তাড়াতাড়ি যুদ্ধে যেতে আমি ইচ্ছে করেই গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেই
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক
প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:৫৬ পিএম
একাত্তরে ডিসেম্বর মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীদের পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছিলাম। নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরার জন্য এই বিজয়ের মাসে ‘দৈনিক যুগের চিন্তা’য় একাত্তরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের কাহিনী তুলে ধরা হচ্ছে। আজ ছাপা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হকের লেখা মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণ নেয়ার কাহিনী।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক : মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য যখন আমি ভারতের ত্রিপুরায় ট্রেনিং ক্যাম্পে যাই তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা আমাকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের দিয়ে আমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। সেজন্য কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক প্রশিক্ষণ (লং কোর্স) দেয়া প্রয়োজন। তাদের গেরিলা যুদ্ধ ছাড়াও ভারী অস্ত্র প্রশিক্ষন দেয়া হবে। তোমাকে আমরা দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষন দিতে চাই, তোমার অভিমত জানাও। আমি তখন ভেবে দেখলাম, লং কোর্সে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য অনেক সময় লাগবে এবং মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে লং কোর্সের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ হবে কিনা আমার মনে সংশয় দেখা দেয়। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, আমি যত দ্রুত সম্ভব দেশে গিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই।
আমি সেনা কর্মকর্তাদের অনুরোধ করি, আমাকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিন, আমি তাড়াতাড়ি দেশে গিয়ে গেরিলা কায়দায় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই। আমার ইচ্ছার কথা শুনে সেখানে দায়িত্বরত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত আমাকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতে রাজী হন। আমার সঙ্গে তখন ছিলেন গোদনাইলের জুট মার্কেটিং কর্পোরেশনের এক অফিসারের ছেলে তৌফিক চৌধুরী। সে সেনা কর্মকর্তাাদের কথায় রাজী হয়ে লং কোর্সের প্রশিক্ষন নিতে সম্মত হয়।
এরপর তাকে আমাদের কাছ থেকে পৃথক করে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে লং কোর্সের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য ত্রিপুরা থেকে অনেক দূরে ভারতীয় সেনানিবাসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে একসাথে লং কোর্সের সামরিক প্রশিক্ষন দেয়া হয়। তৌফিক ছাড়াও আমাদের এলাকার আরো কয়েকজন ভারতের বিভিন্ন সেনানিবাসে লংকোর্সে সামরিক প্রশিক্ষন নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কিছু মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষনে থাকার সময়ই পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পন করে ফেলে এবং দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।
৭১ সালে আমি পুরনো ঢাকার কায়দে আজম কলেজে ১ম বর্ষের ছাত্র ছিলাম। রাজনীতি সচেতন হলেও দলীয় রাজনীতির সাথে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা ছিল না। আমি কোন ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের সদস্যও তখন ছিলাম না। তবে তখন পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের শোষন-নির্যাতন-বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা আমি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করি এবং সার্বক্ষণিক সমর্থন দিয়ে যাই। একাত্তরের ২৫ শে মার্চে পাকিস্তান বাহিনী যখন বাংলাদেশের সাধারণ নিরীহ জনগণকে গণহত্যা শুরু করে তখন সবার মত আমার মনেও তীব্র ঘৃণা এবং ক্ষোভ জন্ম নেয়। আমার তখনই মনে হয় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমাদের এখন সবচেয়ে বড় এবং প্রয়োজনীয় কাজ। এর সঙ্গে আমাদের দেশপ্রেমও জড়িয়ে আছে।
২৫ শে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার শুরুর পরপরই আমাদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি শুধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেই থেমে থাকেননি, তিনি দেশের সকল মানুষকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর শেষ সদস্যকে বিতাড়িত করা না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত সবাইকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের পর কোন বাঙালির আর ঘরে বসে থাকার সুযোগ ছিল না, যে যেভাবে পেরেছে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল।
স্বাধীনতার এত বছর পরও আমার অত্যন্ত ভালো লাগে এই কথা ভেবে যে, নারায়ণগঞ্জের অসংখ্য ছাত্র-যুবক মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য দলে দলে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের এলাকার অনেক ছাত্র-যুবক প্রশিক্ষণ নিতে আগরতলা চলে গিয়েছিলেন। একদিন আমি নিজে অন্য কারো সাথে আলোচনা না করে একক ভাবেই সিদ্ধান্ত নিলাম, যে করেই হোক আমি মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে আগরতলা চলে যাব।
সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার পর আমি খুঁজতে থাকি আমাদের এলাকার কার সাথে আগরতলা যাওয়া যায়, কে আগরতলা যাওয়ার পথ জানেন। এক পর্যায়ে জানতে পারি যে, আমাদের এলাকার বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষন নিতে আগরতলা যাবেন। আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সঙ্গী হয়ে আগরতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। আমাদের সেই দলে ছিলেন মহিউদ্দিন, আয়েত আলী গাজী, মুজিবুর রহমান সাউদ, মীর আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
আমরা লক্ষণখোলা, লাঙ্গলবন্দ হয়ে বৈদ্যের বাজার যাই। সেখান থেকে লঞ্চে রামচন্দ্রপুর এবং সেখান থেকে আবার নৌকায় চড়ে ও পায়ে হেঁটে দুই দিনে ত্রিপুরা সীমান্তে পৌঁছে যাই আমরা। যাওয়ার পথে আমরা চরম বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। সীমান্তের কিছু আগে আমরা একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখানে দুপুরে আমাদের খাওয়ার জন্য স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে এনে রান্না করা হচ্ছিল। সে সময় হঠাৎ পাকিস্তান বাহিনী গোলাগুলী শুরু করে। আমরা চূলায় রান্নার পাতিল রেখে সবাই সঙ্গের কাপড়-চোপড় নিয়ে ছুটে বিলের পানিতে নেমে যাই। তারপর কোমর সমান পানির মধ্যদিয়ে হেটে আমরা ত্রিপুরা সীমান্তের কাছে যেতে সক্ষম হই।
ত্রিপুরার সীমান্ত থেকে আমরা সরাসরি আগরতলা শহরে ক্রাফট্স হোস্টেলে চলে যাই। সেখানে আমাদের এলাকার অনেক পরিচিত লোককেও আমরা পাই। তাদের পেয়ে আমরা বুকে অনেকটা সাহস পাই যে, আর কোন অসুবিধা নেই। ক্র্রাফ্টস হোস্টেলে কয়েকদিন থাকার পর আমরা বারবারই নেতাদের তাগাদা দিতে থাকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য। এক পর্যায়ে আমাদের হাঁপানিয়া ক্যাম্পে পাঠানো হয়। হাঁপানিয়া ক্যাম্প থেকে যুবক-ছাত্রদেরকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করা হতো।
কিন্তু হাঁপানিয়া ক্যাম্পে যাওয়ার পর আমাদের সঙ্গের কয়েকজন বৃষ্টিতে ভিজে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চরম অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেশ কয়েকদিন পরও তারা সুস্থ না হওয়ায় সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েন। এমন অসুস্থ অবস্থায় তাদের আর প্রশিক্ষণ দেয়ার সুযোগ ছিল না। এক পর্যায়ে আমাকে বলা হয়, এই অসুস্থ কয়েকজনকে নিয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে যেতে। নেতাদের নির্দেশমতো আমি অসুস্থ কয়েকজনকে নিয়ে বাংলাদেশে আমাদের এলাকায় ফিরে আসি। তাদেরকে বাড়িতে পৌছে দিয়ে ১৫ দিন পর আমি একাই আবার আগরতলায় চলে যাই প্রশিক্ষণ ক্যাম্প যোগ দিতে।
হাঁপানিয়া ক্যাম্পে গিয়ে প্রশিক্ষণে যেতে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম লেখানোর সময় আমাদের যখন বলা হয় লং কোর্সের সামরিক প্রশিক্ষণে যাওয়ার জন্য, আমি গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল প্রশিক্ষণ নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে আমাকে সেখান থেকে চড়িলাম নামে একটি স্থানে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়। চড়িলাম ক্যাম্পে আমাদের প্রায় ১৫ দিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসাররা প্রশিক্ষণ দেন। কিভাবে অস্ত্র চালনা করতে হবে, কিভাবে অস্ত্র সংরক্ষণ করতে হবে এগুলো আমাদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া হয়।
এ সময় প্রশিক্ষনের অংশ হিসেবে আমাদের গেরিলা গ্রুপকে কয়েক দিন রাতে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ কিভাবে করতে হবে সে সম্পর্কে প্রশিক্ষন দেয়া হয়। সীমান্তে বাংকারে বসে আমাদের প্রশিক্ষকরা পাকিস্তান বাহিনীকে লক্ষ্য করে এসএলআর থেকে কখনো একটি একটি করে গুলীবর্ষন, আবার কখনো মেশিনগান দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করতেন। এটা আমাদের সীমান্ত যুদ্ধ শেখানোর জন্য করা হতো।
এভাবে আমাদের প্রশিক্ষন চলছিল। কিন্তু এরই মধ্যে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যায়। কুমিল্লার বেতিয়ারা গ্রামে একদল মুক্তিযোদ্ধা ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে গিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর সামনে পড়ে যান। তখন পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে নয় জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাদের মধ্যে ২জন ছিলেন আমাদের এলাকার মুক্তিযোদ্ধা। তারা হলেন গোদনাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সহিদুল্লাহ সাউদ এবং লক্ষণখোলার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আওলাদ হোসেন। এই খবর পাওয়ার পরে আমাদের মন দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
এভাবে কিছুদিন কেটে যায়। আমাদের যারা প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন তারা একদিন আমাদের বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে, যে কোন সময় তারা পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারে। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় বাহিনী যুদ্ধ করতে করতে বাংলাদেশের অনেক ভিতরে চলে যেতে সক্ষম হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে মুক্তিযোদ্ধাদের আর প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রয়োজন হয়তো থাকবে না।
তোমরা যারা এখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছো এবং এখনো বাংলাদেশে যাওনি, তারা এখানে থেকে আরো কিছু বিষয়ে প্রশিক্ষণ নাও। দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আমাদের অনেক প্রশিক্ষিত লোকের প্রয়োজন পড়বে। তোমরা দেশে ফিরে সেই কাজটা করবে। কাজেই এখন তোমাদের দেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সে কথা শুনে আমার খুব একটা ভালো লাগলো না। আমি বললাম যে, না আমরা এখনই দেশে যাব এবং পাকিস্তানিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। এরপরই নেতৃবৃন্দ আমাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এদিকে খবর আসতে থাকে যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে পাকিস্তানীরা পরাজিত হচ্ছে এবং মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করছে। এভাবেই মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনী সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী ঢাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন সুখবর পাওয়ার পরপরই একদিন আমরাও সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ি। ভারতীয় বাহিনীর সামরিক ট্রাকে চড়ে আমরা কুমিল্লা এবং সেখান থেকে বিভিন্ন পথে কখনো পায়ে হেটে, কখনো গাড়িতে নিজ এলাকায় চলে আসি।
এস.এ/জেসি


