নকল তাজমহলে দর্শনার্থীদের ধকল ম্যানেজার নিয়ন্ত্রণে হয়রানির ফাঁদ
রূপগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৩:১৪ পিএম
তাজমহল ভারতের আগ্রায় অবস্থিত একটি মুঘল নিদর্শন। কিন্তু এর হুবহু নকল বা অবিকল প্রতিরূপে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার জামপুরের পেরাবোতে করা হয়েছে বিনোদন স্পট। অনেকে একে স্যুটিং স্পষ্টও জানেন। পাশেই করা হয়েছে মিশরের আদলে পিরামিড। যাদুঘরের মতো নানা শিক্ষণীয় বস্তুতে আকৃষ্ট হয় যে কেউ। আর এসব কারনে প্রতিদিন উপস্থিত হয় হাজারো দর্শনার্থী।
অভিযোগ রয়েছে, এসব দর্শনার্থীদের নানাভাবে হয়রানী করে নকল তাজমহলের ম্যানেজার এলাহি বক্স ও তার চক্র। খাবার হোটেলে প্রেমিক প্রেমিকাকে আটকিয়ে ফিটিং, তাজমহলের অভ্যন্তরে অসামাজিক কাজের সুযোগ করে দেয়ার মতো জঘন্য কাজের সাথে এলাহির জড়িত থাকার বিস্তর অভিযোগ।
সূত্র জানায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা চলচ্চিত্র নির্মাতা আহসানুল্লাহ খান মনি ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে তার ‘তাজমহলের কপিক্যাট সংস্করণ’ প্রকল্পের ঘোষণা করেন। নির্মাতার উদ্দেশ্য ছিলো “এই তাজমহলের রেপ্লিকাটি তৈরি করা হয়েছে যেন তার দেশের দরিদ্র মানুষ, যাদের ভারত গিয়ে প্রকৃত নিদর্শন দেখার সামর্থ্য নেই তারা যেন তাজমহল দেখার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন নিজের দেশে থেকেই”।
যদিও সে সময় বাংলাদেশে তাজমহলের এই অবিকল প্রতিরূপ সৃষ্টির ঘটনায় ভারত ক্ষুব্ধ হয়। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় দ‚তাবাস থেকে জানানো হয় আহসানুল্লাহ মনিকে প্রকৃত তাজমহলের (৩০০ বছরের ও বেশি পুরোনো) মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন করার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাতার সেই উদ্দেশ্য সফল হয় অনেকটা। সরকারি ছুটির দিনে এ নকল তাজমহল আট পিরামিড দেখতে ভির করেন হাজারো দর্শনার্থী। পাশাপাশি প্রেম প্রীতির নিরাপদ পার্কের মতো এ স্পষ্ট বেছে নেয় প্রেমিক প্রেমিকা। বাদ যায়না পেশাদার দেহ ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরাও।
পার্কের ম্যানেজার এলাহী বক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবাসিক হোটেল সুবিধাসহ সব সুবিধা পেয়ে যায়। দিন ছাড়াও রাত্রি যাপনের সুযোগ করে দেয় ম্যানেজার। তাজমহল ঘুরতে আসা পূর্বাচলের মাহিরা তাসফি বলেন, তাজমহলে পরিবার নিয়ে ঘুরার পরিবেশ নেয়।
চিপায়, গাছের তলায় নারী পুরুষ জোড়ায় জোড়ায় বসে অসামাজিক আচরন করে। পাশাপাশি এক টিকেটে তাজমহল ও পিরামিড দেখার কথা বললেও পাখির মেলা দেখতে ভেতরে পুনরায় টিকেট নিতে হয়। এসব হয়রনীর শামিল।
রাজধানীর ডেমরা থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী শাহিন মিয়া বলেন, তাজমহল দেখতে সুন্দর কিন্তু এর পাশে ও ভেতরের খাবার হোটেলগুলোতে প্রেমিক প্রেমিকা দেখলে নানা ভঙ্গিতে একান্তে সময় কাটাতে সুযোগ করে দেয়। পরে এসবের ভিডিও বা ছবি তুলে ব্ল্যাক মেইল করা হয়।
এমন ঘটনায় আমার বন্ধু ও তার বান্ধবী গত ২৫ অক্টোবর দুপুরে তাজমহলের ম্যানেজার এলাহীকে জানালে হোটেল বয়কে টাকা দিয়ে চলে যেতে বলে। তখন বাধ্য হয়েই টাকা দিয়ে চলে যায়। তাদের মারধরও করা হয়েছিলো। মোবাইল ও টাকা রেখে দেয়া হয়েছিলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেরাবোর বাসিন্দা জানান, এখানে বহু দর্শনার্থী বেড়াতে আসে। তাদের মাঝে যুবক যুবতী এসে তাজমহলের ভিতরে ম্যানেজারকে না জানিয়ে কাছাকাছি বসলেও হয়রানী করে। ছবি ও ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়ার হুমকী দিয়ে টাকা পয়সা রেখে দেয়। এসব এলাহীর নিয়ন্ত্রণে কর্মচারীরা করে।
পরে মিমাংসার নামে ম্যানেজার এলাহী টাকা পয়সা নেয়ার রায় দেয়। অভিযোগ রয়েছে, তাজমহলের নিজস্ব স্থানে গাড়ী বা মোটরসাইকেল রাখলেই চুরি হয়ে যায়। আর পাশেই এলাহীর নিয়ন্ত্রণে টিকেট কেটে রাখলে গাড়ীর সমস্যা হয় না।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এলাহী বক্স বলেন, তাজমহল প্রেমের জায়গা এখানে প্রেম করতেই আসবে। হয়রানির অভিযোগ থাকতেই পারে। এসব লিখলে কি হবে? কেউ হয়রানি হয়ে থাকলে থানায় অভিযোগ করুক। আমগো কাজ টাকা দিলে দর্শনার্থীদের সব সুবিধা দেয়া।
উল্লেখ্য যে, সম্রাট শাহজাহানের অনুপম ভালোবাসার নিদর্শন আগ্রার তাজমহল। ভালোবাসার অমর নায়ক হিসেবে মধ্যযুগে পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি স্থাপনা রচিত হয়েছিল তার হাত দিয়ে। এদিকে যাদের সাধ্য নেই ভারতে গিয়ে আগ্রার তাজমহল দেখার অথচ মনের কোণে ইচ্ছা লুকিয়ে আছে, তাদের মনের ইচ্ছা কিছুটা হলেও লাঘব হবে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ের অন্তর্গত জামপুর ইউনিয়নের পেরাব গ্রামে নির্মিত বাংলার তাজমহল দেখে।
২০০৩ সালে এর কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেশ ঘটা করে এর উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকে তাজমহল এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
তাজমহল সংশ্লিষ্ট জায়গার পরিমাণ প্রায় ১৮ বিঘা। তবে আশপাশে পর্যটনের জন্য প্রায় ৫২ বিঘা জায়গা সংরক্ষিত রয়েছে। এর অভ্যন্তরে আহসানউল্লাহ্ মনি ও তার স্ত্রী রাজিয়া দুজনের সমাধির স্থান রক্ষিত আছে। চার কোণে চারটি বড় মিনার, মাঝখানে মূল ভবন, সম্পূর্ণ টাইলস করা।
সামনে পানির ফোয়ারা, চারদিকে ফুলের বাগান, দুই পাশে দর্শনার্থীর বসার স্থান। এখানে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রাজমনি ফিল্ম সিটি, রেস্তোরাঁ,আবাসিক হোটেলসহ নানা বিনোদন ব্যবস্থা। এন.হুসেইন রনী /জেসি


