রিক্সা-অটোরিক্সায় ডিজিটাল নম্বর প্লেটে নগরীর যাটজটমুক্তে সুফল
হকারমুক্ত ফুটপাত গড়তে একাই সোচ্চার সাখাওয়াত
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
নগরবাসীর অন্যতম বিষফোঁড়া হিসেবে পরিচিত হকার সমস্যার সমাধান নিয়ে ফের জনমনে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত। গত এপ্রিল মাসে হকার উচ্ছেদে কঠোর ভূমিকা হাতে নেন সিটি প্রশাসক। সে সময় তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমান সংসদ সদস্য তার রাজনৈতিক সচিবসহ বিএনপি ও বিভিন্ন দলের রাজনৈতিকসহ সামাজিক নেতৃবৃন্দ হকারের বিপক্ষে নানা হুঙ্কার দিলে ও মাঠে নেই কেউ। সে বিষয়কে তোয়াক্কা না দিয়েই মাঠে একই সোচ্চার হয়ে উঠেছেন সিটি প্রশাসক। এদিকে গত রোববার নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত ও সড়ক হকারমুক্ত রাখতে আবারও উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন হকাররা। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু এতে ও পিছু ফিরেনি তিনি। হকারের বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা পালনের হুঙ্কার দেন। এর আগে শহরের যানজট নিরসনে এবং নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে রিক্সা-অটোরিক্সায় ডিজিটাল নম্বর প্লেট বিতরণ করে শক্ত অবস্থান নেয় নাসিক। এর সুফলও পাচ্ছে নগরবাসী। বর্তমানে হকার উচ্ছেদে নানামুখী কার্যক্রমও হাতে নেন তিনি। তবে পেছন থেকে একটি মহল কলকাঠি নাড়ালেও ঠিকই গন্তব্যের ঠিক কাছে পৌঁছে গেছেন নাসিক প্রশাসক। এবার আর কথা নয় কাজে প্রমাণ দিতে সকল জুজুর ভয় উপেক্ষা করে নিজেই মাঠে নেমেছেন প্রশাসক। বর্তমানে নিজ দলের নেতাদের সার্পোট না পেলেও নগরবাসীকে নিয়ে একাই চ্যালেঞ্জে লড়ছেন তিনি।
সূত্র জানিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করেও কোনোভাবেই তাদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া ২নং রেলগেইট থেকে চাষাড়া মহিলা কলেজ পর্যন্ত হকাররা এতটাই উশৃঙ্খল ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ উচ্ছেদ কর্মী, কর্মকর্তা, এমনকি সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক—কারো ওপরই হামলা চালাতে বা চড়াও হতে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করে না। সাখাওয়াতের এমন ঘোষণাকে ঘিরেই গত (২৫ অক্টোবর) রাতে হকার উচ্ছেদে মাঠে নামেন নাসিক প্রশাসক । এ সময় উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সামনেই লঙ্কাকাণ্ড ঘটানোর চেষ্টা করেন উস্কানিতে নামা একটি হকার নামের শ্রেণি। বিক্ষুব্ধ হকারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদকারী দলের সদস্যদের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান পৌছালে তাকে অবরুদ্ধ করে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করে হকার নামধারীরা। এমতা অবস্থায় অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রাত ৯ টায় শায়েস্তা খান সড়কে সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীরা কয়েকটি ভ্যান গাড়ির মালামাল জব্দ করেন। যাকে ঘিরে হকাররা ক্ষিপ্ত হয়ে যান। তার সকল হকারনামধারী কিছু ব্যক্তি একত্রিত হয়ে উচ্ছেদ কর্মীদের মারধর করতে থাকেন। সেই সাথে প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানকে ঘিরে ধরেন। তার উপর হামলার চেষ্টা করেন। তখন সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদকারী দলের সদস্য ও নেতাকর্মীরা সাখাওয়াতকে ঘিরে রাখেন। এদিকে বিশেষ করে একটি মহলের অসাধুভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার পায়তারা এবং কিছু স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহলের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। উচ্ছেদ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে ওই চক্রটি।
