# শীতলক্ষ্যাকে দূষিত করার দায়ে ১০ কোটি টাকারও বেশি জরিমানা হয়েছে
শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরের (টানবাজার) একটি পাকা ঘাটলাতে গোসল করছে এক ঝাঁক তরুণ। এদের মধ্যে কেউ পানিতে গা ভাসিয়ে সাঁতার কাটছে আবার কেউ পানির নিচে ডুব সাঁতার দিচ্ছে। তবে এ সময় শীতলক্ষ্যার পানি এতটাই পরিষ্কার ছিলো যে, ঘাটলার উপর থেকে পানির নিচে ডুব সাঁতার দেওয়া ছেলেগুলোর গতিবিধি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।
মূলত বর্ষাকালের অতিবৃষ্টি কারণে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়াতে শীতলক্ষ্যার পানি এখন আগের চেয়ে অনেক স্বচ্ছও পরিষ্কার। পাশাপাশি স্রোতের তীব্রতার সাথে সাথে এই নদীতে এখন বেড়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যাও। গতকাল শনিবার (৩ জুলাই) বিকেলে শীতলক্ষ্যার পারে বেশ কয়েকজন মাঝি-মাল্লার সাথে কথা হলে তাঁরা জানায়, ১ বছর আগের শীতলক্ষ্যা, আর এখনকার শীতলক্ষ্যায় অনেক পার্থক্য। আগে শীতলক্ষ্যার পারে আসলে দেখা যেতো কালো পানি টলটল করছে, সাথে দুর্গন্ধতো আছেই। কিন্তু এখন নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে অনেক পরিষ্কার হয়েছে।
তবে বর্ষাকাল চলে যাওয়ার পরপর শীতলক্ষ্যার পানি আবার ময়লা হয়ে যাবে বলেও জানান তারা। আহসান মিয়া নামে এক নৌকার মাঝি বলেন, এখন বর্ষাকাল হওয়াতে নদীর পানি পরিষ্কার হয়েছে এবং পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই আমরা যখন নৌকা চালাই তখন মাঝেমধ্যে মাছও চোখে পরে। কিন্তু বর্ষাকাল চলে গেলে শীতলক্ষ্যার পানি আর এমন থাকবে না। তখন বিভিন্ন কল কারখানার ময়লায় শীতলক্ষ্যা দূষিত হতে থাকবে।
এদিকে বন্দর আমীন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা হরি চন্দ্রদাশ নামে এক ব্যক্তির সাথে কথা হলে তিনি বলেন, নদীর পানি এখন অনেক পরিষ্কার হয়েছে। তাই লকডাউন থাকা সত্তেও বিকেল হলেই লোকজন ঘুরতে আসছে নদীর পারে। আর পানি পরিষ্কার হওয়াতে মাছও আসছে নদীতে। এতে এলাকার লোকজন জাল এবং বরশি দিয়ে সেই মাছ ধরে বাজারে বিক্রিও করছে। তবে বর্ষাকাল চলে গেলে আবার মনে হয় পানি ময়লা হয়ে যাবে। সাত্তার নামে বন্দর রূপালী একলাকার এক যুবক বলেন, বর্ষার কারণে পানি এখন পরিষ্কার তবে বর্ষাকাল চলে গেলে আবার ডাইং কারখানার পানি দিয়ে নদীর অবস্থা বেগতিক হয়ে যাবে। তখন দুর্গন্ধে কেউ মাছ ধরাতো দূরের কথা সামনেও বেশিক্ষণ দাড়াতে পারবেনা। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কল-কারখানা এবং ডাইংগুলো যদি ইটিপি ব্যবহারে সচেতন হয় সেক্ষেত্রে শীতলক্ষ্যা অনেকটাই বর্তমান রূপ নিয়ে টিকে থাকবে।
সূত্র বলছে, রেজিস্ট্রেশন ও নন-রেজিস্ট্রেশন মিলিয়ে ইটিপি প্রয়োজন এমন প্রায় ৫ শতাধিক ডাইং-প্রিন্টিংসহ দূষিত বর্জ নির্গতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে নারায়ণগঞ্জে। এই কারখানা গুলোর দূষিত বিষাক্ত বর্জ পরিশোধন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে সরাসরি ফেলা হচ্ছে শীতলক্ষ্যাসহ বেশ কয়েকটি নদীতে। এতে নদী দূষন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় ইটিপি স্থাপন করতে হবে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা রয়েছে ৪০৮টি। এর মধ্যে ৩২২টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। ৮৬টি প্রতিষ্ঠান এখনও ইটিপি স্থাপন করেনি আর ১৯টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপনের কাজ চলছে। তবে পরিসংখ্যানে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানে ইটিপি থাকলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করছেন খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এতে অভিযান চালালেও নানা জটিলতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইদ আনোয়ার বলেন, নারায়ণগঞ্জে অনেক কারখানাতেই ইটিপি থাকার পরও তাঁরা সেটা ব্যবহার করেনা। এতে শীত মৌসুমে তরল বর্জ্য নদীর পানি অতিমাত্রায় দূষিত করে তোলে। যারা এই নদী দূষণের জন্য দায়ী এদের আমরা প্রায় সময়তেই মামলা এবং জরিমানা করে থাকি। কিন্তু দেখা যায় এরা হাইকোর্ট থেকে আবার জামিন নিয়ে চলে আসে। গত কয়েক বছরে নদীর পানি দূষণের দায়ে বিভিন্ন ডাইং কারখানাকে প্রায় ১০ কোটি টাকারও বেশি জরিমারা করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্ষার অতিবৃষ্টির ফলে শীতলক্ষ্যা নদী পানি এখন অনেক পরিষ্কার। আমরাও চাই শীতলক্ষ্যা নদীর পানি সব সময় এমন পরিষ্কার থাকুক।


