বেড়েছে নকল ও ভেজাল পণ্য বিক্রেতাদের দৌরাত্ম্য
আবু সুফিয়ান
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৩, ০৮:২৫ পিএম
# ঈদকে সামনে রেখে শহরে নকল পণ্যের ছড়াছড়ি
# প্রশাসন তৎপর না থাকায় প্রতারিত সাধারণ ভোক্তা
ঈদকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ জুড়ে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে নামীদামি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল পণ্য। সাধারণ চোখে মোড়ক দেখে বোঝার সাধ্য নেই, কোনটি আসল আর কোনটি নকল। ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি এসব পণ্য ব্যবহারের ফলে দিন দিন বাড়ছে চর্মরোগীর সংখ্যা। বিশেষ করে কোমল ত্বকের শিশুদের বেশি ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে বেশি দামে পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ব্যবহারকারীরা।
কিছু ধুরন্ধর ও অসাধু ব্যবসায়ী নকলের দায়ে মামলা এড়ানোর জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের সঙ্গে রং মিশিয়ে বানানো নিম্নমানের এধরনের প্রসাধনী পণ্য বাজারজাতকরনে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বান করে। নামকরা কোম্পানির জিনিসগুলো হুবহু নকল করে তাতে মেইড ইন এর জায়গায় মেইড অ্যাস এরকম স্টিকার লাগিয়ে আবার কখনও ইউনিলিভার কোম্পানির ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির আদলে লাভ অ্যান্ড লাভলি, ফুয়ার অ্যান্ড লাভলি ইত্যাদি নামে রং ফরসাকারী ক্রিম ইত্যাদি প্রসাধনী তৈরি করছে ও একচেটিয়া বিক্রি করছে।
বিভিন্ন পার্লার, সেলুন ও হেয়ার ড্রেসিং এর দোকানগুলোতে বিভিন্ন নকল পণ্যের ব্যবহারের কারণে চর্মরোগ থেকে শুরু করে মারাত্মক স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে আছে লাখ লাখ তরুন ও যুবক। এদিকে ভাসমান বিভিন্ন দোকানে কাপড় পরিষ্কার করার পাউডার থেকে শুরু করে গ্লাস ক্লিনার, ডিশ ওয়াশ বার বা বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী দেদারসে বিক্রি হওয়ার কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছেন অসংখ্য মানুষ। ক্রেতারা নকল পণ্যগুলো চিনতে ভুল করে থাকেন এবং কম দামে বিক্রেতারা পণ্যগুলো বিক্রি করেন বলে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছে।
বড় বড় শপিংমল সহ বিভিন্ন ভাসমান দোকানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল পণ্য বিক্রি হয়। প্রথমবার দেখলে কোনটি আসল পণ্য আর কোনটি নকল পণ্য তা বোঝা খুবই কঠিন। যেসব প্রতিষ্ঠান নকল পণ্য তৈরি করে তাদের নামের বানান প্রায় ভুল থাকে। আর যেহেতু কোন বিখ্যাত ব্র্যান্ডের নামের আদলে নাম দেওয়া হয় তাই অনেকেই প্রথম দেখায় নকল পণ্যটি চিনতে পারেন না। তারা সেদিকে আসল ব্র্যান্ডের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করেন।
তাই আসল পণ্য চিনতে ব্রান্ডের নাম এবং নামের বানান খুব ভালো করে খেয়াল করতে হয়। ভালো করেছেন এমন ব্র্যান্ড গুলো বা ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলো প্যাকিংয়ের সময় কোট সিরিয়াল মডেল নম্বর ট্রেডমার্ক এবং প্যাটেন্টের মতো কিছু বৈশিষ্ট্য দেয়। আর নকল পন্য গুলোতে এ ধরনের কোন বৈশিষ্ট্যই দেখা যায় না এ ধরনের কোন বৈশিষ্ট্য দেয় না। এছাড়া নকল পন্যের গায়ে ব্র্যান্ডের নাম লোগো ট্রেডমার্ক পরিবর্তন করা হয়। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এই ভুলগুলো সহজে লক্ষ্য করা যায়।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল বিসিকে ভ্যান গাড়িতে করে বিভিন্ন ধরনের নকল পণ্য বিক্রি করছেন এক বিক্রেতা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নাম বলে এবং অফারের প্রলোভন দেখিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন তিনি। তার ভ্যান গাড়ির কাছে গিয়ে দেখা যায় তিনি যে পণ্যগুলো বিক্রি করছেন তার সবগুলোই নকল পণ্য। নকল পণ্যের ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হন। তিনি তার নাম বলতেও রাজি হননি এবং এই পণ্যগুলো তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন কার কাছ থেকে পেয়েছেন তাও বলতে দেননি রাজি হননি।
তিনি বলেন, আপনার যদি ভালো লাগে তাহলে নেন না হলে চলে যান। এখানে কাপড় পরিষ্কার করার পাউডার রিনের কপি পণ্য বিন কিনছেন ক্রেতা মো. আলমগীর হোসেন। তিনি যুগের চিন্তাকে বলেন, আসলে এসব পণ্য দেখে বোঝার কোন উপায় নাই যে এটা নকল না আসল। কম দামে পাচ্ছি বিধায় কিনলাম আর কি। আরেক ক্রেতা রাসেল মিয়া বলেন, আমি এখানে দেখলাম গ্লাস ক্লিনার হাড়ি পাতিল পরিষ্কার করার বার এবং কাপড় পরিষ্কার করার পাউডার সবগুলোই নকল কোনটাই আসল নয় এসব পণ্য কিনলে সাধারণ ক্রেতারা প্রচারিত হবেন তাছাড়া স্বাস্থ্যের ঝুঁকি আছে।
নিম্নমানের নকল ও ভেজাল প্রসাধনী সামগ্রীর প্রভাব সম্পর্কে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহারে ত্বকের সাধারণ লাবণ্যই শুধু নষ্ট হয়ে যায় না। এর ব্যবহারে প্রাথমিকভাবে ব্যবহারকারীর কন্টাক্ট ডারমাটাইসিস হয়, চামড়া লাল হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন তৈরি করতে পারে। এমন কি স্কিন ক্যান্সার হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। নকল ও নিম্নমানের এ সকল প্রসাধনী সামগ্রীতে যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে তা মাত্রাতিরিক্ত এবং কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই।
ফলে এলার্জি, ক্ষত, চামড়া কালো হয়ে যাওয়া, একজিমা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিনদিন বাড়ছে। শেভিং ক্রিম ও ফোমের ক্যানিস্টারে ব্যবহৃত হওয়া গ্যাস ক্লোরোফ্লুরো কার্বন। যা ক্রমবর্ধমান পৃথিবীর ওজোন স্তরের পক্ষে খুবই ক্ষতিকারক। ফলে উন্নত বিশ্বে এর ব্যবহার অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করছে বায়বীয় হাইড্রোকার্বন প্রোপেলান্ট। যেমন পেন্টেন, প্রোপেন, বিউটেন ও আইসোবিউটেন এর মিশ্রণ।
নকল পণ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারায়ণগঞ্জের একজন বিউটিশিয়ান বলেন, ত্বকের সমস্যা নিয়ে যেসব মানুষ আমাদের কাছে আসে তাদের অনেকেরই মুখে কালো দাগ, রাশ, গোটা, এলার্জি ইত্যাদি সমস্যা দেখা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলে তারা যেসব ক্রিম, লোশনের কথা বলে সেগুলোতে মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। যার ইমিডিয়েট এলার্জিক রিয়্যাকশনে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
এস.এ/জেসি


