# প্রকৃত হকাররা মালামাল নিয়ে বসতে পারলেই খুশি
# গত ৩৫ বছরের মধ্যে মূল শহরের রাস্তা প্রশস্ত হয়নি
# এ সময়ে ফুটপাত দখল হয়ে মূল সড়কও দখলে যাচ্ছে
# এখনও বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত দখলে ব্যস্ত তারা
হকার সমস্যা নারায়ণগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিরক্তিকর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন নারায়ণগঞ্জবাসী। বিশেষ করে ফুটপাতসহ রাস্তার সিংহভাগই তাদের অবৈধ দখলে চলে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বছরের পর অভিযোগ করে যাচ্ছে শহরবাসীসহ ভূক্তভোগীগণ। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহল থেকে শুরু করে সর্বোস্তরেই এই হকার সমস্যা নিরসন নিয়ে দীর্ঘদিন যাবতই চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
এরই মধ্যে গত ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারিতে ঘটে যাওয়া হকার কাণ্ডে বিস্মিত শুধু নারায়ণগঞ্জই না, পুরো দেশ। যা নিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো বিশ্বের আলোচনায়ও ওঠে আসে নারায়ণগঞ্জের হকার সমস্যার বিষয়টি। এরপর থেকে অনেকেই আবার হকারদের বাড়াবাড়ির কারণে হকার সমস্যাকে হকার উৎপাত বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
সর্বশেষ বিষয়টি বড় আকারের আলোচনায় আসে গত ৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ গোল টেবিল বৈঠকের পর। যেখানে হকারদের অবৈধভাবে ফুটপাত দখলের বিষয়টিকে নারায়ণগঞ্জের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা প্রতিকারে কঠোরভাবে মেয়র, নারায়ণগঞ্জ শহরকেন্দ্রীক দুই এমপি, প্রশাসনের সম্মিলিতভাবে কাজ করার ঘোষণা দেন।
এরই মধ্যে জেলা প্রশাসক ও এমপি সেলিম ওসমানের পক্ষ হতে হকারদের একটি তালিকা তৈরি করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তারপরই যেন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন হকার নেতা ও তাদের ইন্ধন প্রদানকারী লোকগুলো। যার কারণে অস্থায়ীভাবে বসার জন্য তাদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দিলেও সেখানে তৈরি হচ্ছে সংঘর্ষ, অধিপত্য বিস্তারে রক্তারক্তির মতো ঘটনাও ঘটছে।
এরই উপর আবার এখনও বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত দখলেও চলছে তাদের প্রস্তুতি। প্রতি নিয়তই প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে এই এলাকা পুনর্দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। তাই শহরবাসীর প্রশ্ন নবাব সলিমুল্লাহ সড়কে হকারদের বসার কথা থাকলেও বঙ্গবন্ধু সড়কের পাশে এখনও দেখা যাচ্ছে ফুটপাত দখল করে বসে থাকতে। নবাব সলিমুল্লাহ সড়কে হকার বসলে এখানে বসছে কারা।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় নারায়ণগঞ্জ শহর দেশের অন্যতম জনবহুল শহর। বিশেষ করে এখানকার আয়তনের তুলনায় লোক সংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। ঢাকার পরপরই যার অবস্থান। ছোট এই শহরকে কেন্দ্র করে প্রচুর শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠায় বিভিন্ন জেলা ও শহর থেকে ক্রমেই শহরে বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ। অথচ মূল শহরে সেই হারে রাস্তা-ঘাট প্রসস্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় গত প্রায় ৩৫ বছরে মধ্যে নারায়ণগঞ্জের মূল শহরের রাস্তুাগুলো তেমন কোন প্রসস্ত করা সম্ভব হয়নি। অথচ এই সময়ের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনসংখ্যার চাপ অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে জানা যায়। তবে শহরবাসীর চলাচলের জন্য রাস্তা বাড়ানো সম্ভব না হলেও এর মধ্যে রাস্তার আয়তন উল্টো কমেছে বলে নারায়ণগঞ্জবাসীর অভিমত।
এই সময়ের মধ্যে প্রতিনিয়তই সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা হিসেবে পরিচিত ফুটপাতগুলো সম্পুর্ণ বেদখলতো হয়েছেই বরং যানবাহন চলাচলের মূল রাস্তাও এখন হকারদের দখলে চলে যাচ্ছে। আর কিছু নেতা নামের স্বার্থবাজ লোকদের তত্ত্বাবধানে হকাররা এই কাজগুলো পরিচালনা করে বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসে।
এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম নাগরিক সমস্যা যানজট ও ফুটপাত দখলের সমস্যা সমাধানে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি একটি গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
যেখানে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার আমীর খসরুসহ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা। একই সাথে দীর্ঘদিন পরে হলেও এই বিষয়গুলো নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেন তারা।
যা ছিল নারায়ণগঞ্জবাসীর বহু দিনের প্রতিক্ষীত একটি বিষয়। সকল মতপার্থর্ক্য দূর করে শহরবাসীর শান্তির জন্য এই বিষয়গুলো কঠোভাবে দৃষ্টি দেয়ার আশ্বাস দেন তারা। এরপর হকাররা তাদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে জেলার শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের ঐকমত্যের সমালোচনা শুরু করে হকার ও তাদের দোসররা।
তবে তাদের পুনর্বাসনের বিবেচনায় কাজ করার জন্য হকারদের তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান। তবে তাদের এই নির্দেশের কোন তোয়াক্কা না করেই হকাররা একই সাথে আন্দোলন বঙ্গবন্ধু সড়কের সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো আবারও দখলে তৎপরতা চালাতে থাকে।
সর্বশেষ হকারদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে চাষাঢ়া সংলগ্ন এলাকা নবাব সলিমুল্লাহ সড়কে তাদের একটি সিডিউল করে বসার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা করেন নীতিনির্ধারকগণ। তবে সেখানে বসা নিয়েও তাদের মধ্যে দলাদলি, মারামারি ও রক্তাক্ত জখমের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে এখনও শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের বেশ কিছু জায়গায় দখল নিতে দেখা যায় হকারদের।
শহরবাসীর অনেকেই আবার মনে করছেন, প্রকৃত হকারদের চাহিদা খুবই ছোট বা কম হলেও তাদের নেতৃত্বে থাকা বা ইন্ধন প্রদানকারী নেতাগণ ডেমো হকার তৈরি করে তাদের নিজেদের ফায়দা হাছিল করতে চাইছেন। তাই তারা প্রকৃত হকারদের কোন তালিকা তৈরি করতে বা দিতে নারাজ। তাতে তাদের অপতৎপরতা ভেস্তে যাবে বলে মনে করেন তারা।
একই সাথে প্রকৃত এবং সাধারণ হকাররা শুধুমাত্র তাদের কোন রকম একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে তাদের রুজি রুটির ব্যবসাটা করতে পারলেই খুশি। কিন্তু তাদের ইন্ধনদাতারা এসব হকারদের নাম করে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক এনে ডেমো হকার সৃষ্টি করে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করছেন।
পূর্বে যেমন এসব নেতারা একাধিক দোকান দখল নিয়ে তা বিক্রি করে অবৈধভাবে টাকা উপার্জন করেছেন, আবারও তারা নতুন একটি মোটা অঙ্কের টাকা মারার অপকৌশলে লিপ্ত আছেন বলে মনে করছেন শহরবাসী। এন. হুসেইন রনী /জেসি


