বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসতেই আবারও ডেঙ্গু নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে নারায়ণগঞ্জে। প্রতিবছরের মতো এবারও এডিস মশাবাহিত রোগটির বিস্তারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত বছর জেলায় ডেঙ্গুতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৃত্যু জনমনে এখনো ভীতি ধরে রেখেছে। জনস্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, আগাম প্রস্তুতি না নিলে পরিস্থিতি এবারও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
গত বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকা, অপরিষ্কার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্টদের অব্যবস্থাপনা, সেইসাথে মানুষের অসচেতনতার কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার দ্রুত বেড়ে যায়। এতে করে অল্প সময়ের মধ্যেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে। ফলে সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখেই এবার আগাম সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন।
গত বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সময় নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজন রাজনীতিবিদকে ফগার মেশিন নিয়ে রাস্তায় নামতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব কার্যক্রমের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে অনুসারীরা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করছেন, এসব উদ্যোগ মূলত রাজনৈতিক ফ্রেমিংয়ের অংশ যেখানে দৃশ্যমানতা থাকলেও কার্যকারিতা সীমিত।
নগরীর নিতাইগঞ্জ, খানপুর, চাষাঢ়া ও ফতুল্লা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মাঝে মধ্যে ফগিং করা হলেও তা নিয়মিত নয় এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই পরিচালিত হয়। ফলে মশার উপদ্রব কমে না, বরং কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
এমনকি ফগার মেশিনের ওষুধ উড়ন্ত মশার কিছুটা দমন হলেও মশার লার্ভা ঠিকই থেকে যায়। যা মুহুর্তে বংশবিস্তার করে ফেলে। ফগিং কার্যক্রমের চেয়ে মশার উৎসস্থল ধ্বংসে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে জানান স্থানীয়রা।
সেই সাথে জেলায় ডেঙ্গুর ভয়াবহতার আরেকটি বড় দিক ছিল গত বছরের স্বাস্থ্যসেবার সংকট। নারায়ণগঞ্জের ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল এবং ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত সিটের অভাবে অনেক গুরুতর রোগীও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে অস্থায়ীভাবে বিছানা করে চিকিৎসা নিতে হয়েছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে এনে দেয়।
চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে আগাম প্রস্তুতি, অতিরিক্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। এ জন্য বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানির উৎসগুলো। যেমন ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, পানির ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। যদিও ডেঙ্গু প্রতিরোধে নজর রয়েছে বলে জানিয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, সিটি করপোরেশনে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেছিলেন, সামনের বৃষ্টির মৌসুম, ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে মশা নিধন করা কাজের তালিকায় প্রথমে থাকবে। তার প্রথম ৬০ দিনের বিশেষ কর্মসূচিতেও তিনি বিষয়টিকে অগ্রাধিকারে রেখেছেন বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত ফগিং ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ফগিং বা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিশেষ করে বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এদিকে সাধারণ মানুষও দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চায়। তাদের প্রত্যাশা, দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে গিয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে। সেইসাথে সময়মতো উদ্যোগ না নিলে গত বছরের মতো প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।