তা ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। দায়িত্ব নেওয়ার পর শহরের যানজট নিরসন ও ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এ নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। পরে হকার উচ্ছেদে যৌথ অভিযানও চালানো হয়। অভিযানের পর কয়েক দিন ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলেও ধীরে ধীরে আবারও হকাররা ফিরে আসেন। এ অবস্থায় তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য শহরের মূল সড়কের পাশে রেললাইনের খালি জায়গা নির্ধারণ করে সিটি করপোরেশন। সেখানে ইট বিছিয়ে বসার জায়গাও প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু হকাররা ওই জায়গায় যেতে রাজি নন। তাঁদের দাবি, রেললাইনের পাশে দেওয়া জায়গাটি স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নয়। ফলে একদিকে পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তুত জায়গা পড়ে আছে, অন্যদিকে শহরের সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত হচ্ছে না। সাধারণ মানুষকে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
‘হকারদের শেল্টারে রাজনৈতিক নেতারা’
সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীদের অভিযোগ, হকারদের একটি অংশ রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় অভিযান চালাতে গিয়ে তাঁরা বাধার মুখে পড়েন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেন এবং তাঁদের ফুটপাতে বসতে সহযোগিতা করেন। গত ৪ মে চাষাঢ়ায় হকার উচ্ছেদ অভিযানের সময় সিটি করপোরেশনের দুই কর্মচারীকে মারধর এবং তাঁদের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে হকারদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ রোববার রাতে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। এ ঘটনায় কয়েকজন হকারকে তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার তদবিরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে পরে হকার প্রতিনিধিরা থানায়ও বৈঠক করেন।
হকারদের নেতা রনি জানিয়েছে, রেললাইনের পাশে পুনর্বাসন করার কথা বলা হলেও আমাদের সাথে কোনো আলোচনা করা হয়নি। আমাদেরকে সেখানে বসার কথা বলেছে। আমরা বলেছি আমাদেরকে সেখানে কতদিনের জন্য বসতে দিবে। বসার পর দুই মাসের মধ্যে আবার তুলে দেওয়া হলে আমরা তখন কই যাবো। রেলওয়ে থেকে সেখানে বসার কোন অনুমতি দিয়েছে কিনা এমন কোন কাগজ আমাদের দেওয়া হয়নি। আমরা জানিয়েছি আমরা এভাবে বসবো না। যতদিন আমাদের পুনর্বাসনের জন্য নিদিষ্ট কোন জায়গা না দেওয়া হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আমরা বিকাল ৫টার পর শৃঙ্খলা ভাবে ফুটপাতে বসতে চাই।
এর আগে গত (১৩ এপ্রিল) শহরের সকল সড়কের ফুটপাতের হকারদের উচ্ছেদ করে সিটি করপোরেশন। যদিও আগে থেকে ঘোষণা থাকায় সেদিন কোন হকার বসেনি। এর পর প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত শহরের ফুটপাত ছিল পুরো ফাঁকা। তবে হকাররা ফুটপাতে ফেরার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় দেন দরবার করতে থাকেন। তবে এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা ছিলো খুবই কঠোর। সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীরা প্রতিনিয়ত হকার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আসছিলেন। ফুটপাতে হকার পেলেই তাদের মালামাল জব্দ করা হতো। সেই সাথে হকাররাও ফুটপাতে বসতে পারতো না। এমতা অবস্থায় ঈদুল আযহাকে ঘিরে ফের হকাররা বসতে শুরু বসতে আবারো রাস্তাঘাট সব নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। বর্তমানে সাখাওয়াতের নেতৃত্বে হকার উচ্ছেদে কঠোর ভূমিকা দেখতে যাচ্ছে নগরবাসী।
এর আগে গত ২০১৮ সালে তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু সড়ক হকারমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেন। ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আইভী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ওই ঘটনায় হকারদের পক্ষ নিয়ে তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ ওঠে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে হকার উচ্ছেদ নিয়ে কার্যকর ও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাঁদের ভাষ্য, পুলিশ বা সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীরা অভিযান চালালে হকাররা পাশের গলিতে সরে যান। অভিযান শেষ হলে আবারও ফুটপাত ও সড়কে বসেন। ফলে হকারমুক্ত ফুটপাতের উদ্যোগ বারবার নেওয়া হলেও তা টেকসই হয়নি। বর্তমানে হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি নগরবাসী।


