খোঁজাখোঁজি করছিলো তখন তার নানী আয়শা বেগম এসে যায়। তার নানী বাসায় থাকবে এটা সে আশা করেনি। তার নানী সকালে তার ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলো। রাকিবের ধারনা ছিলো সে সেখানেই আছে। আয়েশা বেগম রাকিবকে চুরি করতে দেখে ফেলে তাকে কয়েকটি চড় দেয়।
নানী চুরি করতে দেখে ফেলায় সে তার নানীকে হত্যা করে। নানীর গলায় যাতে আঙ্গুলের ছাপ না থাকে সেজন্য নানীকে সে গার্মেন্টসের ঝুট গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করে। কোলে করে তুলে লাশ তার নানীর ঘরে রেখে আসে। এরপর টাকা, চেইন, ভাঙ্গা তালা গার্মেন্টস ঝুট দিয়ে পেঁচিয়ে বাড়ির পেছনের দেয়াল টপকে বের হয়।
চাষাড়ায় এসে তালাটি হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ঝুট দিয়ে পেঁচিয়ে ড্রেনে ফেলে দেয়। যাতে তার হাতের ছাপ কেউ না পায়। এরপর সে বাড়ির আশে পাশে থেকে পরিস্থিতি দেখতে থাকে।
রাত সাড়ে নয়টায় তার মা তাকে ফোন দিয়ে জানান, বাড়ির গেট ভেতর থেকে বন্ধ। তিনি ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন না। মায়ের ফোন পেয়ে সে বাড়ির সামনে এসে মায়ের সহায়তার ভান করে পেছনের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে গেইট খুলে দেয়। পরে সে চুরি করা চেইনটি চল্লিশ হাজার টাকায় কালিরবাজারে নিয়ে বিক্রি করে।
পুলিশ তার দেখিয়ে দেয়া ড্রেন থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট আড়াল করতে ও হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ঝুটের একাংশ ও ভাঙ্গা তালা উদ্ধার করে। এবং বাসা থেকে নানী চলে আসায় নিতে না পারা স্বর্নালংকার উদ্ধার করেছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাকিব হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট কাজী মোহাম্মদ মোহসেন এর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বর্তমানে সে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে রয়েছে। এন.হুসেইন/জেসি


