Logo
Logo
×

স্বদেশ

মুক্তিযোদ্ধাদের হামলারমুখে মিলের অবাঙালিদের জয়বাংলা শ্লোগান

Icon

বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:৫৬ পিএম

মুক্তিযোদ্ধাদের হামলারমুখে মিলের অবাঙালিদের জয়বাংলা শ্লোগান
Swapno



একাত্তরে ডিসেম্বর মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীদের পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছিলাম। নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরার জন্য এই বিজয়ের মাসে ‘দৈনিক যুগের চিন্তা’য় একাত্তরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের কাহিনী তুলে ধরা হচ্ছে। আজ ছাপা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেনের লেখা মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণ ও অপারেশনের কাহিনী।  

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন : মুক্তিযুদ্ধকালে ফতুল্লার কেরোলিন মিলে একটি অপারেশনের ঘটনা এখনো আমার মনে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে। সেখানে তখন অবাঙালিদের বসবাস ছিল সবচেয়ে বেশি। আমরা একদল মুক্তিযোদ্ধা সকালবেলা সেই কেরোলিন মিলে অপারেশন করতে যাই। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে চরম ভয় পেয়ে সব অবাঙালি উচ্চস্বরে জয় বাংলা স্লোগান দিতে শুরু করে। অবাঙালিদের মুখে জয়বাংলা স্লোগান শুনে আমরা খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। স্বাধীনতার এত বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনার কথা মনে হলে কেরোলিন মিলের সেই অপারেশনের কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়।

 

৭১ সালে আমি তোলারাম কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলাম। স্কুলজীবন থেকে আমি ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলাম। ছাত্র ইউনিয়েনের নেতা হয়ে উঠেছিলাম। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তানবিরোধী সব আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। সেই সময়ে ছাত্রনেতা হিসেবে আমার এবং মতিন ভাইয়ের অত্যন্ত জনপ্রিয়তা ছিল। সেই সময়ে আমি আনসার বাহিনীর সদস্য হিসেবে রাইফেল চালনা ট্রেনিং নিয়েছিলাম। ফলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পর অস্ত্র ব্যবহার করা আমার জন্য সহজ হয়েছিল।

 

৭১ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশের পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনের প্রতিদিনই মিটিং মিছিলে আমরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। ৭১ এর সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আমি যেতে পারিনি কিন্তু আমার এলাকার ছাত্র যুবকদের প্রায় সবাই রেসকোর্সে গিয়েছিল। ২৫শে মার্চে পাকিস্তানিরা ঢাকায় গণহত্যা শুরুর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে সারাদেশেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

 

আমাদের এলাকা থেকে সিনিয়র ভাইদের মধ্যে মতিন ভাই প্রথম অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য আগরতলা চলে যান। মতিন ভাই এলাকায় ফিরে এসে আরো অনেক ছাত্র-যুবককে আগরতলা নিয়ে যান। তখনই আমরা একটা বড় দল মতিন ভাইয়ের সাথে আগরতলায় অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য চলে যাই। সেই দলে ছিলেন মহিউদ্দিন মোল্লা, হামিদ মোল্লা, এহসান কবীর রমজান, মফিজ উদ্দিন, খোরশেদ আলম, ফজলুল হক, আক্কাস প্রমুখ। আমরা দলবেধে দুই নম্বর গুদারাঘাট হয়ে শীতলক্ষ্মা নদী পেরিয়ে প্রথমেই লক্ষণখোলা যাই।

 

মীরপাড়ার আমান ভাই আমাদেরকে বাজারের মধ্য দিয়ে গুদারাঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দেন। নদী পেরিয়ে লক্ষণখোলায় যাওয়ার পরও অনেক পরিচিত লোকের সাথে দেখা হয়। সবাই আমাদের কাছে জানতে চান কোথায় যাচ্ছি? আমরা সবার কাছে দোয়া চাই যাতে ঠিকমতো ভারতে পৌঁছে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে পারি। আমরা লক্ষনখোলা থেকে পায়ে হেঁটে বৈদ্যেরবাজার লঞ্চঘাটে যাই। সেখান থেকে একটি ছোট লঞ্চে চড়ে আমরা কুমিল্লার নবীনগর গিয়ে পৌঁছি। সেখানে আমাদের এক পরিচিত লোকের বাড়িতে আশ্রয় নেই।

 

সেই বাড়িতে রাত কাটিয়ে খুব ভোরে আমরা আবার ভারতীয় সীমান্তের দিকে হাঁটা শুরু করি। প্রায় সারাদিন হেঁটে আমরা সন্ধ্যার দিকে ভারতীয় সীমান্তে পৌঁছি। সেখানে আরো অনেক লোক ভারতে প্রবেশ করার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। সবাই মিলেই আমরা ভারতের ত্রিপুরায় পবেশ করি। ত্রিপুরায় ঢোকার পর বর্ডার এলাকা থেকেই আমরা সোজা চলে যাই আগরতলা শহরে। সেখানে গিয়ে প্রথম উঠি ক্রাফ্টস হোস্টেলে। নারায়ণগঞ্জের আরও অনেক লোক মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন সেখানে। ক্রাফ্টস হোস্টেলে গিয়ে আমরা আশেক আলী মাস্টারকে পাই। তিনি সেখানে একটি ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন।

 

