নারায়ণগঞ্জের নারী আইনজীবিদের নর্তকী মন্তব্য করে আদালতপাড়া ছাড়িয়ে পুরো নারায়ণগঞ্জ জুড়ে সমালোচিত হয়েছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপু। তার বিরুদ্ধে শাস্তির দাবী জানিয়ে নারী আইনজীবীরা গতকাল মানববন্ধন করে। একই সাথে নারীদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে এড.টিপু ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়েছে। তাকে যেন নারায়ণগঞ্জ থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় সেই দাবী জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে নারী আইনজীবীরা।
কেননা নানা ঘটনায় মহানগর বিএনপির শীর্ষ পদে দায়িত্বে থাকা এড. টিপু বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তার মুখের খারাপ শব্দের ব্যবহারে দলের নেতাকর্মী থেকে আদালতপাড়ার আইনজীবিরা অতিষ্ঠ হয়ে রয়েছে। তিনি মানুষকে মূল্যায়ন করতে জানেন কিনা তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজ। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কর্মকাণ্ডে তার কঠিন শাস্তি চান নারী আইনজীবিরা।
এদিকে শীর্ষ আইনজীবীকে মারধর ও নারী সহকর্মীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও অ্যাডভোকেট রফিক আহমেদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির নারী আইনজীবীরা। গতকাল রোববার (২৪ মে) দুপুর নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে ‘সাধারণ আইনজীবীদের’ ব্যানারে এ মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে অভিযুক্ত দুই আইনজীবীর বিচার দাবি করেন সহকর্মীরা।
এর আগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু প্রতিনিয়ত আইনজীবী থেকে শুরু করে রাজনীতিবীদ, সাংবাদিক, খোদ দলের নেতা এবং কর্মী সর্বমহলের ব্যক্তিদের সাথে কখনো তর্ক-বিতর্ক-মারধরে জড়িয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন। নেতাকর্মীদের নিজের কর্মচারীদের মত আচরণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আবার কখনো অশালীন মন্তব্য করে তোপের মুখেও পড়েছেন। এমনকি সাংবাদিকের সাথে তর্কে বিতর্কে জরিয়ে গালাগালি করে বিতর্কিত হয়েছেন। তবে প্রতিনিয়ত টিপু বিভিন্নমহলের ব্যক্তিদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন যে দৃশ্য রাজনৈতিক বোদ্ধামহল থেকে শুরু করে সর্বমহলকে ভাবিয়ে তুলছেন। তাকে নিয়ে এখন শহর জুরে সমালোচনা হচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেন এই ধরনের ব্যক্তিকে এত বড় দলের গুরুত্বপুর্ণ পদে রাখে কিভাবে। তার পদ বাতির করার দাবী উঠেছে। যদিও ইতোমধ্যে তার পদ লড়েবরে অবস্থায় রয়েছে।
ভুক্তভোগী আমেনা আক্তার শিল্পী বলেন, ‘আমরা আইনজীবিরা চাঁদাবাজির অভিযুক্ত টিপুর কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। নারায়ণগঞ্জ থেকে তাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করুন। তিনি নারী আইনজীবিদের নর্তকী বলে মন্তব্য করেছে। যা আমার বলতেও লজ্জা লাগে।এড আবু আর ইউসুফ খান টিপুও আমার উপর হামলা করেন এবং ঘুষি মারেন।’
মানববন্ধনে এড. সামছুন নূর বাঁধন বলেন, “ যে সমস্ত ভাষা এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, আসলে বস্তির মানুষ বা রিকশাওয়ালারাও এই ধরণের ভাষা মুখে আনে না। এখন যদি আমাদের নারীদেরকে এই বারে (আইনজীবী সমিতি) এসে ‘নর্তকী’ উপাধি পেতে হয়, এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কিছু নেই।”
