মুসলমানের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদ (ঈদুল আযহা)। এই ঈদকে কেন্দ্র করে ঈদুল ফিতরের পর থেকেই কোরবানি দিতে আগ্রহী মানুষের মধ্যে হিসেব নিকেশ শুরু হয়ে যায়। তাই বিশ্ব জুড়ে করোনা মহামারির এই বিপর্যয়েও থেমে থাকেনি এই এই ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনের পরিকল্পনা। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন বন্দরের গরু খামারিরা।
প্রত্যেকটি খামারের মালিক থেকে শুরু করে কর্মকর্তা ও কর্মচারী সবাইকেই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কোরবানির ঈদের আগ পর্যন্ত তাদের কোন ফুসরৎ নেই বলে জানান তারা। যারা কোরবানী দিতে আগ্রহী তারা এর মধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন গরু ক্রয় করা। যারা একটু সামর্থ্যবান আছেন তারা কোরবানীর হাটের আগেই খামার থেকে পছন্দের গরুটি ক্রয় করে নিশ্চিত হতে চাচ্ছেন। বন্দরের এমনও খামার আছে যারা এর মধ্যেই তাদের টার্গেটের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ গরু বিক্রি করে ফেলেছেন।
এসব খামারে শুধু বন্দর কিংবা নারায়ণগঞ্জ নয়, ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, যাত্রবাড়িসহ জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে এসব খামার থেকে গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন গ্রাহকরা। দেশে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ধাপে করোনায় আক্রান্ত শনাক্ত এবং বিস্তারের হার দ্রæত বেড়ে চলায় এই ভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার রোধে চলছে কঠোর লকডাউন। এরই মধ্যে কোরবানিকে সামনে রেখে দেশের বাইরে থেকে গবাদিপশু আসতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ.ম. রেজাউল করিম। দেশে পর্যাপ্ত কোরবানির পশু রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, চোরাইপথে বা অন্য কোনো পথে একটা পশুও যাতে দেশের ভেতর প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য তিনি সীমান্তে যোগাযোগ করেছেন। এজন্য তিনি জোর দিয়েছেন দেশীয় খামারের উপর।
বন্দরের বেশ কয়েকটি খামার ঘুরে জানা যায়, তারা অনেকেই ছয় মাস থেকে একবছর আগে গরু কিনে নিজেদের খামারে তাদের লালন পালন করে গরুগুলোকে বিক্রয়ের উপযুক্ত করেন। এখানে তাদের খাবারের জন্য বিভিন্ন জাতের ঘাস ও ধান গাছের খড় দেওয়া হয়। এছাড়াও দানাদার খাবারের মধ্যে ধান, গম, ভুট্টা, ডাবলি এর সাথে ডিসিপি প্লাস ও লাইম পাউডার (চুনা) মিশিয়ে খাবার তৈরী করা হয়। আর যেহেতু কোরবানি ঈদ সন্নিকটে তাই এখন গরুগুলোর প্রতি যতœআত্তি একটু বেশীই করা হয়। গরুগুলো তরতাজা করার সাথে সাথে ক্রেতাদের কাছে আরো আকর্ষণীয়তা বাড়ানোর জন্য গরুর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতিও এখন নজর দেওয়া হচ্ছে বেশী।
সব খামারই এখন গরু বিক্রি করার জন্য প্রস্তুত এবং ইতিমধ্যে গরু বিক্রি করা শুরু হয়েছে। অনেকেই আবার সরাসরি বিক্রি ছাড়াও অনলাইনের মাধ্যমে গরু বিক্রি করছেন। অনলাইনে ভিডিওর মাধ্যমে গরু দেখে পছন্দ করছেন ডিজিটাল স্কেলে পুরো গরুর ওজন করে গ্রাহকদের দেখিয়ে গরু পছন্দ হলে দাম নির্ধারণ করছেন। আবার কিছু কিছু খামারে গ্রাহকরা উপস্থিত হয়ে গরুর আকার দেখে তার উপর ভিত্তি করে দরদাম করে কিনছেন গরু। খামারের ভিতের দেখা যায় খামারের কর্মীরা অনেকেই ধোয়ামোছা ও পরিষ্কারে কাজ করছেন। কেউবা সারিবদ্ধভাবে থাকা গরুকে খাবার দিচ্ছেন আবার কিছু কর্মচারী দানাদার খাবার একত্রে মিশিয়ে প্রস্তুত করে গরুর খাবারের উপযুক্ত করে তুলছেন। এরই মধ্যে কিছু খামারে আবার ত্রেতাদের আগমণ ঘটছে যাদের বিভিন্ন আকর্ষণীয় গরু দেখাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারের কর্মীরা।
এ বিষয়ে বন্দরের মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের দাশেরগাও এলাকার এসএস ক্যাটল ফার্ম-এ প্রবেশ করলে সেখানে দেখা যায় যাত্রবাড়ি থেকে আরমিন সুমন ও আবুল কালাম নামের দুই ক্রেতা এসেছেন কোরবানির গরু কিনতে। কীভাবে এখানকার ঠিকানা পেলেন জিজ্ঞেস করতে তারা জানান, গত বছর এখান থেকে গরু কিনেছেন তাই তাদের ঠিকানা জানা আছে। ফার্মের মালিক লুৎফর রহমান স্বপন জানান, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নিজে গরু পালন করে কোরবানি দিতেন। এক সময় তার স্বজনদের অনুরোধে ২০১৮ সালে মাত্র চল্লিশটি গরু নিয়ে খামারটি শুরু করেন তিনি। এ বছর তার খামারে গরু প্রস্তুত আছে ৪০০টি এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের গরু বিক্রি হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, গত বছর তিনি ২০০টি গরু বিক্রি করেছেন। তার এখানে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা মূল্যের গরু আছে বলে তিনি জানান।
অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি প্রক্রিয়া থাকায় তার এখানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ত্রেতারা আসেন বলে তিনি জানান। গরুর দাম নির্ধারণের বিষয় জানতে চাইলে তিনি জানান, আমরা দুইটি পদ্ধতিতে গরুর দাম নির্ধারণ করি। প্রথমত ডিজিটাল স্কেলে পুরো গরুর ওজন দিয়ে ওজন হিসেবে দাম নির্ধারণ অন্যটি হলো গরুর সাইজ দেখে ঠিকা হিসেবে দামাদামি করে নির্ধারণ করা হয়। বন্দর উপজেলায় বর্তমানে কোরবানির উদ্দেশ্যে গরু পালনের জন্য ৪০০টি খামার আছে বলে জানিয়েছেন বন্দর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা.মুহাম্মদ ফারুক আহমেদ। তিনি জানান, সরকারী হিসাব মতে বন্দর উপজেলায় ১২৬০টি ডেইরী ফার্ম আছে। এর মধ্যে কোরবানির জন্য গরু পালন করে এমন খামারের সংখ্যা ৪০০। তাছাড়াও এর মধ্যে তিন চারটি খামার আছে যেগুলোতে শুধুমাত্র গরু মোটা তাজা করা হয়।


