৩১ অক্টোবর ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। সব শিক্ষা বোর্ডেই পাশের হার এবং জিপিএ ফাইভ লক্ষ্যণীয়ভাবে কমেছে। নারায়ণগঞ্জে ফলাফল বিপর্যয়ের চিত্র অনেক অঞ্চলের তুলনায় বেশি।সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ফল বিপর্যয়ের প্রভাব পড়লেও স্কুল এন্ড কলেজ নামক প্রতিষ্ঠান গুলোতে এই অবনমন বিশেষভাবে লক্ষণীয়।এমন অবস্থায় স্কুল এন্ড কলেজ নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রভৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠা শুরু করেছে।
১১ টি শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার ৫২.১২ %, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।জিপিএ ফাইভ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী ৪০০৮৪ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (৬১.০৭ % )ছাড়া সব শিক্ষা বোর্ডেই পাসের হার গড় পাসের হার অপেক্ষা কম হলেও ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১.৮০%।জিপিএ ফাইভ পেয়েছে ১৬৭১৪ জন। সার্বিক বিশ্লেষণে ধ্বস নামা ফলাফলের মাঝেও ঢাকা বোর্ড তুলনামূলক ভাবে কিছুটা হলেও কম বিপর্যস্ত হয়েছে। ঢাকা বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত নারায়ণগঞ্জ জেলায় পাসের হার: ৪৫.৭৮% যা বোর্ডের ফলাফলের ধারে কাছেতো নেই ই,এমনকি ১১ বোর্ডের গড় পাসের হার অপেক্ষাও কম।জেলায় মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮৫ জন।বোর্ড ফলাফলের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে বরাবর ভাল ফলাফল করা নারায়ণগঞ্জের এমন বিপর্যয় নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।এর কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে সচেতন মহলের অভিমত।এইচএসসিতে ফলাফল বিপর্যয়ের আঘাত দু‘একটি ছাড়া সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপরই পড়েছে বলা যায় তবে ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকা একটি বিপর্যয় এবার তীব্র ভাবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বিপর্যয়ের কেন্দ্রে রয়েছে স্কুল এন্ড কলেজ নামক প্রতিষ্ঠানগুলো।দু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এধরনের প্রতিষ্ঠানে এইচএসসির ফলাফল বরাবরই খারাপ হয়ে আসছে।
এবারের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় অধিকাংশ স্কুল এন্ড কলেজের ফলাফল নারায়ণগঞ্জের সার্বিক ফলাফলের চিত্র নিম্নমুখী করতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।এসব প্রতিষ্ঠানের কোন কোনটি সর্বনিম্নই নয় ০% পাসের রেকর্ডও গড়েছে।দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই তালিকায় নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী অতি প্রাচীন কিছু প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।স্কুল পর্যায়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা যেসব প্রতিষ্ঠান শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় সারাদেশেই সুপরিচিত।কলেজ শাখা সংযুক্ত করার পর স্কুল পর্যায়ে সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে পারলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কলেজ শাখায় তা সম্ভব হয়নি। উদাহরণ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাম এসে যায়। প্রাচীনতম বিদ্যালয় সমূহের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় চরম ফল বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে,পাসের হার মাত্র ১১.২৫ %।০% পাস করা দুটি কলেজ বাদ দিলে সমগ্র নারায়ণগঞ্জে এটি সর্বনিম্ন ফলাফল।এমন ফলাফল সামগ্রিকভাবে এর দীর্ঘদিনের সুনামে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।মোট পরীক্ষার্থী: ৮০ জন,উত্তীর্ণ:মাত্র ৯ জন,অকৃতকার্য : ৭১ জন, জিপিএ ফাইভ: ০।এইচএসসি ফলাফলের বিপর্যয় এবার সর্বোচ্চ হলেও এমন বিপর্যয় দীর্ঘদিন যাবত চলে আসছে।বিদ্যালয়টির মাধ্যমিক বা এসএসসি শাখায় প্রতিবছর ঈর্ষণীয় সাফল্য ও সুনাম থাকলেও, কলেজ শাখার এমন ধারাবাহিক ফল বিপর্যয় অভিভাবক ও স্থানীয় সুশীল সমাজের মধ্যে চরম হতাশা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের এই ফল বিপর্যয় মেনে নেয়া সত্যিই কষ্টকর যেখানে এসএসসির নজরকাড়া ধারাবাহিক সাফল্য রয়েছে।২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণকারী ৪৫৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ৪৪৭ জন,জিপিএ ফাইভ: ১২২ জন।পাসের হার: ৯৭.৮১%। মাধ্যমিকের এমন ঈর্ষণীয় সাফল্য থাকা প্রতিষ্ঠান উচ্চ মাধ্যমিকে কেন এত খারাপ করবে?এজন্য অনেকেই কলেজ শাখার প্রশাসনিক ও শিক্ষাদান পদ্ধতির দুর্বলতাকে দায়ী করছেন।পাশাপাশি অনেকেই পর্যাপ্ত সংখ্যক কলেজ থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়াকে দায়ী করছেন।একথা মানতেই হবে মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রথম ও দ্বিতীয় পছন্দের তালিকায় থাকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কলেজ।ফলাফলে সবচেয়ে নিম্নস্তরের শিক্ষার্থী ভর্তি হয় স্কুল এন্ড কলেজে।দু‘একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এসব কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। শুধু পরীক্ষা দেওয়ার জন্যই যেন তাদের ভর্তি হওয়া।নামে কলেজ হলেও সেই পর্যায়ের কোন কার্যক্রম চোখে পড়ে না।১০/১২ জন শিক্ষার্থী,৪/৫ জন পরীক্ষার্থী, তা ও নামে কলেজ শাখা! এমন উদাহরণও রয়েছে।বিজ্ঞ মহলের প্রশ্ন,ঢালাওভাবে অসংখ্য স্কুলকে উচ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নয়ন কতটা যুক্তিসঙ্গত হয়েছে,যখন অনেক কলেজে ছাত্রের অভাবে আসন শূণ্য থেকে যায়।যেসব স্কুলকে কলেজ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে সেগুলোর উপযোগিতা এবং প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন অনেকে।
প্রয়োজনে আরো স্কুল, কলেজ শাখায় উন্নীত হোক মানসম্মত ভাবে,তবে প্রয়োজন ছাড়া শুধুমাত্র স্কুল এন্ড কলেজ নামের আকর্ষণে কোনো প্রতিষ্ঠানকে যেন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত করা না হয়। যে সমস্ত স্কুল উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে প্রয়োজন না থাকলে সেগুলোর অনুমোদন বাতিল করার পরামর্শ দিয়েছেন অনেক শিক্ষাবিদ।সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কিংবা বিনা প্রয়োজনে গড়ে ওঠা কলেজ শাখার জন্য সার্বিক ফলাফলে বিপর্যয় ঘটুক, ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলো তাদের ঐতিহ্য হারাক, এমনটি নারায়ণগঞ্জের কোন সচেতন মানুষের কাম্য নয়। লেখক: বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।


