নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একপক্ষ অন্যপক্ষকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে গত কয়েক দিন ধরে আদালত চত্বর ও বার ভবনে পাল্টাপাল্টি মিছিল-সমাবেশ ও স্লোগান দিচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় দুইপক্ষের নেতাদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটেছে। আইনজীবী ফোরামের নেতাদের এই প্রকাশ্য বিরোধে সাধারণ আইনজীবীরা তীব্র বিব্রত বোধ করছেন।
তাদের মতে, বার সমিতির নির্বাচন ঘিরে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে সাধারণ মানুষের কাছে আইনজীবীদের পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তা ছাড়া একসময় একই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ছিলেন তাঁরা। আইনজীবী সমিতিকেন্দ্রিক (বার) রাজনীতিতে একজনের হাত ধরেই অন্যদের উত্থান। এখন দুজন দুই গ্রুপ করে অনেকটাই মুখোমুখি অবস্থানে। দুজনের একজন নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান, অন্যজন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এইচ এম আনোয়ার প্রধান।
বর্তমানে দুটি শক্তিশালী প্যানেলে পরিণত হয়েছে বিএনপিপন্থী দুটি আইনজীবী গ্রুপ। তা ছাড়া সামনে জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন। এই নির্বাচনে এবার সভাপতি পদে কে প্রার্থী হবেন, মূলত তা নিয়েই গুরু ও শিষ্য—দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে দুজনেরই প্রভাব রয়েছে, পৃথক অনুসারীও আছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে যেসব কারণে বিরোধ তৈরি হয়, তার মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পিপি (সরকারি কৌঁসুলি) নিয়োগ এবং আদালত স্থানান্তরের কার্যক্রম নিয়ে মতপার্থক্য।
বর্তমানে নির্বাচনকে সামনে রেখে দুটি গ্রুপ ইতিমধ্যে আদালতপাড়ায় শক্তির গর্জণ দিচ্ছেন। এড. সাখাওয়াত হোসেন খান ও এড. আবু আল ইউসুখ খান টিপুর সহযোগীতায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সরকার হুমায়ূন কবির, অ্যাড. জাকির হোসেন, অ্যাড. এস.এম গালিব, অ্যাড.আজিজ মোল্লা, অ্যাড. সাইদুর রহমান, অ্যাড. কামাল মোল্লাসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী।
অন্যদিকে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে আলাদা একটি শক্তিশালী গ্রুপ শক্তি পদর্শণ করছেন। তারা হলেন, পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির, অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক নয়ন, অ্যাডভোকেট আনজমু আহমেদ রিফাত, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ, অ্যাডভোকেট রাজিব মণ্ডল, অ্যাডভোকেট আবু রায়হানসহ আরো বেশকজন জুনিয়র আইনজীবী। বর্তমানে আদালতপাড়ায় এই দুই গ্রুপের মারমুখী অবস্থান রয়েছে।
তাছাড়া আদালত নিয়েও তৈরি হয়েছে দুই অবস্থান
জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের (বিদ্যুৎ ও শ্রম আদালত) কার্যক্রম কোথায় চলবে, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। আনোয়ার প্রধানের অনুসারী আইনজীবীদের বক্তব্য, তাঁরা শহরের চানমারী এলাকা থেকে আদালত স্থানান্তরের বিপক্ষে।সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ ও শ্রম আদালতের কার্যক্রম কোথায় চলবে, সেটিও আইনজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আদালত স্থানান্তরের সঙ্গে চেম্বার, মামলা পরিচালনা, মক্কেলের যাতায়াত ও পেশাগত সুবিধার বিষয় যুক্ত। এ কারণে আদালত স্থানান্তরের যেকোনো সিদ্ধান্তের মতো ঘটনা বারের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে দুই গ্রুপই দুই অবস্থানে অটুট রয়েছে।
এদিকে গত ৬ অক্টোবর বার ভবনে হাতাহাতি, অশোভন আচরণ এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এইচএম আনোয়ার প্রধান এবং মহানগর বিএনপির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ আঞ্জুম আহমেদ রিফাতকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু স্বাক্ষরিত নোটিশে তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।তবে এর আগেই তিনি জবাব দিয়েছেন আনোয়ার প্রধান। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৯ টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার প্রধান লিখিতভাবে তার ফেসবুকে জানান।
এ বিষয়ে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচএম আনোয়ার প্রধান বলেন, অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বার ভবনে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কিংবা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে আসেননি। তিনি এসেছেন একজন আইনজীবী হিসেবে। আমি দাপ্তরিকভাবে কোনো নোটিশ পাইনি, তবে আবু আল ইউসুফ খান টিপুর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে আমার হোয়াটসঅ্যাপে একটি নোটিশ এসেছে।
তিনি আরো বলেন, আইনজীবীদের জন্য বিএনপির সমর্থিত সংগঠন হলো জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। আমি যদি কোনো সাংগঠনিক ব্যত্যয় ঘটিয়ে থাকি, তবে সেই ফোরাম নোটিশ দিতে পারত। আর বারের কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হলে সমিতি ব্যাখ্যা চাইতে পারে। কিন্তু মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আমাকে এ ধরনের নোটিশ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না। সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র ও বিধিমালার অজ্ঞ লোকদের দায়িত্ব দিলে দল ও সংগঠনের জন্য তা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।