আক্ষেপ প্রকাশ করে এই নারী আইনজীবী আরও বলেন, “এই ধরনের অকথ্য-অশ্রাব্য ভাষা নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির একজন সম্মানিত সদস্য আরেকজন সম্মানিত সদস্যের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছেন যা মেনে নেয়া যায় না। একটা বিষয় নিয়ে আপনার সাথে আমার মতের মিল না-ই থাকতে পারে, তাই বলে এই ধরণের ভাষা ব্যবহার করা তো ঠিক না। আমরা বারের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যাতে এই ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত করা হয় এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হয়।”
বিএনপির নেতা এড.টিপুকে উদ্দেশ্য করে মানববন্ধনে এডিশনাল পিপি এড.ফাতেমা মাসুদ বলেন, আজকে এই মানববন্ধনটি আমাদের জন্য অনেক বড় লজ্জাজনক। আমরা লজ্জাজনক পর্যায়ে আছি এখন। আমাদের এড.আমেনা প্রধান শিল্পীর সাথে যে ঘটনাটা ঘটে গেছে এবং যে এই ঘটনাটা করছে তার অনেক দালালি বন্ধু ছিলো এখানে। তারাও তাকে সহযোগিতা করেছে। এখন তার অনেক লোক এখানে, সে বাহিরে রাজনীতি করে, ঠিক আছে সে মহানগরের একজন ভালো পোস্টে আছেন।
সেখানে ওনি থাকেন, তিনি খারাপ, আমরা তো তাকে খারাপ চোখে দেখি না। সে আমারও অনেক জুনিয়ার। তার যে অবস্থান, সে আমাদের বারের মধ্যে ঢুকলে মনে করে সে অনেক কিছু এখানকার। তো তাকে তো সেটা ভাবলে হবে না। তাকেও ভাবতে হবে আমি একজন আইনজীবী, আমারও বড় কেউ আছে এখানকার সিনিয়ার এবং আমারও কিছু জুনিয়ার আছে এখানে। সবার সাথে ভালো সম্পর্ক করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কারনটা হচ্ছে এখানে একটা তুচ্ছ ঘটনা। সেই তুচ্ছ ঘটনাকে নিয়ে কেন হাসাহাসি এসবে কেনো। আর একজন পুরুষ আইনজীবী কেন মহিলা আইনজীবীর গায়ে হাত দেবে। সে মহিলা কিছু বলতে পারে মুখে, কিন্তু তার গায়ে তো হাত দিতে পারে না।
সে কি করে গায়ে হাত দেয়। আমরা এখানে যারা আসছি এটা আমাদের আইনজীবী পরিবার। আমরা সবাই এসেছি কর্মক্ষেত্রে। আমরা যদি এখানে নির্যাতিত হই, তাহলে আমরা কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো। আজকে আমাদের মানবন্ধনের জন্য এখানে সব কিছুর প্রস্তুতি চলছে, তখন আমাদের একজন মহিলা নেত্রী সবাইকে বলে দিচ্ছে এখানে যাতে না আসতে পারে। ওনিও একজন দালাল। আমাদের এখানে একত্রিত হবার জন্য অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
এখানে দলের কথা আসে, এখানে দল নাই। দলমত নির্বিশেষে এক সময় আমাদের মেয়র সাখাওয়াত হোসেন ওনি একসময় আমাদের চন্দ্রন কুমারের জন্য গিয়েছিলেন সাত খুনের বিচারের জন্য। ওনি কি তখন দল ছিলো, দলের জন্য না একজন আইনজীবীর জন্য ওনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওনার সাথে আমরা সবাই ছিলাম। দলমত নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে এক সাথে থাকতে হবে। এখানে দলকে কুৎসিত করে সব কিছুকে থামাতে চাচ্ছে। তার জন্য আমরা এই পথ নিয়ে বাধ্য হয়েছি। আমাদের বারের কর্তৃপক্ষ আছেন, ওনাদের কাছে আমাদের চাওয়া ওনারা কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এই ঘটনায় তারা কি বন্ধ করবেন? না সামনের দিকে আগাবেন। যদি বন্ধ না করে তাহলে আমরা সামনের দিকে আগাবো।
এ মানববন্ধনে অংশ নেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামছুন নূর বাঁধন, মারধরের শিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমেনা আক্তার শিল্পী, অ্যাডভোকেট ফাতেমা মাসুদ, অ্যাডভোকেট রাসেল প্রধান সহ অন্যান্য আইনজীবিবৃন্দ।