কয়েকদিন পর আমাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তিন নম্বর সেক্টরে একটি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ক্যাম্প ছিল বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার সীমান্তের কাছে ত্রিপুরায় বটতলা নামক স্থানে। সেখানে গিয়ে আমরা ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য এবং অফিসারদের অধীনে ট্রেনিং নেই। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমাদের তখন ট্রেনিং দিয়েছিলেন মোস্তফা ওস্তাদ, মালেক ওস্তাদ প্রমুখ। তারা অস্ত্র চালনায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তারা আমাদের অত্যন্ত ভালোভাবেই অস্ত্র-চালনার বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দেন। এবং কিভাবে বিস্ফোরক স্থাপন করে বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করতে হবে তাও আমাদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেন।

 

প্রায় একমাস আমরা সেই ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর আমাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশের প্রবেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আমরা গ্রুপ আগরতলা গিয়েছিলাম সেই পুরো গ্রুপটি একসাথে প্রশিক্ষণ নিয়ে আবার একসাথে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। আমাদের গ্রুপে তখন ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমাদের কাছে তখন প্রায় এক হাজার পাউন্ডের মতো বিস্ফোরক দেয়া হয়। এছাড়াও ছয়-সাতটি অস্ত্র দেওয়া হয়। অস্ত্রের মধ্যে ছিল রাইফেল, এসএলআর, স্টেনগান ইত্যাদি। ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে রাতে বিএসএফের একটি ট্রাকে উঠিয়ে আমাদের সীমান্ত এলাকায় এনে নামিয়ে দেয়া হয়। পরে এলাকার একজন গাইড আমাদের সীমান্ত পার করিয়ে দেন।

 

আমাদের পুরো গ্রুপটি আবার নৌকায় কুমিল্লা হয়ে আনন্দবাজারে পৌঁছি। সেখান থেকে আবার নৌকায় বিভিন্ন খালের ভিতর দিয়ে লক্ষণখোলা আসি। লক্ষণখোলা থেকে শীতলক্ষ্যা নদী পেরিয়ে আমরা দুই নাম্বার গুদারা ঘাঁটে নামি। তখন আমাদের সাথে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ছিল। কিভাবেই অস্ত্রগুলো আমরা লুকিয়ে জালকুড়িতে নিয়ে যাব তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। এক পর্যায়ে কিছু পাটখড়ির (সোলা) আটি জোগার করে তার মধ্যে অস্ত্রগুলো লুকিয়ে রিকশায় চড়ে আমরা জালকুড়ি চলে যাই। বিস্ফোরকগুলো আমরা মীরপাড়ায় আক্তার সাহেবের বাড়িতে রেখে আসি। পরে আক্তার সাহেব অন্যদের সহযোগিতায় রিক্সায় করে সেই বিস্ফোর জালকুড়ি পাঠিয়ে দেন।

 

এরপর আমরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপারেশন করতে শুরু করি। কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা বেশ কয়েকটি অপারেশন করে ফেলি। এর মধ্যে একদিন খবর আসে যে, ফতুল্লা কেরলিন মিল এলাকায় অবাঙালিরা স্থানীয় অধিবাসীদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করে, তাদের বাড়িঘরের জিনিসপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায়। এটা শোনার পরই আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কেরলিন মিলে অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেই।

 

একদিন সকালবেলা বেশ কয়েকটি অস্ত্র নিয়ে আমরা জালকুঁড়ি থেকে হেঁটে ফতুল্লার কেরলিন মিলে গিয়ে পুরো মিল ঘেরাও করি। অবাঙ্গালীরা মিলের ভিতরে আশ্রয় নিয়ে গেট বন্ধ করে দেয় যাতে আমরা মিলে প্রবেশ করতে না পারি। আমরা গেট ভাঙ্গার চেষ্টা করি, আমাদের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন বদিউল আলম। সে আরো কয়েকজনকে নিয়ে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা দিয়ে গেট ভেঙে ফেলে। গেট ভেঙে ফেলার পর সবাই যখন অস্ত্র তাক করে অবাঙ্গালিদের ধাওয়া করতে যাব ধরতে যাব তখনই অবাঙালিরা জোরে জয়বাংলা স্লোগান দিতে শুরু করে। আমরা অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি।

 

যে অবাঙালিরা এতদিন এই মিল থেকে বেরিয়ে এলাকার বাঙালিদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন করতো তারাই এখন জয়বাংলা স্লোগান দিচ্ছে। তারা এখন মৃত্যুর ভয়ে জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে আমাদের খুশি করতে চাচ্ছে। যা হোক, আমরা সবাইকে এক এক করে তল্লাশি করি সেখানে কোন অস্ত্র আছে কি নেই তা জানার জন্য। কিন্তু ইতিমধ্যে অবাঙালিরা আমাদের আসার খবর পেয়ে তাদের কাছে থাকা অস্ত্রশস্ত্র বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে ফেলেছিল।

 

আমরা তাদের অস্ত্র আর খুঁজে পাইনি। ঠিক এই সময়েই নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে উপস্থিত হন। আমরা যেসব অবাঙালিকে বন্দী করেছিলাম তাদেরকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে দিয়ে আমরা আবার জালকুড়িতে ফিরে আসি। এরপর আমরা আরও বেশ কয়েকটি অপারেশন করেছি। এভাবে অপারেশন করতে করতেই একসময় পাকিস্তান বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা এবং যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। আমরা বিজয় অর্জন করি, আমরা লাভ করি বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন