Logo
Logo
×

স্বদেশ

আহত হয়ে ফজলুল হক বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে

Icon

বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজ দেওয়ান

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:১২ পিএম

আহত হয়ে ফজলুল হক বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে
Swapno


একাত্তরে ডিসেম্বর মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীদের পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছিলাম। নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরার জন্য এই বিজয়ে মাসে ‘দৈনিক যুগের চিন্তা’য় একাত্তরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের কাহিনী তুলে ধরা হচ্ছে। আজ ছাপা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজ দেওয়ানের লেখা মুক্তিযুদ্ধে আহত হয়ে বিনা চিকিৎসায় এক সহযোদ্ধার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার কাহিনী।  
 

বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজ দেওয়ান : মুক্তিযুদ্ধে এক অপারেশনে পাকিস্তান বাহিনীর গুলিতে আহত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন আমাদের সহযোদ্ধা ফজলুল হক। সে জালকুড়ির আলিমুদ্দিন সরদারের ছেলে এবং স্কুল ছাত্র ছিল।

 

 

তার সেই মৃত্যু আমাদেরকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছিল। আজও যখন মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করি, তখনই ফজলুল হকের মৃত্যুর বিষয়টি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমাদের সবার সামনেই সে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করে আমাদের দু:খের সাগরে ভাসিয়ে যায়।

 



আমাদের জন্য আরো দু:খের বিষয় ছিল যে, শহীদ ফজলুল হকের লাশটিও আমরা জালকুড়িতে এনে কবর দিতে পারিনি। তখন বিভিন্নস্থানে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ চলছিল।

 

 

এছাড়াও পাকিস্তান বাহিনীর হামলার ভয়ে এলাকার সবাই তটস্থ ছিল। ফলে ফজলুল হককে ফতুল্লার বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিম পাড়ে পানঁগাওয়ে কবর দিতে হয়েছিল। এই দুঃখ আমরা কোনদিন ভুলতে পারিনি।

 



যে অপারেশনে ফজলুল হক আহত হয়েছিল সে অপারেশনটি আমরা করেছিলাম গোদনাইলের আদমজী-নারায়ণগঞ্জ সড়কের ভাঙ্গারপুলের পশ্চিম পাশে ওয়াপদার ক্যানেলের পানির পাম্প এলাকায়। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের পুরো গ্রুপ জালকুড়িতে আমাদের বাড়িতে অবস্থান করছিলাম।

 

 

একদিন আমাদের কাছে খবর আসে যে গোদলাইনের ভাঙ্গারপুলের কাছে পানির পাম্পের ঘরে পাকিস্তান বাহিনী রাতের বেলায় বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা লোকজনকে নির্যাতন করে এবং হত্যা করে লাশ নিয়ে নদীতে ফেলে দেয়। পাকিস্তানীদের ভয়ে এলাকায় কেউ থাকতেও পারেনা। এই খবর পাওয়ার পর আমাদের গ্রুপ সেখানে অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেই।  

 



সেই অপারেশনে আমি সিরাজ, মালেক, ফজলুল হকসহ আরো কয়েকজন অংশ নিয়েছিলাম। আমরা রাত দশটার দিকে জালকুড়ি থেকে সেখানে যাই। আমরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভাঙ্গারপুলের পশ্চিম পাশে প্যানেলের পাম্পের একটু দূরে এমবুশ করে অপেক্ষা করতে থাকি।

 

 

আধা ঘন্টা পরেই পাকিস্তান বাহিনীর গাড়ি সেখানে আসে। পাকিস্তানি সৈন্যরা গাড়ি থেকে নামার পরপরই আমরা সবাই একসাথে গুলীবর্ষন শুরু করি। পাকিস্তানিরাও আমাদের দিকে গুলীবর্ষণ করতে থাকে। এভাবে প্রায় এক ঘন্টা পাকিস্তানিদের সাথে আমাদের গোলাগুলি হয়।

 

 

কিন্তু পাকিস্তানিদের কাছে ছিল ভারী অস্ত্র। সেই অস্ত্রের সাথে আমাদের পেরে ওঠা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে পাকিস্তান বাহিনীর মেশিনগানের একটি গুলী সহযোদ্ধা ফজলুল হকের বুক ভেদ করে পিছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। সে গুরুতর আহত হয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে।

 

 

এ অবস্থা দেখে আমরা ঘাবড়ে যাই। আমরা দেখলাম এখন আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। আমরা ধীরে ধীরে গুলী করতে করতে পিছিয়ে আসতে থাকি। আসার সময় আমরা ২/৩ জন আহত ফজলুল হককে  কাধেঁ তুলে বিলের মাঝ দিয়ে হেটে জালকুড়িতে চলে আসি।

 

 

জালকুড়িতে তখন একজন কম্পাউন্ডার ছিলেন। তাকে এনে ফজলুল হকের বুকে ব্যান্ডজ করা হয়। সেই কম্পউন্ডার বলেন, তাকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে না পারলে বাচানো যাবেনা। কিন্তু তখন হাসপাতালে নেয়ার কোন সুযোগ ছিলনা। পরে আমরা ফজলুল হককে নিয়ে যাই বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিম পাড়ে।

 

 

সেখানে তখন নারায়নগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার  সিরাজ ভাইয়ের ক্যাম্প ছিল। সেখানে নেয়ার পরও কোন চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। আমাদের সবার সামনেই বিনা চিকিৎসায় মৃম্যুর কোলে ঢলে পড়লো ফজলুল হক।

 




