চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য রোধ এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ৬৪ জেলার প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশ। এই তালিকায় পিছিয়ে নেই ঢাকার নিকটবর্তি জেলা নারায়ণগঞ্জ। পুলিশের তালিকায় মোট তিন হাজার ৮৪৯ চাঁদাবাজের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে রয়েছে ৫০ জনের তালিকা। এছ্ড়াাও ছোটখাটো পাতিনেতা থাকলেও তাদের নাম তালিকার বাইরে। তবে রাজনৈতিক মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে নারায়ণগঞ্জের চাদাঁবাজ কারা? কারে চাঁদাবাজির সাথে জড়িত রয়েছে। যদিও প্রশাসন তা জানেন বলে মনে করেন নগরীর সচেতন মহল। তবে বিরোধী দল থেকে চাদাঁবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবী উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরের ১২টি স্পটে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হত আওয়ামী লীগ শাসনামলে। যা মাসে দাঁড়ায় ৩ কোটি টাকা। যা গডফাদারখ্যাত শামীম ওসমানের গুন্ডাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতো। ২০২৪ এর ৫ আগষ্টে আওয়ামী লীগের সাঙ্গপাঙ্গরা পালিয়ে গেলে তা এখন হাত পরিবর্তন করে বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলছে। তাছাড়া প্রশাসন, পুলিশ, ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীসহ পেশাদার চাঁদাবাজদের আসকারায় এই অর্থ তোলা হয়। শহরের সবচেয়ে বেশি চাঁদা তোলা হয় চাষাঢ়া গোল চত্বর থেকে। এই মোড়েই রয়েছে ৬ টি অবৈধ স্ট্যান্ড। চাষাঢ়া মোড় সোনালী ব্যাংক শাখার সামনে সিএনজি স্ট্যান্ড, সুগন্ধ্যা বেকারি, শান্তনা মাকের্ট, রাইফেল ক্লাবের মোড়, সরকারি মহিলা কলেজ সংলগ্ন এবং কলেজ রোডের সামনে থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময় চাঁদা তুলতেন নুরু মিয়া ও তার ছেলে সুজন হোসেন। তারা চাদাঁ তুলে সাবেক সাংসদ শামীম ওসমানের খলিফা চাদাঁবাজ জাকিরুল আলম হেলালের দরবারে এনে টাকা জমা দিত। এই চাঁদার সিংহভাগ শামীম ওসমান ও প্রশাসন পেত। যা বর্তমানে বিএনপির নেতারা এবং প্রশাসনের কর্তারা পেয়ে থাকেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাষাঢ়া মোড়ের প্রায় হাজার খানেক পরিবহন থেকে দৈনিক কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা চাদাঁ উত্তোলন করত শামীম ওসমানের সাঙ্গপাঙ্গরা। এই একটি স্পট থেকেই মাসে ৯০ লাখ টাকা চাঁদা আসত তাদের। আওয়ামী লীগের নেতা জাকিরুল আলম হেলালের নেতৃত্বে এখানে ২০ জনের একটি চক্র চাঁদা তুলতেন বিভিন্ন বাস পরিবহন থেকে। এজন্য যাত্রীদেরকেও ভাড়া গুণতে হত বেশী। এছাড়া পঞ্চবটি স্ট্যান্ড থেকে হুমায়ুনসহ ৫ জনের একটি চক্র দৈনিক প্রায় লাখ খানেক টাকা তুলে বেড়াতেন। এই স্ট্যান্ড শহরের বিসিকের সাথে একটি জনবহুল স্ট্যান্ড হওয়ায় প্রায় ৫’শ থেকে ৭’শ যান চলাচল করে। এই স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন হুমায়ুন নামের এক ব্যক্তি ১ লাখ টাকার উপরে চাঁদা উত্তোলন করতেন। যার ভাগ ওসমান সম্রাজ্যের ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রয়াত সাইফুল্লাহ বাদল, সেক্রেটারি শওকতসহ থানা পুলিশও পেত। এই স্ট্যান্ড থেকে মাসে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন। বর্তমানে এই স্ট্যান্ডটি বিএনপি লোকেরা তুলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সব কিছু মিলিয়ে চাদাঁবাজদের হাত বদল হলেও চাদাঁবাজি বন্ধ হয় নাই।
সম্প্রতি বিএনপি সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ প্রশাসন সারাদেশে তালিকা তৈরী করেন। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই সাড়াশি অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার আহবান নারায়ণগঞ্জের বিএনপির শীর্ষ নেতাদের।
পুলিশের তথ্য মতে, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সড়ক, হাটবাজার, বালুমহাল, বাস-টেম্পো স্ট্যান্ড, নৌঘাট, মাছ বাজার, ভ্রাম্যমাণ কাঁচাবাজার, সরকারি লিজকৃত জমিতে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পাইকারি আড়ৎ এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, তালা ঝুলিয়ে দেওয়া কিংবা নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটায় তারা।
পুলিশের তালিকাভুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের পরিচয়ও বদলে ফেলে। একপর্যায়ে তারা নতুন ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং চাঁদা আদায় করতে শুরু করে।
সূত্র জানায়, চাঁদাবাজির মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতা ও দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের কাছেও পৌঁছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই চক্র প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেলা পুলিশের এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাঠপর্যায় থেকে গোয়েন্দা তদন্তের ভিত্তিতে চাঁদাবাজদের এ তালিকা করা হয়েছে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।”


