শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা। শহরের প্রাণকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু সড়ক তো বটেই, যানজটে থমকে গেছে নগরীর প্রধান সড়কগুলোও। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড কিংবা পুরাতন ডি.এন রোডেরও একই হাল! শহরের কালিরবাজার থেকে চাড়ারগোপ কিংবা ২নং রেলগেইট থেকে ডিআইটির প্রধান সড়ক; সেখানেও ধুকছিলেন চালক ও যাত্রীরা।
নগরবাসীর ভাষ্য, যানজটের তীব্রতায় এভাবে শহর অচল হয়ে যাওয়ার নজির কেবল শুক্রবারই নয়; বরং তা ঘটে চলেছে নিত্যদিনই। নগরীর অন্যতম প্রধান সমস্যায় রূপ নেয়া এই যানজটের বিষয়টি জেলার সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল মহলেও উত্থাপিত হয়েছে বারংবার। সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে বহু আগেই। চিহ্নিত এই সমস্যার সমাধানে কর্তাব্যক্তিরাও আশ্বাস দিয়ে গেছেন বহুবার। নেয়া হয়েছিল নানা উদ্যোগও। এতে ক্ষণিকের আশার আলো জাগালেও বাস্তবে আজও মিলেনি স্থায়ী সমাধান।
যানজটের মূল উৎসগুলো চিহ্নিত হওয়ার পরও কেন সমাধান মিলছে না- সেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। এতে অভিযোগের কাঠগরায় দাঁড় করানো হচ্ছে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের।
শহরে বিশৃঙ্খলা ও যানজটের বেশ কারণ ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে শহরের তিনটি প্রধান সড়কের উপরে বিদ্যমান রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ঘন-ঘন উঠা নামার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।
যদিও নগরবীদরা এই এই একটি মাত্র কারণকে দায়ি করতে নারাজ। কারো মতে, শহরের ভিতরে বাস টার্মিনাল ও বাস (গণপরিবহন) সমূহের অবাধ চলাচলের কারণে তীব্র হচ্ছে যানজট।
আবার অনেকে বলছেন, শহরের প্রধান সড়কগুলোর পাশে গড়ে উঠা বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মার্কেট, অফিস কিংবা অন্যান্য স্থাপনাগুলোতে পার্কিং স্পেস বাধ্যতামূলক হলেও সেই আইনের তোয়াক্কা করেননি ভবন মালিকরা। ফলে প্রধান সড়ক দখল করে গাড়ি পার্কিং করায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।
এছাড়াও ফুটপাত দখল, মোড়ে মোড়ে অবৈধ স্ট্যান্ড, শহুরে সড়কে ব্যাটারী চালিত রিকশা ও ইজিবাইকের অবাধ চলাচলের পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন নগরবাসী, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গরাও।
ফলে নগরীতে ভয়াবহ যানজট ও বিশৃঙ্খলা তৈরী হওয়ার কোনো কারণই অজানা নয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বা দায়িত্বশীল সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের কাছে। তবে চিহ্নিত হয়ে উঠা এসকল সমস্যাগুলো সমাধানে এখনো কার্যকরি বা স্থায়ী ভাবে ভূমিকা রাখতে পারেনি দায়িত্বশীলরা। চিহ্নিত সমস্যা সমাধানের ব্যর্থতার কারণ কী- তা নিয়েও প্রশ্নের পাশাপাশি ক্ষোভও রয়েছে সচেতন মহলের মাঝে।
তারা বলছেন, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পুলিশ প্রশাসন ও বিআরটিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মাঝে সমন্বিত উদ্যোগ বা সম্মিলিত সদিচ্ছার অভাব না থাকলে নারায়ণগঞ্জকে যানজট মুক্ত করা যেত আরো আগেই।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি দৈনিক যুগের চিন্তকে বলেন, যেসকল কারণে নগরীতে যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে বা চলাচল করাই দুস্কর হয়ে উঠেছে, সেই কারণগুলো সকলের কাছেই চিহ্নিত। এগুলো চিহ্নিত করার জন্য কাউকে পিএইচডি করতে হবে না। এখন প্রশ্ন হলো যেহেতু সমস্যা বা মূল কারণগুলো আমরা জানি, সেহেতু সমাধানটা হচ্ছে না কেন।
এখানে আমার মনে হয় যে, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। ধরুন ৩জন অঅন্তরিক হলে বাকি ৭জনই হয়তো আন্তরিক না। যারা আন্তরিক হচ্ছে না, হয়তো তারা বেনিফিটেট। এটা হোক হকার সেক্টর থেকে কিংবা পরিবহন সেক্টর থেকে। তারা এই সমস্যাগুলোকে পূঁজি করেই নিজেরা লাভোবান হচ্ছে। এতে নগরবাসীর মুক্তি মিলছে না।
আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সংগঠনের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা নূরউদ্দিন বলেন, ‘কি কি কারণে এই সমস্যা বিদ্যমান, সেই কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আন্তরিক না হয়, তাহলেতো সমাধান হবে না। নারায়ণগঞ্জ ও মানুষের স্বার্থে কর্মকর্তাদের উচিত আন্তরিকতার সাথে সম্মিলিত ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া।’
সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, ‘আমরা মনে করছি যে, যানজট নিরসন করতে গেলে পুলিশ, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এটা নিরসন করা সম্ভব না। এরজন্য শুধু উদ্যোগ নিলেই চলবে না, এখানে আন্তরিকতার সাথে সকলের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’