৭১ সালে আমি ছিলাম সিদ্দিরগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তোলারাম কলেজ থেকে আইএ পাস করে আমি শিক্ষকতায় প্রবেশ করি। একই সাথে আমি বিএ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময়েই চারিদিকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

 

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়ার পর আমাদের এলাকা থেকে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে চলে যেতে শুরু করে। তখন আমার সহপাঠী ছিলেন গোদনাইলের ইসমাইল মিয়া।

 

 

সে আইএ পাস করার পর সেনাবাহিনীতে চাকরি নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সে সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে আগরতলা চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে আমাদের জালকুড়িতে অবস্থান করতে থাকে। তার সাথে যোগাযোগ করে আমরা দল বেঁধে আগরতলায়  চলে যাই।

 

 


আগরতলায় গিয়ে আমরা একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেই। কিন্তু সেখানে থাকার খুব কষ্ট এবং খাওয়া-দাওয়ারও প্রচণ্ড অভাব ছিল। তখনও লোকজনকে রিক্রুট করে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং দেওয়ারও ব্যবস্থা হয়নি। এই অবস্থায় আমরা মনে করলাম যে এখানে থেকে লাভ নেই। আমরা বরং দেশে চলে যাই, পরে যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হবে তখন এসে প্রশিক্ষণ নেব।

 

 

এরই মধ্যে একদিন সিরাজ স্বপ্নে দেখে যে তার মা মারা গেছে। এই স্বপ্ন দেখার পরে সে খুবই অস্থির হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশে চলে আসার চিন্তা করতে থাকে। কয়েকদিন পর আমিও রাতে স্বপ্ন দেখি আমার মা মারা গেছে।

 

 

এভাবে দুজন মা মারা যাওয়ার স্বপ্ন দেখার পর আমরা অত্যন্ত ভেঙ্গে পড়ি এবং সিদ্ধান্ত নেই যে আমরা বাড়িতে ফিরে যাব। অবস্থা ভালো হলে এবং এখানে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা হলে আমরা আবার এসে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেব। এরপরই  আমরা দেশে চলে আসি।

 



দেশে এসে দেখি অবস্থা বেশি ভালো নয়। চারিদিকে পাকিস্তান বাহিনী অত্যাচার নির্যাতন করছে। কিন্তু আমরা যে ভারত গিয়েছিলাম একথা কিভাবে যেন এলাকায় জানাজানি হয়ে যায়। একদিন আমরা খবর পেলাম, আমরা যে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছি এই খবর পাওয়ার পর সিদ্দিরগঞ্জ থানায় আমাদের নামে নাকি মামলা হয়েছে। এ খবর পেয়ে আমরা অত্যন্ত ভয় পেয়ে যাই এবং তখনই সিদ্ধান্ত নেই আমরা আবার আগরতলা চলে যাব।  

 

 


ইতিমধ্যে আমাদের এলাকারও কিছু ছাত্র যুবক আগরতলায় চলে গিয়েছিলেন। আমরাও আবার আগরতলায় চলে যাই। সেখানে আমরা প্রথমে জয় বাংলা অফিসে যোগাযোগ করি। সেখান থেকে আমাদের পাঠানো হয় হাঁপানিয়া ক্যাম্পে। হাঁপানিয়া ক্যাম্পে কয়েকদিন থাকার পর আমাদের পাঠানো হয় মেলাঘর ক্যাম্পে। সেখানে তখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। আমরা প্রশিক্ষণের নাম লিখিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করি।

 

 


মেলাঘর ক্যাম্পে আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পর সেখান থেকে আরো উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের বাগমারা ক্যাম্পে পাঠানো হয় কিন্তু বিশেষ কারণে বাগমারা ক্যাম্পে আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হয়নি। আমরা আবার মেলাঘর ক্যাম্পে ফিরে আসি। এরপর আমাদের পাঠানো হয় পালাটানা ক্যাম্পে। সেখানে আমাদেরকে আরো এক মাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

 

 

প্রশিক্ষণের মধ্যে সব ধরনের অস্ত্রই আমাদের হাতে কলমে দেখিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আমাদের পুরো গ্রুপকে দুই ভাগে ভাগ করে দেশে চলে আসার নির্দেশ দেয়া হয়। প্রথম গ্রুপ বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর নৌকায় দেশের ভিতরে আসার পথে পাকিস্তানিদের হামলার শিকার হয় এবং পাকিস্তানিদের গুলিতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এরপর সবাই আবার আগরতলা ক্যাম্পে ফিরে যান।

 

 

এই খবর পাওয়ার পরে আমাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়া হয়। পরে আমরা কুমিল্লা হয়ে ভিন্ন পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। আমরা নৌকা এবং পায়ে হেঁটে জালকুড়িতে আমার নিজ বাড়িতে উঠি।

 

 

সেখানে আমরা একটি ঘরের ভিতরে গোপনে অস্ত্রগুলি লুকিয়ে রাখি। কিন্তু কয়েকদিন পর পাকিস্তানিরা জালকুড়ি গ্রামে মুক্তিবাহিনীকে খুঁজে বেড়াতে শুরু করে। তখন আমরা দিনের বেলা অস্ত্রগুলো আমাদের ধানক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে রাখতাম। রাতে অস্ত্র নিয়ে আমরা বিভিন্ন অপারেশনে যেতাম।

 

 


এভাবে আমরা বেশ কিছু অপারেশন করেছি। প্রত্যেকটি অপারেশনই অত্যন্ত সফল হয়েছিল এবং আমরা সবার কাছে অত্যন্ত সুনামের অধিকারী হয়েছিলাম।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন